Monday, July 27Welcome khabarica24 Online

নীল নির্জনে :: রুনা তাসমিনা

বাসের ব্রেক কষতেই পড়বিতো পড় একেবারে নিধির কোলের উপর এসে পড়লো শুভ্র। সঙ্গে সঙ্গে হাসির রোল উঠল বাসের ভেতর। বিব্রত শুভ্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই সঙ্গীরা টিপ্পনী কাটে, উপরওয়ালা যব দেতাহে,ছপ্পর ফাডকে দেতাহে। এদিকে রাগে,ব্যথায় নিধি প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারো না? এভাবে গায়ের ওপর এসে পড়ো ! নির্লজ্জ কোথাকার ।
আমি কি ইচ্ছে করে পড়েছি? তারচেয়ে দ্বিগুণ চেঁচিয়ে বলে শুভ্র। দোষ করেছে বাস ড্রাইভার, আর চেঁচাচ্ছ আমার ওপর। ততক্ষণে বন্ধুদের সাহায্যে উঠে দাঁড়িয়েছে সে। এই অনাকাঙ্খিত ঘটনায় ভীষণ লজ্জা পেয়েছে সে-ও,কিন্তু ওটা নিজের ভেতরেই চেপে রেখে আচ্ছা করে ঝেড়ে দিল বাস ড্রাইভারকে। কিন্তু বাস ড্রাইভাবের কানে সে ঝাড়ি পৌঁছুয় কিনা সে-ই জানে। সে ব্যস্ত ফোনে। কথা বলতে বলতেই গাড়ি চালাচ্ছিল সে। তার অসাবধানতায় আরেকটি বাসের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে যাচ্ছিল। ওই জন্যেই এত জোরে ব্রেক কষা। বাসটিকে কাটিয়ে এসে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ফোনে। তিন নম্বর বাসে করে ফিরছে সবাই ভার্সিটি থেকে। আজ ট্রেন ধরা হয়নি কারো। ক্লাস থেকে বের হয়ে জিরো পয়েন্ট যখন পৌঁছালো ততক্ষণে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন শহরের দিকে মুখ করে ছুটতে শুরু করেছে। বাসের ঝক্কি এমনিতেই পছন্দ না নিধির। আজ ট্রেন ছুটে যাওয়ায় বাস ধরা। মাঝে মাঝে এভাবে বাধ্য হয়ে বাসেই যেতে হয়। যদিও তিন নম্বর বাসে সব ভার্সিটির ছেলেমেয়েরাই থাকে তবুও হেলপারের অকারণ হাঁকডাক, গাদাগাদি করে লোক ওঠানো একদম অপছন্দ তার। ভাগ্যিস আজ বাইরের লোক নেই বাসে, না হলে কি বেহাল অবস্থাই না হতো ভাবে নিধি।
একই ডিপার্টমেন্টে পড়ে নিধি আর শুভ্র। কিন্তু ভার্সিটিতে নতুন বলে শুধু মুখটা পরিচিত। কথা হয়নি কখনো। কিন্তু তাই বলে ছাড় পাবে! সবাই মিলে সুরে বেসুরে গান ধরেছে- প্যায়ার হুয়া ইকরার হুয়া হ্যায়, প্যায়ার সে ফির কিঁউ ডরতাহে দিল….ওরা মজা নিচ্ছে। আর এদিকে লজ্জায় বাস ড্রাইভারের গুষ্টি উদ্ধার করছে মনে মনে নিধি। শুভ্রর মুখে নার্ভাস হাসি। এই হাসি ঠাট্টার মধ্যেই বাস একসময় পৌঁছে যায় শহর এলাকায়। অক্সিজেন মোড় এসে নেমে যাওয়ার সময় শুভ্র ছোট্ট করে ‘সরি’ বলে নিধির উদ্দেশ্যে। নিধির গায়ে আরো জ্বালা ধরিয়ে দেয় শুভ্রর সরি বলা। লজ্জায়, রাগে লাল হয়ে আছে তার সুন্দর মুখটি। পরদিন