তাকে প্রথমে বলা হয়েছিল ক্ষমা চাইতে। তিনি রাজি হননি। এরপর বলা হয়, বিবৃতি প্রত্যাহার করতে। তাতেও তিনি অনড় থাকেন। কাল ঢাকায় নেমে চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট পদে ইস্তফা দিয়েছেন আহম মুস্তফা কামাল। ‘যারা গঠনতন্ত্রবিরোধী কাজ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে এবং ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে’ তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে জানান। বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ একের পর এক বিতর্কিত আম্পায়ারিংয়ের শিকার হয়ে ছিটকে পড়ে। কামাল প্রশ্নবিদ্ধ আম্পায়ারিংয়ের কঠোর সমালোচনা করে আইসিসির রোষানলে পড়েন। তারই জের ধরে বিশ্বকাপ বিজয়ীদের হাতে ট্রফি তুলে দেয়ার অধিকার কেড়ে নেয়া হয় তার কাছ থেকে। কামালকে বঞ্চিত করে চ্যাম্পিয়নদের হাতে ট্রফি তুলে দেন আইসিসির চেয়ারম্যান এন শ্রীনিবাসন। এদিন দেশে ফিরে বিমানবন্দরে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, ‘১৬ কোটি মানুষকে ‘ছোট’ করে আমি এই পদে থাকতে চাই না।’ তার কথায়, ‘বাংলাদেশের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে।’বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক সভাপতি কামাল হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে সাংবাদিকদের তার পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আইসিসির ৩.৩(বি) ধারা অনুযায়ী, বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের ট্রফি তুলে দেয়ার দায়িত্ব সভাপতির। এই দায়িত্বের বিচ্যুতি ঘটার কোনো সুযোগ নেই। সেই হিসেবে গত রোববার মেলবোর্নে বিজয়ী দলকে ট্রফি দেয়ার কথা ছিল আমার। কেন দিতে পারিনি আপনারা জানেন। সবাই জানে।’ আবেগমাখা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি পদত্যাগ করলাম। আমি এখন আর আইসিসির প্রেসিডেন্ট নই।’ ভারত ম্যাচে আম্পায়ারদের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের তদন্তে সুবিধার জন্যই তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে জানান।আইসিসি থেকে এদিন জানানো হয়, মুস্তফা কামালের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে। আইসিসির প্রধান নির্বাহী ডেভ রিচার্ডসন পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আইসিসির প্রধান নির্বাহী বরাবর পদত্যাগপত্র পাঠান কামাল। ডেভ রিচার্ডসন জানিয়েছেন, পদত্যাগপত্রে আইসিসির সদ্য সাবেক হওয়া প্রেসিডেন্ট মুস্তফা কামাল কারণ হিসেবে একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যা বলে উল্লেখ করেন।একই সঙ্গে তিনি আইসিসিতে তার সহযোগী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং বন্ধুপ্রতীম সবার কাছে অসময়ে পদত্যাগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং তাদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছেন, আইসিসির কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই তার।রিচার্ডসন জানান, পদত্যাগপত্রে কামাল লিখেছেন, ‘আইসিসির নেতৃত্বে ক্রিকেট প্রত্যেকটি ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়স্পর্শ করে যাচ্ছে এবং তাদের ভালোবাসা অর্জন করছে।’ আইসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ১৫ এবং ১৬ এপ্রিল দুবাইয়ে আইসিসির বোর্ড সভায় পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করা হবে।আইসিসির প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল আগামী জুনে। এর আগে কামাল অস্ট্রেলিয়ায় বলেছিলেন, ‘দেশে ফিরে সব বলব।’ ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ নিয়ে যা ঘটেছে, তাতে আইসিসির সভাপতির পদে ইস্তফা দেয়া কি উচিত? সাংবাদিকদের কাছে এমন প্রশ্ন করেন মুস্তফা কামাল। সাংবাদিকরা তাকে পদত্যাগ করার পরামর্শ দেন। এর ফলে আইসিসির সঙ্গে কামালের ছয় বছরের সম্পর্কের অবসান হল। তিন বছর আইসিসির সদস্য ছিলেন তিনি। দু’বছর সহ-সভাপতি। আর প্রায় ৯ মাস ছিলেন সভাপতি।মুস্তফা কামাল বলেন, ‘ক্রিকেট একটি গৌরবময় খেলা। এর একটি আইন রয়েছে। সেখানে একজন সভাপতির কী দায়িত্ব, তাও স্পষ্ট লেখা আছে। গঠনতন্ত্রের ৩.৩(বি) ধারা অনুযায়ী আইসিসি আয়োজিত সব টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন দলের হাতে ট্রফি তুলে দেয়ার একমাত্র দায়িত্ব সভাপতির। কিন্তু আইসিসি সভাপতি হিসেবে আমাকে ওই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ফাইনালের আগের দিন এক ঘণ্টার নোটিশে আইসিসির সভা ডাকা হয়েছিল। সেখানে আইসিসির চেয়ারম্যান এন শ্রীনিবাসন ছিলেন। তিনি আমাকে বলেন, আমার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। নতুবা বিবৃতি প্রত্যাহার করতে হবে। আমি বললাম, ১৬ কোটি মানুষের জন্য এমন বিবৃতি দিয়েছি। তাদের বাদ দিয়ে প্রত্যাহার করতে পারব না। শ্রীনিবাসন তখন বলেন, তাহলে আপনি ট্রফি দিতে পারবেন না। আমি বললাম, এখানে সভাপতি হিসেবে এসেছি। সভাপতি ছাড়া ট্রফি দেয়ার অধিকার কারও নেই। এটা গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী। গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করতে চাইলে পূর্ণ ১০ সদস্যের আট সদস্যের সম্মতি লাগবে। এরপর বার্ষিক সভায় সেটা তুলতে হবে। আর সেই সভার সভাপতিত্ব আমিই করব। সেদিনের মন্তব্যের জন্য আপনারা আমার কাছে কৈফিয়ত চাইতে পারেন। কিন্তু দেশের ১৬ কোটি মানুষের আবেগ এবং আমাদের ক্রিকেটের স্বার্থে আমি তাদের এই অন্যায় দাবি দুটির কোনোটিতেই রাজি হইনি। আমি যা বলেছি, তা বুঝেশুনেই বলেছি। আমাদের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি এর বিচার যেন আমরা পাই।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের ম্যাচে জায়ান্ট স্ক্রিনে জিতেগা ভাই জিতেগা, ইন্ডিয়া জিতেগা- কথাটি ভেসে উঠছিল বারবার। মেলবোর্নের মাঠে নরিজবিহীনভাবে স্পাইডার ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়নি। অন্যান্য ম্যাচে যেসব টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেসব প্রযুক্তি সেদিন ছিল না। আমি তাৎক্ষণিকভাবে আইসিসির সিইওকে এসব বিষয় জানিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলি। কিন্তু কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’ মুস্তফা কামাল বলেন, ‘গ্যালারিতে আইসিসি মানে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল লেখা প্লাকার্ড ছিল- এই ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে মিডিয়া আমাকে চেপে ধরে। আমি তখন বলেছি, আমি ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি নই। হতেও চাই না। আইসিসি যদি ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল হয়, তাহলে তো আমার সভাপতি থাকার প্রশ্নই আসে না। ফাইনালের দিন মাঠে যখন ঘোষণা করা হয়, শ্রীনিবাসন চ্যাম্পিয়ন ট্রফি তুলে দেবেন, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত ৯০ হাজার দর্শক একবাক্যে বলেছে, মানি না মানি না। দর্শকদের এই ভূমিকা শুধু ক্রিকেটের গৌরবই উজ্জ্বল হয়নি, বাংলাদেশকে আরেকবার বিশ্বের দরবারে নতুন করে চেনাল।’ট্রফি তুলে দেয়া দূরে থাক, পুরস্কার বিতরণী মঞ্চেই রাখা হয়নি কামালকে। শ্রীনিবাসনকে একহাত নিয়েছেন মুস্তফা কামাল। শ্রীনিবাসনের বিরুদ্ধে আইসিসির গঠনতন্ত্র লংঘনের অভিযোগ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের পরিকল্পনামন্ত্রীর কথা, ‘ওইদিন ওই পচা-নোংরা লোকটাকে দর্শকদের রোষানলের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন শচীন টেন্ডুলকার। এই বিতর্কিত ব্যক্তিটি শুধু আইসিসিতেই নয়, নিজের দেশেও দুর্নীতিপরায়ণ ও মামলায় জর্জরিত। এ ধরনের ব্যক্তি ক্রিকেটের দায়িত্বে থাকলে বিশ্ব ক্রিকেটের উন্নতি হবে না। ক্রিকেট মুখ থুবড়ে পড়বে। আমার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সত্যটা বেরিয়ে আসবে বলে আমি মনে করি। মানুষ গবেষণা করবে, আইসিসিতে কী রহস্য ছিল? কোন ধরনের নোংরা মানুষগুলো বিশ্ব ক্রিকেটকে কলুষিত করেছে?’
বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে বেশকিছু আপত্তিকর সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন ম্যাচের দুই আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড ও আলিম দার, যা বাংলাদেশের বিপক্ষে গেছে। ম্যাচ শেষে আম্পায়ার ও আইসিসির ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন মুস্তফা কামাল। গত বছর তার দায়িত্ব নেয়ার আগেই আইসিসি সভাপতির প্রায় সব নির্বাহী ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে। নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন চেয়ারম্যানের একটি পদ নতুনভাবে সৃষ্টি করা হয়। ওই পদেই আসীন হন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সভাপতি এন শ্রীনিবাসন, যিনি বিতর্কিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত। বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে কিনা- সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘এটা খেলাধুলার ব্যাপার। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর এই ঘটনার কোনো প্রভাব পড়বে না।’
উল্লেখ্য, আগের দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইসিসির আচরণকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন।
উৎস- যুগান্তর

