রবিবার, ৯ মে ২০২১, ২৬ বৈশাখ ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

রিজওয়ানার স্বামী গভীর রাতে উদ্ধার

pic-40_74002
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণের ৩৫ ঘণ্টা পর নাটকীয়ভাবে উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ধানমণ্ডি কলাবাগান মাঠের কাছে রাস্তা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে ধানমণ্ডি থানার ওসি আবু সালেহ মাসুদ শেখ কালের কণ্ঠকে বলেন, রাত দেড়টার দিকে কলাবাগান মাঠের পাশের একটি চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ আবু বকর সিদ্দিককে উদ্ধার করে। এরপর তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর থানায় নিয়ে আসা হয়। মাসুদ শেখ আরো জানান, তিনি সুস্থ আছেন এবং তার সাথে আমরা কথা বলেছি।
শেষ খবরে জানা যায়, রাত ৩টা ৫০ মিনিটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়।
জানা যায়, গতকাল রাত সাড়ে ১২টায় মিরপুর আনসার ক্যাম্পের সামনে অপহরণকারীরা চোখ বাঁধা অবস্থায় আবু বকর সিদ্দিককে রাস্তায় ফেলে চলে যায়। এ সময় অপহরণকারীরা তার হাতে তিনশ টাকা দিয়ে যায়। এরপর তিনি চোখের বাঁধন খুলে একটি রিকশা ডাকেন। রিকশাচালককে ধানমণ্ডি সেন্ট্রাল রোড যাবেন বলে জানান। কিন্তু রিকশাচালক তাকে মিরপুর কাজিপাড়ার দিকে নিয়ে চলে যায়। ভুল পথে যাচ্ছেন বুঝতে পেরে আবু বকর সিদ্দিক ওই রিকশা থেকে নেমে যান। পরে তিনি আরেকটি রিকশা নেন। সে রিকশা নিয়ে কিছু দূর এগুতে একটি সিএনজি চোখে পড়ে। তখন তিনি সিএনজি থামিয়ে চালককে জানান, তিনি অপহৃত হয়েছিলেন, ধানমণ্ডির বাসায় পৌঁছে দিতে হবে। ওই সিএনজি চালক হাফিজুল ইসলাম দ্রুত তাকে গাড়িতে তুলে নেন। কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে পৌঁছলে সেখানে পুলিশের এএসআই বাবুল রহমান সিএনজিটি থামান। তল্লাশির উদ্যোগ নিলে আবু বকর সিদ্দিক নিজের পরিচয় জানান এবং বাসায় পৌঁছে দিতে বলেন। এ সংবাদ পেয়ে পুলিশ টিমের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয় এবং তারা ধানমণ্ডি থানায় খবর দেন।
ইন্সপেক্টর (তদন্ত) অশোক কুমার চৌহান সেখানে পৌঁছে দেখতে পান ছেঁড়া পোশাক, খালি পা, হাতে একটি গামছা নিয়ে জড়োসড় হয়ে বসে আছেন আবু বকর সিদ্দিক। এরপর চৌহান তাকে থানায় নিয়ে তার স্ত্রী রিজওয়ানার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন।
এ সময় আবু বকর সিদ্দিক জানান, সাত আটজনের একটি দল চোখ বেঁধে তাকে গাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে একটি বাসায় আটকে রাখে। পুরোটা সময় চোখ বাঁধা অবস্থায় থাকায় তিনি কাউকে চিনতে পারেননি।
এরপর স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, অপহরণকারীরা পুরোটা সময় তার চোখ বেঁধে রেখেছিল। টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অপহরণকারী নিজেদের মধ্যে কথা বলেছে। তবে মুক্তিপণ বিষয়ে কিছুই জানাননি।
উদ্ধারের পর পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, মিরপুর এলাকায় অপহরণকারীরা তাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে ফেলে যায়। এরপর ধানমণ্ডি এলাকার একটি চেক পোষ্ট এক সিএনজি চালকসহ তাকে উদ্ধার করা হয়।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান বলেন, রাত ১১টার দিকে অপহরণকারীরা আবু বকর সিদ্দিককে চোখ বাঁধা অবস্থায় মিরপুরের আনসার ক্যাম্প এলাকায় ফেলে যায়। সেখান থেকে তিনি রিক্সায় এসে একটি সিএনজি নেন। সি এনজি  চালক হয়তো তাকে তার বাসার উদ্দেশে নিয়ে যাচ্ছিল বলে আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। ওই অবস্থায় কলাবাগান চেকপোস্টে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এরপর সিএনজি চালকসহ তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
ফতুল্লা থানার ওসি আক্তার হোসেন রাত ২টার দিকে কালের কণ্ঠকে জানান, রাত দেড়টার দিকে ধানমণ্ডি থানা পুলিশ আবু বকর সিদ্দিককে উদ্ধার করে থানায় রেখেছে। আমাদের একটি টিম সেখানে যাচ্ছে।
এদিকে রাত সোয়া দুইটার দিকে রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার সর্দার  মারুফ হোসেন জানান, আবু বকর সিদ্দিককে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তার স্ত্রীসহ স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েছে। এবং অনুসন্ধান দলের প্রধান ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান ও নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম তার সঙ্গে এখন কথা বলছেন।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দাদের সমন্বিত অভিযানের কারণে অপহরণকারীরা হয়তো আবু বকর সিদ্দিককে ফেলে রেখে গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত আমরা তা খতিয়ে দেখছি।
