রবিবার, ৯ মে ২০২১, ২৬ বৈশাখ ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

খন্দকার মাহবুব সেলিমা রহমান মিলন ও নাজিমউদ্দিন গ্রেফতার

6999
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনকে গ্রেফতার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। মঙ্গলবার বেলা সোয়া ২টার দিকে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের এক অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে বের হওয়া মাত্রই জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই অপর এক অভিযানে বারিধারার একটি অফিস থেকে গ্রেফতার হন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন ও নাজিমউদ্দিন আহমেদ। সন্ধ্যায় গুলশানের নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলনে ১২ ঘণ্টা হরতাল বৃদ্ধির ঘোষণার পরই গোয়েন্দা পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে যায়। সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা বিএনপির এ নেতাদের গ্রেফতারের পর মিন্টো রোডে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যান। অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ মিছিল করে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী সংগঠন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। ‘৫ জানুয়ারির কলঙ্কিত নির্বাচন’ শীর্ষক ওই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি সরকার ও বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের তীব্র সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, বেলা সোয়া ২টার দিকে ওই অনুষ্ঠান শেষে তিনি সচিবালয় সংলগ্ন গেট দিয়ে বাইরে বের হন। এ সময় সাদা পোশাকের কয়েকজন গোয়েন্দা পুলিশ তাকে ঘিরে ধরে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা মুহূর্তের মধ্যেই খন্দকার মাহবুবকে একটি গাড়িতে তুলে নেয়।
খন্দকার মাহবুবকে আটকের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের নেতাকর্মীরা। ওই ঘটনার পর থেকে প্রেস ক্লাব এলাকায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনকে গ্রেফতারের দেড় ঘণ্টা মাথায় গোয়েন্দা পুলিশের অপর একটি দল বারিধারায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়। গোয়েন্দা পুলিশ এ সময় ওই অফিস থেকে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন ও নাজিমউদ্দিন আহমেদকে গ্রেফতার করে।
ঘটনার সময় বিরোধী দলের চিফ হুইপের অফিসে উপস্থিত মহিলা দলের নেত্রী শিরীন সুলতানা জানিয়েছেন, ওই ভবনের তৃতীয় তলায় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক ছাড়াও বিএনপির সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফউদ্দিন নিজান, লায়ন হারুনুর রশিদ, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, নির্বাহী কমিটির সদস্য নাজিমউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ওই অফিসে অভিযান চালিয়ে সবাইকে নিচে নিয়ে যায় এবং গাড়িতে তোলে। প্রায় আধা ঘণ্টা গাড়িতে বসিয়ে রেখে ফজলুল হক মিলন ও নাজিমউদ্দিন আহমেদকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেয়া হয়। এ সময় গোয়েন্দা পুলিশ তাদের জানায়, ‘আপনাদের আর দরকার নেই।’ পরে তাদের দু’জনকে মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের মিন্টো রোডে গোয়েন্দা কার্যালয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান তাদের গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, বিরোধী দলের ঢাকা অভিযাত্রা ও সমাবেশের আগের দিন ২৮ ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে খন্দকার মাহবুব ‘উস্কানিমূলক’ বক্তব্য দেন। পরের দুই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা, সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। এই অভিযোগেই মূলত তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিএনপি নেতা ফজলুল হক মিলন ও নাজিমউদ্দিন আহমেদকে কোন অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছুই বলেননি উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান।
বামনায় হরতাল : বামনা প্রতিনিধি জানান, বিএনপির চেয়াপারসনের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আজ বরগুনার বামনা উপজেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বামনা উপজেলা বিএনপি। মঙ্গলবার বিকাল পাঁচটায় সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের কাছে এ ঘোষণা দেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ রানা।
পাথরঘাটায় হরতাল : পাথরঘাটা (বরগুনা) প্রতিনিধি জানান, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আজ পাথরঘাটায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে পাথরঘাটা উপজেলা বিএনপি। মঙ্গলবার দুপুর সোয়া তিনটার দিকে সাংবাদিকদের কাছে এ ঘোষণা দেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী মোঃ ফারুক।
সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী মোঃ ফারুক আরও জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খন্দকার মাহবুব হোসেনকে মুক্তি দেয়া না হলে আরও কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেয়া হবে উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে।
রামগঞ্জে হরতাল : লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আহমেদকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আগামীকাল বুধবার জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে ১৮ দলীয় জোট। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া, জেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হারুনুর রশিদ ব্যাপারী ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা মফিজুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
খন্দকার মাহবুবসহ গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দাবি : বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেনকে আটক করার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তার মুক্তি দাবি করেছেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি। তাকে গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার বিকাল সোয়া তিনটার দিকে সমিতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি এজে মোহাম্মদ আলী এ দাবি জানান। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ভোটারবিহীন প্রহসনমূলক নির্বাচনের পর এই বেপরোয়া আটকের ঘটনা সরকারের ভবিষ্যতের দুরভিসন্ধিমূলক কাজের বহিঃপ্রকাশ। গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে সরকার এভাবে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েমের দিকে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের কারাবন্দি করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে যে তামাশা ও নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে, তা মিডিয়ার সুবাদে গোটা বিশ্ব ও দেশের ১৬ কোটি নাগরিক প্রত্যক্ষ করেছেন। নজিরবিহীন কলঙ্কিত এ ধরনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে কথা বলার প্রতিবাদে খন্দকার মাহবুব হোসেনের মতো একজন প্রবীণ আইনজীবীকে গ্রেফতার সরকারের অগণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকারবিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে বলে জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে সমিতির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রফিকুল হক তালুকদার রাজাসহ অন্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি নাজিমউদ্দিন আহমেদ, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং ফজলুল হক মিলনকে আটক করায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ১৮ দলীয় ঐক্যজোটের অন্যতম নেতা ও এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম।
বিএনপির তিন নেতাকে গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ এক বিবৃতিতে বলেন, বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার যে ঘোষণা আওয়ামী লীগ দিয়েছিল এ গ্রেফতার অভিযান তারই অংশ। আমি সরকারের এ গ্রেফতার অভিযানের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

উৎস-যুগান্তর

Leave a Reply