আবার দেখা হয় ক্লাসে। শুভ্রর চোখে চোখ পড়তেই সেই বিব্রতকর অনুভূতি আবার ফিরে আসে মনে। গতকালের অস্বস্তিকর ভাবটা এখনো রয়ে গেছে নিধির ভেতর। ক্লাসে মন বসছেনা কিছুতেই। সময় গুনছে কখন শেষ হবে ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির এই থিউরেটিক্যাল ক্লাস। স্যার মানুষের শরীরে ক্যামিকেলের একশন রিএকশন নিয়ে কিছু বলছেন। কিন্তু নিধির মাথায় আজ স্যারের কথাগুলো কিছুই ঢুকছে না। কয়েক যুগ ধরে যেন এই ক্লাস চলছে তো চলছেই। অবশেষে অধৈর্য্য সেই যুগের শেষ হয়। নিধি ক্লাস থেকে বেরিয়ে একটি রিক্সা ঢেকে উঠে পড়ে।
মামা,একঘন্টা ঘুরাবেন।
কোনদিকে যাবেন? ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের দিক দিয়ে যাই? ওদিকটায় গেলে মনে ভালো লাগবে। বুড়ো রিক্সাওয়ালা যেন বুঝতে পেরেছে মেয়েটির মন খারাপ।
ঠিক আছে। ওদিক হয়েই যান।
গতকালের সামান্য ঘটনা কেন নিধি মন থেকে ফেলতে পারছে না বুঝতে না পেরে নিজের ওপরই মন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
রিক্সা চলছে ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের কালো পিচ ঢালা মসৃণ পথ ধরে। দু’পাশে দাঁড়ানো গাছগুলো ঢালু রাস্তাটিকে আরো মোহনীয় করে রেখেছে। কোথাও দু’জন, কোথাও কয়েকজন বসে গল্প করছে।
প্রকৃতি নিজের সমস্ত সৌন্দর্য ঢেলে সাজিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল জায়গা। প্রত্যেক ডিপার্টমেন্ট এলাকা পাহাড় যেন তার মায়া, ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছে। রাস্তার দু’পাশে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো যেন ইচ্ছে করেই শাখার বাহু দিয়ে ঢেকে রেখেছে পিচ ঢালা রাস্তা। কোথাও জারুল ফুল তার বেগুনী রঙ দিয়ে ঢেকে রেখেছে প্রিয় গাছ। কোথাও কৃষ্ণচূড়া আকাশ ছেয়ে রেখেছে লাল টকটকে রঙে। কোথাও সোনালু ফুল কানের দুলের মতো হাসছে দুলে। ফুলের সাগর যেন আকাশে,মাটিতে লাল, হলুদ, বেগুনী আরো কত রঙের ধারা সাথে কচি সবুজ পাতায় ছাওয়া ক্যম্পাস যেন মাটির বুকে এক টুকরো স্বর্গ প্রকৃতি তার আঁচলে চুপিসারে কখন বেঁধে নিলো নিধির মনের মেঘ নিধি বুঝতেই পারলো না। এক ঘন্টা হয়ে গেছে মামা। আরো ঘুরবেন ?
রিক্সাওয়ালার কথায় সম্বিত ফিরলো নিধির।
না মামা। জিরো পয়েন্ট চলেন। দেড়টার ট্রেন ধরতে হবে।
রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে ট্রেনের দিকে এগুতে যাবে,এমন সময় পেছন থেকে কে ডাক দিলো। ফিরে দেখলো শুভ্র এগিয়ে আসছে। মুখটা গম্ভীর। উদ্বিগ্ন ছায়া সেই মুখে।
ক্লাস করবে না? চলে যাচ্ছো?
