খবরিকা ডেক্সঃ
চীনের কাছ থেকে কেনা আধুনিক দু’টি সাবমেরিন গতকাল নৌবাহিনীর ফ্লিটে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে নতুন যুগে পদার্পণ করল বাংলাদেশ নৌবাহিনী। গতকাল চট্টগ্রামে নৌ ঘাঁটি ঈশা খাঁয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বানৌজা নবযাত্রা’ ও ‘বানৌজা জয়যাত্রা’ নামের সাবমেরিন দুটির কমিশনিং ফরমান হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রী এ অনুষ্ঠানে সাবমেরিন দুটির জন্য বেইজ সাপোর্ট ফ্যাসিলিটিজের উদ্বোধন এবং ডুবোজাহাজের জন্য পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটি ‘বিএনএস শেখ হাসিনার’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
বিশ্বের ৪১তম দেশ হিসেবে সাবমেরিন ক্ষমতার মালিক হল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নৌবাহিনী আগে দ্বিমাত্রিক ছিল। ০৩৫ জি টাইপ ডিজেল ইলেকট্রিক অ্যাটাক সাবমেরিন দুটি যুক্ত হবার ফলে নৌবাহিনী এখন ত্রিমাত্রিক শক্তি হিসেবে যাত্রা শুরু করলো। ‘নবযাত্রা’ এবং ‘জয়যাত্রা’ দৈর্ঘ্যে ৭৬ মিটার, প্রস্থে ৭ দশমিক ৬ মিটার। সাবমেরিন দুটি’র সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় প্রায় ১৭ নটিক্যাল মাইল এবং ডিসপ্লেসমেন্ট ১ হাজার ৬০৯ টন। টর্পেডো ও মাইন অস্ত্রে সজ্জিত এই সাবমেরিন দু’টি শত্রু জাহাজ ও সাবমেরিনে আক্রমণ করতে সক্ষম। এছাড়া এ সাবমেরিনগুলো শত্রু জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণসহ বিশেষ যুদ্ধকালীন দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে। এই সাবমেরিন দু’টি নৌবহরে অন্তর্ভুক্তির ফলে দেশের বিশাল জলসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সার্বিক সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ব্লকসমূহে অধিকতর নিরাপত্তাসহ সার্বিকভাবে দেশের ব্লু ইকোনমি উন্নয়নে এই সাবমেরিন দু’টি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
চীনের ইবাদা ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের উচাং শীপইর্য়াডে এক ডজন টাইপ ০৩৫ জি (মিং ক্লাস) সাবমেরিন বানানো হয়েছিল ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে। এর মধ্যে দুটি কেনার জন্য চীনের সঙ্গে ২০১৪ সালে চুক্তি করে বাংলাদেশ। চীনের দালিয়ান প্রদেশের লিয়াওনান শিপ ইয়ার্ডে গত বছরের ১৪ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদের কাছে সাবমেরিন দুটি হস্তান্তর করেন চীনের রিয়ার অ্যাডমিরাল লিউ জি ঝু। বাংলাদেশ ও চীনের নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ও নাবিকদের যৌথ তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ ও ‘সি ট্রায়াল’ শেষে গত ২২ ডিসেম্বর সাবমেরিন দুটি চট্টগ্রামে আসে। হস্তান্তরের আগে লিয়াওনান শিপ ইয়ার্ডে সংস্কার ও আধুনিকায়ন করে ডুবোজাহাজ দুটির সামরিক ক্ষমতা ও কার্যক্ষমতা বাড়ানো হয়। বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে সাবমেরিন দুটি পেল নতুন নাম।
নবযাত্রার অধিনায়ক কমান্ডার কে এম মামুনুর রশীদ এবং জয়যাত্রার অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাজহারুল ইসলাম গতকাল প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে কমিশনিং ফরমান নেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে ক্রুরা সাবমেরিনে ওঠেন। রীতি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে সাবমেরিন দুটির নামফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবমেরিন যুগে পদার্পণের এই মুহূর্তটি উদযাপন করা হয় বহরের বিভিন্ন জাহাজ থেকে বেলুন উড়িয়ে ও রঙিন আতশবাজি পুড়িয়ে। এরপর জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে সাবমেরিনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে নৌবাহিনীর ত্রিমাত্রিক সক্ষমতা অর্জনের পরিচিতিমূলক একটি প্রদর্শনী দেখেন। এরপর সাবমেরিন দুটিকে স্বাগত জানিয়ে তোপধ্বনি করা হয়।
পরে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, বহিঃশত্রুর আক্রমণের সমুচিত জবাব দিতে বাংলাদেশ সব সময় প্রস্তুত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে জনগণের উন্নয়ন করতে চাই। তবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আমাদের যা যা প্রয়োজন, আমরা সংগ্রহ করব। আমরা কারও সাথে কখনো যুদ্ধে লিপ্ত হতে চাই না। যদি কেউ আমাদের আক্রমণ করে, আমরা যেন তার সমুচিত জবাব দিতে পারি, সেই প্রস্তুতি আমাদের সব সময় থাকবে। এজন্য যা যা করণীয় আমরা করে যাচ্ছি।’ শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে একটি সত্যিকারের ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে রূপান্তরের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, সাবমেরিন অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে তা পূরণ হল। তিনি বলেন, ‘আমাদের সকলের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন-ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী গঠনের অংশ হিসেবে দুটি সাবমেরিন বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে সংযোজন করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’ বিশ্বের গুটিকয় দেশ সাবমেরিন পরিচালনা করে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেই তালিকায় আজ থেকে বাংলাদেশের নাম স্থান পেয়েছে। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার বিষয়।’ বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাতিসংঘের জন্য আন্তর্জাতিক জলসীমায় টহল দিয়ে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘অনন্য নজির স্থাপন করছে’ বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
সাবমেরিনের সকল মিশনের সাফল্য কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাঙালি জাতির ইতিহাস বীরের ইতিহাস। কাজেই আমি নিশ্চিত, আপনাদের দেশপ্রেম, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে এই সাবমেরিন দুটির সর্বোত্তম ব্যবহার আপনারা নিশ্চিত করবেন।’ আন্তর্জাতিক আদালতের মামলার রায়ে মিয়ানমারের কাছ থেকে ১ লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা এবং ভারতের কাছ থেকে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার ওপর কর্তৃত্ব অর্জনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমুদ্রসীমার সম্পদ কাজে লাগিয়ে যেন আমরা আর্থসামাজিক উন্নয়ন করতে পারি। আমরা এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নৌ-বাহিনীকে ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেছি।’
তিনি বলেন, সম্প্রতি চীন থেকে সংগ্রহ করা অত্যাধুনিক করভেট নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করেছে। পাশাপাশি যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণে নিজস্ব সামর্থ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। খুলনা শিপইয়ার্ডে প্রথমবারের মত এলপিসি তৈরির কাজ চলছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চট্টগ্রাম ড্রাইডকে ফ্রিগেট নির্মাণ প্রকল্পের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশ অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী গঠনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের সময়ে হেলিকপ্টার ও মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফ্ট নিয়ে গঠিত হয় নেভাল এভিয়েশন। এর বহরে শিগগিরই আরও মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফট ও আধুনিক সমর সরঞ্জাম সম্বলিত হেলিকপ্টার যুক্ত করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ও নাবিকদের আবাসন এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা নৌ-অঞ্চলে বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের কথাও প্রধানমন্ত্রী বলেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম নৌঘাঁটিতে পৌঁছলে নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ এবং চট্টগ্রাম নৌঘাঁটির কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. আবু আশরাফ প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
প্রধানমন্ত্রীকে নৌবাহিনীর একটি চৌকস দল এ সময় রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়। প্রধানমন্ত্রী পরে নৌ-কমান্ডোদের মহড়া প্রত্যক্ষ করেন। দুটি হেলিকপ্টার এবং দুটি এমপিএ বিমান মহড়ায় অংশগ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় সাবমেরিন রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় সহায়তার জন্য স্থাপনার উদ্বোধন এবং বিএনএস শেখ হাসিনা নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সাবমেরিন ঘাঁটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তিনি সাবমেরিন দুটি ঘুরে দেখেন এবং সাবমেরিনের যাবতীয় সক্ষমতার বিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়।
অনুষ্ঠানে নৌবাহিনীর ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র এবং দেশ ও জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, সরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, সম্পাদক এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ, কূটনীতিক, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সুত্র- দৈনিক আজাদী

