বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

সুইস ব্যাংকে জমানো টাকার খোঁজ নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক

pic-18_98855

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা রাখা টাকার বিস্তারিত খোঁজ নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই টাকা বাংলাদেশি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের; সেই টাকা পাচার করা কি না, সেসব খোঁজও নেওয়া হবে। প্রয়োজনে দেশটির সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় এ পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ফিনানসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুইজারল্যান্ড বা অন্য কোনো দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে বা ব্যবসা করে- এমন বাংলাদেশি নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান যেকোনো বিদেশি ব্যাংকে টাকা জমা করতে পারে। আমরা দেখব, বাংলাদেশে বসবাসরত কেউ সুইস ব্যাংকে টাকা জমা করেছেন কি না এবং করলে সেটা কেন করেছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হলেও অন্য দেশের ব্যাংক থেকে তথ্য পেতে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। সুইস সরকারের সঙ্গে আমাদের কোনো এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) নেই। তাদের কাছ থেকে তথ্য পেতে হলে আগে এমওইউ স্বাক্ষর করতে হবে। আমরা চেষ্টা করছি সেটা করার।’
উল্লেখ্য, এগমন্ট গ্রুপ হলো মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে গঠিত বিভিন্ন দেশের ফিনানসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটগুলোর একটি ফোরাম।
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’-এর (এসএনবি) প্রকাশিত ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৩’ শিরোনামে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্যে দেখা যায়, সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে ৬২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ভারতীয়দের অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।
এতে আরো দেখা যায়, ২০১৩ সাল শেষে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের অন্তত ৩৭ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ গচ্ছিত রয়েছে, যা প্রায় ৪১ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা তিন হাজার ১৬২ কোটি ৩৭ লাখ টাকার সমান।
এর আগে ২০১২ সাল শেষে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অন্তত ২২ কোটি ৮৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ জমা ছিল, যা প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা এক হাজার ৯০৮ কোটি টাকার সমান। আর ২০১৩ সালে ভারতীয়দের ১৯৫ কোটি ২৮ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা ২১৭ কোটি ৩২ লাখ ডলার গচ্ছিত ছিল। এটি ভারতীয় মুদ্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কোটি রুপি। ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৩৪ কোটি সুইস ফ্রাঁ বা ১৪৩ কোটি ডলার। এটি ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার কোটি রুপি। এর বাইরে গত বছর ভারতীয়দের সাত কোটি ৭০ লাখ সুইস ফ্রাঁ গচ্ছিত রাখা ছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। তবে বাংলাদেশের এ ধরনের কোনো অর্থ সেখানে গচ্ছিত নেই।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের লোকজন সুইস ব্যাংকগুলোতে টাকা জমা রাখে। বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ টাকা জমা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে এসেছে সেটাই প্রকৃত তথ্য নয়, এর থেকে বেশিও হতে পারে আবার কমও হতে পারে। তবে যেটুকুই জমা হোক না কেন, ভবিষ্যতে যেন অর্থপাচার কমে আসে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কেবল বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, সরকারের যেসব গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে তাদের সবাইকে নিয়ে আইনের মধ্যে থেকে অর্থপাচার কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।’ ইব্রাহিম খালেদ আরো বলেন, ‘সুইস ব্যাংক থেকে টাকার তথ্য আনা খুব একটা সহজসাধ্য কাজ নয়। টাকা ফেরত আনাতো আরো কঠিন। তবে এখন যেহেতু অর্থপাচার নিয়ে নানা ধরনের কথা হচ্ছে, সেহেতু এই প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করতে চেষ্টা করতে পারে।’
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় বিভিন্ন দেশের বিপরীতে ‘দায়’ অথবা ‘গ্রাহকের কাছে দেনা’ হিসাবের খাতে থাকা অর্থকে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক বা এসএনবি সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে রাখা গচ্ছিত অর্থ হিসেবে বিবেচনা করেছে। এতে দেখা যায়, গত বছর সারা বিশ্ব থেকে সুইস ব্যাংকগুলোয় গচ্ছিত অর্থের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৩ হাজার কোটি সুইস ফ্রাঁ বা এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি ডলার। ২০১২ সাল শেষে এর পরিমাণ ছিল এক লাখ ৪০ হাজার কোটি সুইস ফ্রাঁ বা প্রায় এক লাখ ৫৫ হাজার কোটি ডলার।
তবে জানা গেছে, বাংলাদেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান নিজ নামে কোনো অর্থ গচ্ছিত না রেখে অন্য কোনো দেশের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে রাখে, তাহলে তা এই হিসাবের মধ্যে আসবে না। তাই সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া বাংলাদেশিদের তিন হাজার কোটিরও বেশি টাকার হিসাব সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত বা পাচার হয়ে যাওয়া অর্থের পূর্ণ পরিমাণ নির্দেশ করে না। তা ছাড়া সুইস ব্যাংকে রাখা মূল্যবান শিল্পকর্ম, স্বর্ণ বা দুর্লভ সামগ্রীর আর্থিক মূল্যমান হিসাব করেও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেক দেশের নাগরিকই মূল্যবান শিল্পকর্ম বা দুর্লভ সামগ্রী সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকের ভল্টে রেখে থাকেন।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকের মধ্যে ২০১৩ সালেই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি অর্থ গচ্ছিত ছিল। এর আগে সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ ছিল ২০০৭ সালে। সে বছর সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা দুই হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি।
দেশে অর্থ পাচার প্রতিরোধ কার্যক্রমে তৎপরতা পরিলক্ষিত হলেও প্রতিবছর অর্থ পাচার বাড়ছেই। গত বছরের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ : ২০০২-২০১১’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ২৮০ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। আর এর আগের বছর পাচার হয়েছিল ২১৯ কোটি ১০ লাখ ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, দেশে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাওয়ায় অর্থ পাচার বাড়ছে।