মন বসছে না। তাই ফিরে যাচ্ছি। নিজের মনের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখলো শুভ্রর প্রতি কোন ক্ষোভ নেই নিধির। উল্টো ওর প্রতি কেমন একটা মায়া অনুভূতি।
কারণটা আমি নই তো? প্রশ্ন শুভ্রর।
নাহ! কিছুটা দ্বিধা মেশানো গলায় ছোট্ট উত্তর দিয়ে উঠে পড়লো ট্রেনের একটি বগিতে। বগি অনেকটা ফাঁকা। হাতের ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে দেখলো ট্রেন ছাড়তে আরো কুড়ি মিনিটের মতো বাকী। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলো শুভ্র তখনো দাঁড়িয়ে আছে। কি ভেবে ট্রেন থেকে নেমে পড়লো আবার। শুভ্রর কাছে গিয়ে মিষ্টি হেসে বললো,
সরি। আমি একটু বেশিই রিএক্ট করে ফেলেছি। চলো ক্লাসে যাই।
শুভ্র প্রস্তুত ছিল না একেবারেই নিধির এই অপ্রত্যাশিত ফিরে আসার জন্যে।
জিরো পয়েন্টের ঝুপড়ি দোকানে বসে ধূমায়িত চায়ের কাপের পাশে আড্ডা বেশ জমে উঠেছিল বেশ কয়েকজন সহপাঠীর। শুভ্র আর নিধিকে একসাথে দেখে হৈ হৈ করে উঠলো কয়েকজন। আজ আর রাগ হলো না নিধির। হাসিমুখে যোগ দেয় ওদের সাথে।
বন্ধুত্বটা এভাবেই শুরু। ছোটো একটা দল ওদের। ক্লাসের অবসরে আড্ডা জমে কখনো ঝুপড়ি দোকানে চায়ের ফাঁকে। কখনো শহীদ মিনারের পাশে। কখনো বুদ্ধিজীবী চত্বরে। ট্রেনে, বাসে ক্লাস শেষে ফিরতে ফিরতে। আবার কখনো বসে পড়া নিয়ে। কখনো কেমিস্ট্রি,কখনো গণিতের জটিল সমস্যা নিয়ে কারো ঘরে চলে গ্রুপ স্টাডি ছুটির অবসরে।
কথায় বলে প্রেম আসে চুপিসারে,লুকিয়ে। কখন কোথায় কার মন কার সাথে বাঁধা পড়ে কেউ জানে না। নিধিও বুঝতে পারে নি শুভ্র কখন একটু একটু করে জায়গা করে নিয়েছে নিধির মনের ঘরে। আড্ডার ফাঁকে নিজের অজান্তে চোখ ছুঁয়ে থাকে শুভ্রকে। মাঝে মাঝে ধরা পড়ে যায় শুভ্রর কাছে। চোখ ফিরিয়ে নেয় নিধি। চোখের কোনে ধরা পড়ে শুভ্রর ঠোঁটের হাসির রেখা।
দিনরাত পেরিয়ে সময় গড়িয়ে গেলো তার নিয়মে বেশখানিকটা। সময়ের স্রোতে ভেসে গেলো একটি বছর। শুভ্রর সঙ্গে অনেক সাবলীল নিধি এখন। পরিক্ষা সামনে। ভালো প্রস্তুতির জন্যে ছোটো দলটি কখনো বসে পড়ে লাইব্রেরিতে গ্রুপ স্টাডির জন্যে। পরিক্ষার দিনগুলোতে আড্ডায় কিছুটা ভাটা পড়লেও এখন আবার সব আগের মতোই।
নিধি খেয়াল করলো একটি সুক্ষ পরিবর্তন শুভ্রর। সে যেনো একটু বেশিই গম্ভীর হয়ে গেছে হঠাৎ। উচ্ছ্বাস নেই আগের মতো। নিধির ভালো লাগেনা শুভ্রর এই মৌনতা। সুযোগ খুঁজছিল শুভ্রকে একা পাওয়ার। লাইব্রেরিতে একটি বই খুঁজতে গিয়ে দেখে,শুভ্র বসে আছে। একা। বই সামনে খোলা। কিন্তু তার মন বইয়ে নেই। নিধি পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর পরেও একই ভঙিতে বসে থাকে। কিছু বলতে গিয়েও নিধি নিজেকে সংবরন করে।
