Tuesday, July 28Welcome khabarica24 Online

আব্দুল জব্বারকে হাজার সালাম

ওরে নীল দরিয়া, আমায় দে রে দে ছাড়িয়া…’ নীল দরিয়া ছেড়ে দিয়েছে তাকে। চলে গেলেন বাংলাদেশের কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার।

জীবন্ত কিংবদন্তি আব্দুল জব্বার বুধবার সকালে বঙ্গুবন্ধ শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ছিলেন কণ্ঠসৈনিক আব্দুল জব্বার। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই কেন্দ্র থেকে তার গাওয়া ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়…’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম…’ মুক্তিযোদ্ধাদের অণুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এসব গান এখনো বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের গান। স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিতে চির অম্লান থাকবে তার গাওয়া গান। লাল-সবুজের মাঝে আব্দুল জব্বার রবেন চির অমর।

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় রয়েছে মহান শিল্পী আব্দুল জব্বারের গাওয়া তিনটি গান- তুমি কি দেখেছো কভু, জীবনের পরাজয়…, সালাম সালাম হাজার সালাম, জয় বাংলা বাংলার জয়..।

বাংলা চলচ্চিত্রে গাওয়া তার অসংখ্যা বিখ্যাত গান রয়েছে। তার কণ্ঠ সময়কে অতিক্রম করে নতুন সময়েও সমান জনপ্রিয়। ১৯৬২ সালে তিনি প্রথম চলচ্চিত্রে গান করেন। তবে ১৯৫৮ সাল থেকে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন।

বেতারশিল্পী হিসেবে আব্দুল জব্বারের গায়কী জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা হলেও চলচ্চিত্রের গানেই তিনি বেঁচে আছেন এবং থাকবেন। ২২টি জনপ্রিয় সিনেমায় তিনি প্লেব্যাক করেছেন। ১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র সংগম-এর গানে কণ্ঠ দেন তিনি। ১৯৬৮ সালে ‘এতটুকু আশা’ সিনেমায় সত্য সাহার সুরে তার গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছো কভু, জীবনের পরাজয়…’ বাঙালির হৃদয়ে ঠাঁই করে নেয়। এই গানের মধ্য দিয়ে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আব্দুল জব্বার ঐতিহাসিক পথে যাত্রা শুরু করেন। তার কণ্ঠজাদুতে বাংলা গান যে মহিমান্বিত হবে, তার প্রমাণ ছিল এই গান।

১৯৬৮ সালে আরেকটি গান গেয়ে সংগীতাঙ্গনে নিজের দরাজ কণ্ঠের গ্রহণযোগ্যতা অন্য পর্যায়ে উন্নীত করেন আব্দুল জব্বার। সে বছর ‘পিচ ঢালা পথ’ চলচ্চিত্রে ‘পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি…’ গানে কণ্ঠ দেন। গানটির সুরকার ছিলেন রবীন ঘোষ।

১৯৬৮ সালে তার গাওয়া আরেকটি গান সুপারহিট হয়। ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’ সিনেমায় ‘যেও নাকো আর কিছুক্ষণ থাকো…’ গানে কণ্ঠ দেন আব্দুল জব্বার। গানটির সুরকার ছিলেন রাজা হোসেন খান।

প্রায় ৪০ বছর ধরে বাংলাদেশের সর্বমহলে যে গানটি সমান জনপ্রিয়, সেটি হলো আব্দুল জব্বারের ‘ওরে নীল দরিয়া, আমায় দে রে দে ছাড়িয়া, বন্দি হইয়া মনোয়া বধূ হায়রে কান্দে রইয়া রইয়া…’। ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রে আলম খানের সুরে গানটি গেয়েছিলেন তিনি।

চার দশকে সব সময়ই তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে ফিরেছে এই গান। কী আড্ডা, কী সংগীতানুষ্ঠান এই গানের কদর কখনোই কমেনি। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের মনের কথা যেন বলা হয়েছে এই গানে। সেই নীল দরিয়া আজ ছেড়ে দিয়েছে তাকে। কোটি কোটি ভক্ত, অনুসারী ও অনুরাগী রেখে তিনি চলে গেলেন। তার কণ্ঠে বাংলা গান যে উচ্চতার আসন পেয়েছে, সেই উচ্চতায় তিনিও সমাদৃত হবেন সব সময়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্ররেণা জোগাতে তার কণ্ঠে গাওয়া গান অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে। তার গানে উজ্জীবীত হয়ে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। সেই সময় ভারতের শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে মুম্বাইয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন তিনি।

মহান হৃদয়ের এই শিল্পী বাংলাদেশকে কতটা ভালোবেসেছেন, তার প্রমাণও আমরা পেয়েছি। ভারতের পথে পথে গণসংগীত পরিবেশন করে ১২ লাখ রুপি সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। সেই অর্থ তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের তহবিলে দান করেছিলেন। জীবনে সবসময় নির্মোহ থেকেছেন তিনি। খুব বেশি সহায়-সম্পত্তি নিজের করে রাখেননি কখনো। শেষ সময়ে তার চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন গ্রুপ তার পাশে দাঁড়ায়। এই পাশে দাঁড়ানো শুধুই তার প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা থেকে। বাংলা গানে তার অসামান্য অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল জব্বার। তার প্রথম স্ত্রী শাহিন জব্বার ছিলেন একজন গীতিকার। তাদের সন্তান মিথুন জব্বার। তার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন রোকেয়া জব্বার, যিনি ২০১৩ সালে ইন্তেকাল করেন।

সংগীতশিল্পী হিসেবে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন আব্দুল জব্বার। ১৯৮০ সালে একুশে পদক পান তিনি। ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। তবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত থাকা অবস্থায় ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক লাভ করেন আব্দুল জব্বার। এ ছাড়া জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন তিনি।

দরাজ ও দরদি কণ্ঠেই তাকে ধারণ করবে বাংলাদেশ। শেষ বেলায় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের সম্মানে, সালাম সালাম হাজার সালাম।