দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাচারের শিকার হয়ে সাগরে অসহায়ভাবে নৌকায় ভাসতে থাকা প্রায় ৭ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে এক বছরের জন্য আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিতে রাজি হয়েছে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। থাইল্যান্ডও আর কোনো অভিবাসী নৌযান তাড়িয়ে দেবে না। ‘অভিবাসী সংকট’ নিয়ে বুধবার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত কয়েক দিন ধরে অভিবাসী নৌযান উপকূল থেকে তাড়িয়ে দেয়ায় সমালোচনার মুখে পড়ে তিন দেশ। এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ইউএনএইচসিআর। এদিকে অভিবাসী ইস্যু নিয়ে সুর নরম করেছে মিয়ানমারও। এক্ষেত্রে সাহায্যে এগিয়ে আসার এবং ব্যাংকক সম্মেলনে যোগ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। এদিন ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের উপকূলে দু’দফায় প্রায় ৬৩৩ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে সেদেশের জেলেরা। যারা দু’মাস ধরে নৌকায় ভাসতে ছিল। এ নিয়ে গত দু’সপ্তাহে প্রায় তিন হাজার অভিবাসী উদ্ধার হলেন। এএফপি, বিবিসি, ব্যাংকক পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ানসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও মালয়েশিয়া থেকে যুগান্তর প্রতিনিধি মো. আখতার হোসেনের পাঠানো খবর-মানব পাচার নিয়ে সাম্প্রতিক সংকটের পথ খুঁজতে কুয়ালালামপুরে ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিফা আমান, ইন্দোনেশিয়ার রিন্টো মার্সুদি এবং থাইল্যান্ডের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী তানাসাক প্রতিমাপ্রগর্ন। তিনটি দেশই অভিবাসীদের সবরকম সহায়তার প্রতিশ্র“তি দিয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক সহায়তায় আগামী এক বছরের মধ্যে তারা অন্য কোনো দেশে তাদের আবাস খুঁজে নিতে পারে।বৈঠক শেষে মালেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিফা আমান অভিবাসী প্রত্যাশীদের আশ্রয় দেয়ার কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া সাগরে ভাসা অভিবাসী প্রত্যাশীদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দেবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় আগামী এক বছরের মধ্যে এ আশ্রয় পাওয়াদের পুনর্বাসন এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে আনতে হবে।’ তিনি জানান, দেশটির বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন এখনও সাগরে প্রায় ৭ হাজার অভিবাসী ভাসছেন। তবে নতুন করে কেউ সাগরে যাত্রা করলে তাদের আর গ্রহণ করবে না তারা।আনিফা আমান অভিবাসী সংকট তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘দ্রুত মানব পাচারকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ জাহিদ এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গা অভিবাসী প্রত্যাশীদের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সবার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, ‘যদিও এসব অভিবাসনে ইচ্ছুক এই সম্প্রদায়টি অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে এবং আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করছে, তারপরও তাদের ভালোভাবে জীবনধারণের প্রচেষ্টাকে অগ্রাহ্য করা উচিত নয়।’মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিফা আমানকে উদ্ধৃত করে দেশটির স্টার অনলাইন জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় এক বছরের জন্য এ পুনর্বাসন কর্মসূচি নেয়া হবে।গত দু’সপ্তাহে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ পাচারকারীদের নৌকায় করে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মাটিতে নামতে পারলেও এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মানুষ আন্দামান সাগর ও থাই উপকূলে আটকা পড়ে আছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ধারণা। নৌকায় ভাসতে থাকা মানুষদের অবস্থা নিয়েও সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে। প্রধানত মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পালিয়ে এসব দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের সঙ্গে অনেক বাংলাদেশীও মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছেন।গত কয়েক দিনে ওই তিন দেশের উপকূলরক্ষীরা মানুষবোঝাই বেশ কিছু নৌকা উপকূলে ভিড়তে না দিয়ে গভীর সাগরে ঠেলে দেয়, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। ইউএনএইচসিআর, ওএইচসিএইচআর, আইওএম এবং মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে সাগরে বিপদগ্রস্ত এই মানুষদের প্রাণ বাঁচানো এবং মানবাধিকার রক্ষার জন্য ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডেও নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।