গ্রীষ্মের খরতাপ চোখ ধাঁধিয়ে দিলেও আকাশের মন হয়তো ভীষণ ভালো। গাঢ় নীল রঙের সাগর যেন। তার নীচে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ নতুন পাতার সজীবতা নিয়ে বেশ অহংকারে নিজেদের সৌন্দর্য জানান দিচ্ছে। মৃদু বাতাসে উড়ছে নিধির খোলা চুল। সবুজ, নীলের এই মেলামেশা, বাতাসের দোলা যে কারো মন ভালো করে দেয়ার কথা। কিন্তু কোন এক অজানা কারনে মনটা খারাপ হয়ে যায় নিধির। বুদ্ধিজীবী চত্বরে বসে আড্ডা দিচ্ছে ওদের দলটি। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় ওদিকেই।
কি রে! একা কেন? শুভ্র কই? ওদের কাছে যেতেই জানতে চায় রোহিত।
লাইব্রেরিতে দেখে এলাম। বই খুলে প্রেমিকার কথা ভাবছে। মুখে হাসি ফুটিয়ে রসিকতার সুরে উত্তর দেয় সে।
তুই থাকতে আবার কার কথা ভাববে! দুষ্টুমিটা ভালোই লাগে নিধির। কথাটি শুভ্রর মুখ থেকে শোনার জন্য অপেক্ষা নিধিরও। হয়তো কোন একদিন নিধিকেই বলতে হবে। মনে মনে নিজেকে তৈরি করতে থাকে সে। কিছু সময় পরেই শুভ্র এসে যোগ দেয় তাদের সাথে।
বাহ! বেশ জমিয়ে আড্ডা চলছে!
তুই নাকি লাইব্রেরিতে বসে প্রেমিকার কথা ভাবছিস?
কে বললো! শুভ্র কিছুটা আশ্চর্য হয়ে বললো।
তোর পাশে আমি দাঁড়িয়েছিলাম জানিস?
তুই গিয়েছিলি! কই দেখিনি তো!
খুব মনোযোগ দিয়ে তুই কিছু ভাবছিলি। তাই ডিস্টার্ব করিনি। নিধির কথায় কিছুটা নার্ভাস দেখায় শুভ্রকে। কথা ঘুরিয়ে বলে,ক্লাসের সময় হয়ে এলো। চল্ সবাই।
তিনটার ক্লাস শেষ করে ট্রেন ধরতে গিয়ে দেখে সিট খালি নেই। আজ আবার সদলবলে বাসে। শুভ্র বসেছে নিধির পাশে। হাসিঠাট্টা,গল্পগুজব করতে করতে ফিরছে সবাই। এক ফাঁকে শুভ্র নিধিকে বলে,
তোর সাথে কিছু কথা আছে নিধি।
হঠাৎ খুব ফর্মাল হয়ে গেছিস! বল, কি বলবি।
না। এখানে নয়। কাল বলবো। একা আসবি।
তাহলে কি অপেক্ষা শেষ হলো? দ্রিম দ্রিম তাল নিধির বুকে। বাসায় ফেরার পরও শুভ্রর কথাগুলো রিনিঝিনি সুরে বাজতে থাকে মনের ভেতর। ভালোবাসা কি সুরের ঝংকার তুলে আসে জীবনে! এত ভালোলাগা না হয় কিসের! রাতে ঘুমোতে গিয়ে চোখ জোড়া লাগতে চায় না। রাতটি যেন অনন্তকালের। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে অবশেষে ভোর চোখ মেললো। সকালটা অপূর্ব সুন্দর লাগে। সাতটার ট্রেন ধরতে হবে। গোলাপি রঙের সেলোয়ার কামিজের সাথে মিলিয়ে কপালে পরে গোলাপি টিপ। চোখের কাজল টানা শেষ করে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখে আরেকবার। তোমার এত সুন্দর হওয়ার কোন অধিকার নেই! নিজেকেই নিজে শাসিয়ে ছোটে ট্রেন ধরতে।
ট্রেনেই শুভ্রর ফোন আসে। ক্যম্পাসে নেমে লাইব্রেরি চত্বরে থাকার কথা বলে ফোন কেটে দেয়। ট্রেন থেকে নেমেই নিধি ক্লাসের দিকে না গিয়ে শুভ্রর বলে দেয়া জায়গায় এসে পৌঁছে। শুভ্র আসেনি এখনো। গ্রীষ্মের তাপ অসহ্য লাগলেও প্রকৃতির সাজ দেখে মন এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। কাছের একটি গাছ সোনালু ফুলে ছেয়ে আছে। নিধি গিয়ে গাছটির নিচেই দাঁড়ায়। কৃষ্ণচূড়ায় ছেয়ে যাওয়া গাছগুলো সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এদিক সেদিক। আজ সবকিছু যেন অন্যরকম সুন্দর!
