দেশের সচেতন মানুষ মাত্রেই জানেন, সেই বিপদের কথা তা হলো, রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগে বাাগেরহাটের রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কাজ শুরু করছে সরকার। ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি বর্তমান প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে রাষ্ট্রয় সফরের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতে ভারতীয় সহযোগিতা ও বিনিয়োগের আহ্বান জানান। সে অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি ২০১০ ভারতীয় জ্বালানী সচিবের বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ( পিডিবি) ও ভারতের রাষ্ট্রীয় সংস্থা ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কোম্পানী (এনটিপিসি) যৌথভাবে এই তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রকল্পের স্থান চুড়ান্ত হওয়ার পর ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে রামপালে ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহন এবং বসত বাড়ি উচ্ছেদ মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়। সুন্দরবনের বাঘের খ্যাতি বিশ্ব জুড়ে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া বন উজাড়, শিকারীদের আক্রমন ইত্যাদির নানা কারণে এই বাঘের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। বিশ্বের মাত্র ১৪ টি দেশে বাঘ নামক প্রানীটি টিকে আছে। কিছু দিন আগে বিশ্ব বাঘ দিবস পালনের সময় পত্র-পত্রিকায় খবর এসেছে যে বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা কমছে। বাংলাদেশের অংশে ( ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটারে) সুন্দরবনে ৪০০ বাঘ থাকার কথা থাকলেও এখন সব মিলে রয়েছে ১০৬টি। শুধু বাঘ নয় গোটা সুন্দরবনের অস্তিত্ব নিয়ে দেশের সচেতন মানুষ এখন অদ্বিগ্ন। উদ্বিগ্ন সারা বিশ্বের পরিবেশ সচেতন মানুষেরাও। এইবার বিশ্ব বাঘ দবসের স্লোগান ছিল বাঘ রক্ষা কর, সুন্দর বন রক্ষা কর। সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে নৌযান চলাচল বেড়ে যাওয়ায় বাঘের ও অন্যান্য প্রানীরা ভয়াবহ হুমকির মুখে আজ। গত ৯ ডিসেম্বর শ্যালা নদীতে সাড়ে তিন লক্ষ লিটার তেল ভর্তি জাহাজ ডুবির ও এই বছর জুলাইতে মরাভোলা নদীতে ৭০০ টন পটাশ সারবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে ঐ অঞ্চলের নদীগুলোর জলজপ্রানী সহ আশেপাশের পরিবেশের বিরুপ প্রতিক্রয়া পড়েছে। বিলুপ্তির পথে ইরাবতী ডলফিনসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন ও শুশুক । যারা ওই অঞ্চলের নদীগুলোতে বাস করে। এদের অস্তিত্বের উপর আঘাত এসেছে সাথে সাথে আঘাত এসেছে গোটা পরিবেশের উপর। সুন্দর বনের পাশ ঘেঁষে মাত্র ১৪ কিলেমটার দুরে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হতে যাচ্ছে। দুনিয়ার সব সভ্য ও সচেতন দেশেই বনভুমির নকটস্থ জায়গায় অথ্যাৎ পচিশ কিলোমিটারের মধ্যে এই রকম পরিবেশ দুষণকারি স্থাপনা নিষিদ্ধ। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ সাড়ে চার বছর ধরে চরছে। নির্মাণের মালামাল, যন্ত্রপাতি, কয়লা সহ যাবতীয় নির্মাণ সামগ্রী সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদীপথে পরিবহন করায় সময় নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরন, শব্দ দূষণ, আলো বর্জ্য নিঃসরন, পানি উত্তোলন, ড্রেজিং ইত্যাদির মাধ্যমে সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম বিশেষ করে পুরো পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। একটি দেশের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার জন্য বনায়ন থাকার কথা ২০-২১ ভাগ । বাংলাদেশে আছে মাত্র ৮-১০ ভাগ। সুন্দরবনকে বলা হয় বাংলাদেশের ফুসফুস। দেশের জন্য প্রকৃতির দেয়াল, সিড়র-আইলার মতো ঘূর্ণিঝড় ও জ্বালোচ্ছাস থেকে পুরো দেশকে রক্ষা করে। সুন্দরবনের কাঠ, গোলপাতা, বাঁশ, বেত, মধু ইত্যাদি সংগ্রহ করে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা নির্বাহ করে। অভাবের তাড়নায় মুনাফা লোভীদের পাল্লায় পড়ে অনেক সময় গরব মানুষ নিজেদের কিডনি বিক্রি করে। সুন্দর বন ধংশ হওয়ার পথে এখন। আর সুন্দরবনের পাশে পরিবেশ দূষণের জন্য সারাবিশ্ব জুড়ে লাল তালিকাভুক্ত কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের নিয়ে আমরা কি তেমনি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি? সুন্দরবনের পাশে এত বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে যে লক্ষ লক্ষ টন কয়লা পোড়ানো হবে তাতে কালো ধোঁয়া বাতাসে দূষিত হবে। নির্গত হবে সালফার ডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। কয়লার চাই মাটি ও পানিকে বিষাক্ত করবে। কয়লার বিষ ক্রিয়া ধীরে ধীরে সুন্দরবনের মৃত্যু হলে সারা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হবে। তাই বাংলাদেশের ফুসফুস কে বাচাতে হলে, দেশকে বাচাতে হলে, সুন্দরবনের সুন্দর প্রজাতীকে বাচাতে হলে অবশ্যই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন বন্ধ করতে হবে।