দ্রুত উদ্ধারের সম্মিলিত দাবি:  রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক উদ্ধার হওয়ার আগে গতকাল দিনের বেলায় তাঁকে দ্রুত উদ্ধারের দাবিতে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা সংবাদ সম্মেলন করে। এ সময় রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমার পরিবারের যে সদস্যকে অপহরণ করা হলো তাঁর কোনো দোষ নেই। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে আমি জানি, তাঁর কোনো শত্রু নেই। আমার কর্মকাণ্ডে সমর্থনই তাঁর অপরাধ। এ কারণেই তাঁকে অপহরণ করা হতে পারে।
সুনির্দিষ্টভাবে কারো বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ করেননি উল্লেখ করে রিজওয়ানা বলেন,  ‘কেউ আমার কাছে মুক্তিপণ দাবি করেনি। কেউ হুমকিও দিচ্ছে না। তবে কিছু ফোন থেকে বিভিন্ন রকম তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এসব আমি তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানিয়েছি। তদন্তের স্বার্থে এখন এ বিষয়টি প্রকাশ করতে চাইছি না।
গতকাল বিকেলে রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক-ইন-সেন্টারে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দের’ ব্যানারে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে রিজওয়ানা আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ওকে (স্বামী আবু বকর সিদ্দিক) ফিরে পেতে আশাবাদী। আমি এখনো সবার দৃশ্যত সমর্থন পাচ্ছি।
আবু বকর সিদ্দিকের দ্রুত ও অক্ষত উদ্ধারের দাবি জানিয়ে সুধীসমাজের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন। উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান এবং ফোনে সম্মতি জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ৪৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক। সংবাদ সম্মেলনের সঞ্চালক, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সবার পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ অপহরণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ভূঁইয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে একদল দুর্বৃত্ত তাঁকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাঁকে উদ্ধারের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সম্প্রতিক সময়ে দেশে অপহরণ ও গুমের ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। প্রকাশ্য দিবালোকে এ ধরনের অপহরণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আস্থাহীনতার সংকটের মুখে ফেলেছে।’
 ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, অপহরণের শিকার মানুষের তালিকায় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ব্যক্তির পাশে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শীর্ষ পরিবেশকর্মীর স্বামীর এমন অপহরণে আজ দেশবাসী উৎকণ্ঠিত ও মর্মাহত। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় তৎপরতায় অপহৃত আবু বকর সিদ্দিককে অনতিবিলম্বে উদ্ধার করে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা অর্জনের সুযোগ করবেন, এই দাবি ও প্রত্যাশা করছি। আমরা এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
কারো নাম দেইনি : সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমার সাংঘাতিক সময়ে যারা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। গণমাধ্যম আমার পাশে সব সময়ের জন্য থাকায় আমি তাদেরও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
এদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলেন, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে খোঁজা হচ্ছে আবু বকরকে। এ ঘটনা তদন্তে গতকাল পুলিশের পাঁচ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। র‌্যাবের কয়েকটি ব্যাটালিয়ন সারা দেশে অনুসন্ধান শুরু করেছে। সীমান্ত এলাকাসহ বন্দরগুলোতে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। তবে রহস্যের কোনো কিনারা হচ্ছে না। গতকাল যাত্রাবাড়ীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে অপহরণকাজে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি শনাক্ত করেছে পুলিশ। তবে ওই মাইক্রোবাসের নম্বর ছিল ভুয়া।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কালের কণ্ঠকে বলেন, রিজওয়ানা হাসানের দাবি মতে, তাঁর বিরোধী কোনো পক্ষ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আবু বকর সিদ্দিকের কর্মস্থলে কোনো বিরোধ বা ব্যক্তিগত বিরোধ আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