গোলাপি সাজে তোকে তো দারুণ লাগছে! শুভ্র কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারেনি। টিপ পরতে এই প্রথম দেখলাম তোকে। খুব মানিয়েছে জামার রঙের টিপ!
লজ্জায় মুখে গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়ে নিধির। শুভ্র এভাবে আর কখনো বলেনি। রূপের তারিফ কার না ভালো লাগে! কিন্তু নিধির মন আকুল হয়ে ওঠে সেই কান্খিত কথা শুনতে। বলে,
হয়েছে। এবার বল কি বলবি।
নিধি! গম্ভীর হয়ে আসে শুভ্রর স্বর। আমি একজনকে ভালোবাসি।
সে তো আমরা সবাই বুঝেছি। এ জন্যেই ডেকেছিস?
হ্যাঁ। তোকে আমার মায়ের সাথে কথা বলতে হবে। মা কিছুতেই মেনে নিচ্ছে না আমার আর রুপার সম্পর্ক।
চারদিক হঠাৎ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে নিধির চোখে। কানের ভেতর কেউ যেন সীসা ঢেলে দিয়েছে। সোনালু ফুল, কৃষ্ণচূড়ার রঙ মুহুর্তে মলিন হয়ে যায়। কোনমতে নিজেকে সামলিয়ে বলে,
রুপা!
হ্যাঁ। কলেজ থেকেই আমাদের সম্পর্ক। সেদিন ওর সাথে কথা বলার সময় মা শুনে ফেলে। আমি অনেক চেষ্টা করেছি বোঝতে। কিন্তু মা তোকেই পছন্দ করে। আর আমি রুপাকে ছাড়া আর কাউকেই ভালোবাসতে পারবো না। প্লিজ! মা’কে তুই বুঝিয়ে বল!
আমি কি বলবো!
বলবি তুই অন্য কাউকে ভালোবাসিস?
মিথ্যে বলবো? কন্ঠ ম্লান নিধির।
আমার জন্যে পারবি না?
এক মুহুর্তও এখানে দাঁড়াতে ইচ্ছে করেনা নিধির। চোখ ফেটে জল নেমে আসতে চাইছে। আরেকজনের ভালোবাসার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে চায় না নিধি। ওখান থেকে দ্রুত সরে আসার জন্যে বলে,ঠিক আছে। বলবো। বলে আর দাঁড়ায় না।
নিধি চলে যাচ্ছে। বাতাসে উড়ছে তার খোলা চুল, গোলাপি ওড়না। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শুভ্র দেখতে পায় না অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে নিধির কপোল বেয়ে। তার স্বপ্নিল চোখ দেখে বাতাসে উড়তে থাকা নিধির খোলা চুল আর ওড়নায় খেলছে আনন্দের ঢেউ। ধীরে ধীরে নিধি মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে। বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে তার ওড়না বেয়ে নামা কষ্টগুলো। উপরের নীল আকাশ ছুঁয়ে আছে দিগন্ত। নির্জন পথ ধরে নিধি চলে যাচ্ছে দূরে,আরো দূরে..

রুনা তাসমিনা, গল্পকার, প্রাবন্ধিক।