শুক্রবার, ২৫ জুন ২০২১, ১১ আষাঢ় ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

মন্ত্রিত্ব হারাচ্ছেন লতিফ সিদ্দিকী

3_155015
পবিত্র হজ, তাবলিগ জামাত নিয়ে কটূক্তির জেরে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডন থেকে তার এমন অভিপ্রায়ের কথা জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও নেতাদের জানিয়েছেন। আগামীকাল প্রধানমন্ত্রী লন্ডন থেকে দেশে ফিরলে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। পাশাপাশি লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ থেকেও সরিয়ে দেয়া হবে। ক্ষমতাসীন দলের নীতি-নির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মঙ্গলবার বিবিসিকে বলেছেন, ‘সে ধরনের আভাস আছে। কিছু বিশ্বাসযোগ্য সূত্র থেকে খবর পাচ্ছি যে তাকে সরিয়ে দেয়া হবে, এ রকম একটা ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আছে।’
সরকারের একজন নীতি-নির্ধারক যুগান্তরকে জানান, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বর্তমানে মেক্সিকোতে আছেন। নিউইয়র্ক সফর শেষ করে তিনি সেখানে গেছেন। সেখানে বাংলাদেশ সরকারের হয়ে তিনি তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক একটি পুরস্কার গ্রহণ করবেন। নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ তার দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা। তবে এরই মধ্যে তাকে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ের কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
সংবিধানের ৫৮(১)-এর (ক) উপধারায় মন্ত্রীদের পদের মেয়াদ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তিনি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করিবেন।’ আবার ৫৮-এর (২) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী যে কোনো সময়ে কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করিতে অনুরোধ করিতে পারিবেন এবং উক্ত মন্ত্রী অনুরূপ অনুরোধ পালনে অসমর্থ হইলে তিনি রাষ্ট্রপতিকে উক্ত মন্ত্রীর নিয়োগের অবসান ঘটাইবার পরামর্শদান করিতে পারিবেন।’
সূত্র জানায়, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী যদি পদত্যাগ না করেন তাহলে সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় ও নির্দেশনা অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করবে। পরে তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হলে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করবেন। এরপর তা অনুমোদনের জন্য বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ওই ফাইল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ফেরত আসবে। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে তা বিজি প্রেসে পাঠাবে। এটি বিজি প্রেস গেজেট আকারে প্রকাশ করলে মন্ত্রীর অব্যাহতি কার্যকর হবে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ছাড়াও আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময় শেখ হাসিনা-আবদুল জলিল কমিটিতে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন তিনি। এক-এগারোর সময় তার অবস্থান ছিল দলের সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তিনি আক্রমণাÍক বক্তৃতা করে শীর্ষ মহলের নজরে আসেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে টাঙ্গাইল-৪ আসনের এমপি লতিফ সিদ্দিকী সবাইকে চমকে দিয়ে মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নেন। এরপর ২০০৯ সালে দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলে তিনি আবার চমক দেখিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য থেকে পদোন্নতি পেয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। আওয়ামী লীগের অনেকে বাদ পড়লেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রিসভাতে ঠাঁই হয় তার।
মন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই লাগামহীন বক্তব্য ও আপত্তিকর কর্মকাণ্ডের জন্য লতিফ সিদ্দিকী আলোচনায় আসেন। ২০১০ সালে ঢাকায় রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি সাংবাদিকদের গালাগালি করেন। এরপর লতিফ সিদ্দিকী ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, যারা হরতাল দেবে তাদের হত্যা করা হবে। ২৬ জুন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি নারী-পুরুষের পরকীয়া নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সমালোচনা ও কটাক্ষ করে বক্তৃতা করেন ২০ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ এবং উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ বৈঠকে।
এর আগে ২৮ মার্চ লতিফ সিদ্দিকী টাঙ্গাইলে নিজ বাড়িতে পিডিবির এক উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে লাথি মেরে পানিতে ফেলে দেন। এতে পুনয় চন্দ্র নামের ওই প্রকৌশলীর মাথা ফেটে যায়। ওই প্রকৌশলীর ‘অপরাধ’ ছিল তিনি মন্ত্রীর সামনে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রথম মেয়াদে মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নিজের স্ত্রী লায়লা সিদ্দিকীর নামে সরকারি জমি বরাদ্দ দিয়ে ব্যাপক সমালোচিত হন।