রহস্যঘেরা গাড়ি : নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম বলেন, নীল রঙের মাইক্রোবাসটিতে করে সিদ্দিককে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর সেটি যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার অতিক্রম করেছে। ফ্লাইওভারের টোল প্লাজার সিসি ক্যামেরায় গাড়িটির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। গাড়ির যে নম্বর প্লেট ছিল সেটি ধরে তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে সেটি ভুয়া। বিআরটিএ চট্টগ্রাম অঞ্চলের অফিসে যোগাযোগ করা হলে উপপরিচালক মো. জামাল উদ্দিন পুলিশকে জানান, নম্বরটি (চট্ট মেট্রো-গ-১৭-৮৩২৭) ভুয়া।
নারায়ণগঞ্জের এসপি বলেন, অপহরণকারীরা অনেক দক্ষ ও পেশাদার। পরিকল্পনা করেই আবু বকরকে অপহরণ করা হয়েছে- এমনটাই প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।
সূত্র জানায়, ভুয়া নম্বরের গাড়ির পাশাপাশি স্ত্রী রিজওয়ানা হাসানের দায়ের করা মামলায় অভিযোগ সূত্র এবং আবু বকরের কর্মস্থল হামিদ ফ্যাশনে কোনো ব্যবসায়িক বিরোধ আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আবু বকর সিদ্দিক ফতুল্লার দাপা এলাকায় অবস্থিত হামিদ ফ্যাশন লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যবসা নিয়ে কারো সঙ্গে প্রকাশ্য কোনো বিরোধ নেই বলে দাবি করছেন রিজওয়ানা হাসান।
একটি সূত্র জানায়, অপহরণের আগে আবু বকর কার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন সেটি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তিনি কোনো হুমকির শিকার হয়েছিলেন কি না তাও জানার চেষ্টা চলছে। আবু বকর সিদ্দিকের গাড়িচালক রিপনকে পুলিশ ও র‌্যাব হেফাজতে কয়েক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এখনো তিনি প্রশাসনের নজরদারিতে আছেন।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ র‌্যাব-১১-এর ইনচার্জ লে. কর্নেল তারেক সাঈদ সাংবাদিকদের বলেন, র‌্যাব তাদের সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ঘটনা জানার পরই অনেকগুলো টিম মাঠে নেমেছে।
তদন্তে উচ্চপর্যায়ের টিম : সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আন্তর্জাতিক পুরষ্কারপ্রাপ্ত হওয়ায় তাঁর স্বামী অপহরণের ঘটনা রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান দায়িত্বশীলরা। সীমান্ত এলাকায় জারি করা হয়েছে বিশেষ সতর্কতা। তল্লাশি চলছে রাজধানীসহ পাঁচটি জেলায়। তদন্তে গতকাল পর্যন্ত পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে টিম গঠন করা হয়েছে। মাঠে নেমেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি জালাল আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, এ ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যায় ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মারুফ হাসানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে। এ টিমের অন্য সদস্যরা হচ্ছেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম, র‌্যাব-৩-এর মেজর সাদিকুর রহমান, নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমান ও পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান। অনুসন্ধান টিম ফতুল্লা থানার তদন্ত কর্মকর্তাকে তদন্তে সহযোগিতা করবে বলেও জানান জালাল আহমেদ চৌধুরী।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এ টি এম হাবিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘র‌্যাবের একাধিক টিম এ ঘটনায় মাঠে কাজ করছে। একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা হিসেবে অনেক গুরুত্ব দিয়ে আমরা আবু বকর সিদ্দিক সাহেবকে খুঁজছি।’
আইনজীবীদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম : আবু বকর সিদ্দিককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুস্থভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি আগামী রবিবার দেশের সব আইনজীবী সমিতিতে মানববন্ধনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধন থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের উদ্যোগে এ মানববন্ধন করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের নেতৃত্বে সমিতি এ কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে।
সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল : আবু বকর সিদ্দিকের সন্ধান দাবিতে গতকাল সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আধাঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখে হামিদ ফ্যাশনের শ্রমিকরা। ওই সময় সড়কে তীব্র যানজট লেগে যায়। পরে তারা বিক্ষোভ মিছিল করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করে। শ্রমিকরা দ্রুত আবু বকরকে অক্ষত ফিরে পেতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
ফখরুল বললেন, দেশবাসী পরিস্কাভাবে জানতে চায় : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণ করা হয়েছে। দেশবাসী এই অপহরণের ঘটনা পরিস্কারভাবে জানতে চায়। তিনি বলেন, গুমের বিষয়টিকে জাতিসংঘ মানবতাবিরোধী হিসেবে মনে করে। এ ধরনের কাজের জন্য বর্তমান সরকারকে মানবতাবিরোধী হিসেবেও দায়ী থাকতে হবে।
শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া : আবু বকর সিদ্দিক অপহরণ ঘটনায় বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনকে সন্দেহের তালিকায় রাখায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সংগঠনের কয়েকজন নেতা। তবে অ্যাসোসিয়েশনের অধিকাংশ নেতা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য কামাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেহেতু রিজওয়ানা হাসান ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেহেতু তিনি যে কাউকেই সন্দেহ করতে পারেন। এতে আমাদের প্রতিক্রিয়া দেখানোর কিছু নেই। এ ঘটনা আমার পরিবারে ঘটলে আমিও আশপাশের কাউকে না কাউকে সন্দেহ করতাম। এটাই বাস্তবতা।’
গত বুধবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার হামিদ ফ্যাশন থেকে নিজ গাড়িতে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন আবু বকর সিদ্দিক। গাড়িটি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দেলপাড়া এলাকায় ভূঁইয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে পৌঁছলে অন্য একটি গাড়ি পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। তখন ওই গাড়ি থেকে নেমে আসা দুর্বৃত্তরা অস্ত্রের মুখে আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণ করে ঢাকার দিকে চলে যায়। এর পর থেকেই তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনায় বুধবার রাতেই সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আটজনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন।
অপহরণে এরশাদের উদ্বেগ: বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বক্কর সিদ্দিকী অপহরণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
গতকাল এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ঘটনায় জনমনে সংশয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি হচ্ছে। দলমত নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের। তিনি অবিলম্বে আবু বক্কর সিদ্দিকীকে খুঁজে বের করে সুস্থ অবস্থায় পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে ঘৃণ্য এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। অন্য এক বিবৃতিতে জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুও এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। রিজওয়ানার স্বামীকে ‘র’ তুলে নিয়ে যেতে পারে : সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ তুলে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কলামিস্ট ও কবি ফরহাদ মজহার। জাতীয় প্রেসক্লাবে নিউ ইর্য়কভিত্তিক ম্যাগাজিন সাপ্তাহিক বাংলাদেশ আয়োজিত ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংকট : উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি গতকাল এই আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহসভাপতি এম আবদুল্লাহর সঞ্চালনায়  আলোচনায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএফইউজের সভাপতি শওকত মাহমুদ, ফোবানা নিউ ইয়র্ক-২০১৪ এর আহ্বায়ক হাসানুজ্জামান হাসান, পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি কামরুল ইসলাম চৌধুরী, বিএনপি নেতা অধ্যাপক ডা. রফিক চৌধুরী, জাস্ট নিউজের সম্পাদক মুশফিকুল ফজল আনসারী প্রমুখ।