ইন্দোনেশিয়ায় আরও ৪৩৩ জন উদ্ধার : বুধবার সকালে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের উপকূলে ৬৩৩ বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়, যারা দুই মাস ধরে খাবার ও পানি ছাড়া নৌকায় আটকে ছিলেন। আচেহ প্রদেশের জেলেরা তাদের উদ্ধার করে। স্থানীয় কর্মকর্তারা সংবাদ মাধ্যমকে জানান, দুই দফায় দুটি নৌযান থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে গত দুই সপ্তায় প্রায় তিন হাজার অভিবাসী উদ্ধার হলেন।উদ্ধার অভিযানে থাকা স্থানীয় মৎস্যজীবী তেউকু নায়েক ইদ্রিস বলেন, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা খুবই দুর্বল। অনেকে অসুস্থ। তাদের শরীর হাড্ডিসার হয়ে গেছে। তারা জানান, তাদের কিছু সহযাত্রী না খেয়ে মারা গেছেন।’প্রথম দফার উদ্ধার প্রসঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার তল্লাশি ও উদ্ধার কর্মকর্তা খাইরুল নোভা বলেন, স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে ১১২ জনকে উদ্ধার করে উপকূলে নিয়ে আসা হয়। তাদের মধ্যে ৩০ জন শিশু ও ২৬ জন নারী ছিলেন। তাদের পূর্ব আচেহ জেলার একটি গ্রামে নেয়া হয়েছে।সাদিকিন নামের অপর এক কর্মকর্তা জানান, প্রথম ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর আরেক দল অভিবাসন-প্রত্যাশীকে একটি ভাসমান নৌযান থেকে উদ্ধার করা হয়। তাদের বহনকারী নৌযানটি উপকূল থেকে ৪০ মাইল দূরে ছিল। তাদের পূর্ব আচেহ জেলার জালুক এলাকার একটি বন্দরে নিয়ে আসা হয়েছে।দ্বিতীয় দফায় উদ্ধার হওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীদের সম্পর্কে ইন্দোনেশীয় কর্মকর্তা সাদিকিন বলেন, ‘নৌযানটি সমুদ্রে ওঠা-নামা করছিল। ইঞ্জিন ছিল বিকল। তাদেও দেখে মৎস্যজীবীদের মায়া হয়। তাদের অসুস্থ ও দুর্বল দেখাচ্ছিল। কেউ কেউ ডায়রিয়ায় ভুগছেন বলে মনে হয়। তারা খাবার ও পানির অভাবে ছিলেন। তাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু রয়েছেন।’ব্যাংকক সম্মেলনে যোগ দেবে মিয়ানমার : আঞ্চলিক অভিবাসী সংকট সমাধানে প্রথমবারের মতো সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে মিয়ানমার। এত দিন দেশটি এই সংকটের দায় অস্বীকার করে আসছিল। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতির বরাত দিয়ে জানায়, আঞ্চলিক অভিবাসী সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের সঙ্গে একমত ইয়াঙ্গুন। সমুদ্রে যারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, তাদের মানবিক সহায়তা দিতে মিয়ানমার প্রস্তুত। আঞ্চলিক অভিবাসী সংকটের দায় প্রশ্নে মিয়ানমার যে কিছুটা নমনীয় হয়েছে, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতিটি সেটাই ইঙ্গিত করছে।এদিকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আগামী ২৯ মে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে যোগ দিতেও রাজি হয়েছে মিয়ানমার। থাই উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডন প্রামুদউইনাই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গত সপ্তাহে মিয়ানমানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের প্রধান মাজ জাও বলেছিলেন, তারা অভিবাসী সংকটের জন্য দায়ী নয় এবং রোহিঙ্গাদের দায় তাদের ঘাড়ে চাপালে ব্যাংকক সম্মেলনেও যোগ দেবে না তারা। সোমবার মিয়ানমারের অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল এনএলডির এক মুখপাত্র ‘দেশহীন মুসলিম জনগোষ্ঠীকে’ নাগরিকত্বের সুযোগ দেয়ার জন্য দেশটির সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।মিয়ানমার উপকূলে জিম্মি ২০০০ অভিবাসী -জাতিসংঘ : এক মাসেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমারে প্রায় ২০০০ অভিবাসী জিম্মি আছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। তারা অনাহার ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ভিভিয়ান তান এএফপিকে জানান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উপকূলে ৪০ দিন ধরে অন্তত ৫টি নৌকায় কমপক্ষে ২০০০ অভিবাসী জিম্মি অবস্থায় আছেন বলে তারা খবর পেয়েছেন। তারা খাবার স্বল্পতা, পানিশূন্যতা এবং সহিংসতার শিকার বলে জানান তিনি। এসব অভিবাসী বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা মুসলিম বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভিভিয়ান জানান, এসব অভিবাসী মানব পাচারকারীদের হাতে জিম্মি রয়েছেন। ১৮০ থেকে ২৭০ ডলার (১৪,০০০-২১,০০০ টাকা) না দেয়া পর্যন্ত তাদের ছাড়া হবে না। –
উৎস- যুগান্তর