সর্বশেষ রোববার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে টাঙ্গাইল সমিতির দেয়া সংবর্ধনা সভায় পবিত্র হজ, তাবলিগ জামাত, প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে কটূক্তি করেন। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করেন। এ ঘটনায় দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের নিন্দা ও ঝড় ওঠে। ইসলামিক পার্টি ও হেফাজতে ইসলাম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লতিফ সিদ্দিকীর অপসারণ দাবি করে। অন্য দলগুলোও তার এ বক্তব্যের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানায়। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তার বক্তব্যের নিন্দা জানান।
মঙ্গলবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ কটূক্তির জন্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতারের দাবি করেন। সেই সঙ্গে তিনি মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে সংবিধান লংঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু কটূক্তির জন্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর অপসারণ দাবি করেন।
বিএনপি নেতারাও আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর পদত্যাগের দাবি তুলেছেন। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে বলেছেন, এ বক্তব্য বাংলাদেশসহ গোটা মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় আবেগে চরম আঘাত ও অসম্মানজনক। এটা আওয়ামী লীগের সত্যিকার চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা এবং তার অপসারণ দাবি করেন।
আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও মন্ত্রীর বক্তব্যে বিব্রত। দলটির ভারপ্রাপ্ত সভানেত্রী ও জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী মঙ্গলবার আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর কটূক্তি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, কে কী বলল তাতে কান দেবেন না। মুখফোঁড় অনেক নেতা আছেন, তারা এমন কথা বলতে পারেন। ওয়াজেদ কে সেটাও আপনারা জানেন, আমাদের নাতি জয় কে, সেটাও আপনারা জানেন। এটা নিয়ে প্রশ্ন করার কিছু নেই।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দল করলে দলের নিয়ম মেনেই করা উচিত। দায়িত্বশীল পদে থেকে দলের জন্য ক্ষতিকর কোনো মন্তব্য কিংবা আচরণ কারও করাই সমীচীন নয়।
তিনি বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তাও ঠিক নয়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য এবং প্রযুক্তি উপদেষ্টা। এছাড়া তিনি দলের ভবিষ্যৎ নেতা। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পরই লতিফ সিদ্দিকীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, নিউইয়র্কের ওই অনুষ্ঠানে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী মুসলমানদের জন্য পবিত্র হজ কীভাবে এলো সে সম্পর্কে বলেন, ‘আবদুল্লাহ পুত্র মোহাম্মদ চিন্তা করল এ জাজিরাতুল আরবের লোকেরা কীভাবে চলবে। তারা তো ছিল ডাকাত। তখন একটা ব্যবস্থা করল আমার অনুসারীরা প্রতি বছর একবার একসঙ্গে মিলিত হবে। এর মধ্য দিয়ে একটা আয়-ইনকামের ব্যবস্থা হবে।’
তিনি আরও বলেন, আমি কিন্তু হজ আর তাবলিগ জামাতের ঘোরতর বিরোধী। আমি জামায়াতে ইসলামীরও বিরোধী। তবে তার চেয়েও হজ ও তাবলিগ জামাতের বেশি বিরোধী। হজে যে কত ম্যানপাওয়ার নষ্ট হয়। হজের জন্য ২০ লাখ লোক আজ সৌদি আরব গিয়েছে। এদের কোনো কাম নাই। এদের কোনো প্রডাকশন নাই। শুধু রিডাকশন করতেছে। শুধু খাচ্ছে আর দেশের টাকা নিয়ে ওখানে দিয়ে আসছে। অ্যাভারেজে যদি বাংলাদেশ থেকে এক লাখ লোক হজে যায় প্রত্যেকের পাঁচ লাখ টাকা করে ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়।
তাবলিগ জামাত সম্পর্কে তিনি বলেন, তাবলিগ জামাত প্রতি বছর ২০ লাখ লোকের জমায়েত করে। নিজেদের তো কোনো কাজ নেই। সারা দেশের গাড়ি-ঘোড়া তারা বন্ধ করে দেয়।
টকশোতে যারা অংশগ্রহণ করেন তাদের ‘..র ভাই’ আখ্যা দিয়ে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘যারা টকশোতে যায়, তারা টকমারানি। নিজেদের কোনো কাজ না থাকায় ক্যামেরার সামনে গিয়ে তারা বিড়বিড় করে। ..র ভাইদের আর কোনো কাজ নেই।’
অনুষ্ঠানে একজন ইন্টারনেটের গতি নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের এ প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘জয় ভাই কে?’ ওই সময় পাশে বসা যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয়। এরপর মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সে করার কে? জয় বাংলাদেশ সরকারের কেউ নয়। এখানে জয়ের কিছু করার নেই। সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কার্যকর করেন মন্ত্রী।’ তিনি বলেন, ‘কথায় কথায় আপনারা জয়কে টানেন কেন?’
অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করায় বারবার উত্তেজিত হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী। এক সাংবাদিককে ধমক দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কি তোমার মতো কথা বলব? আমি আমার মতো কথা বলব। তুমি এখানে আসলা কেন, তোমাকে কে বলেছে আসতে?’
লিগ্যাল নোটিশ : অশালীন মন্তব্য করায় ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন একজন আইনজীবী। মঙ্গলবার সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আশরাফুজ্জামান নোটিশে আগামী সাত দিনের মধ্যে মন্ত্রীকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহবান জানিয়েছেন। অন্যথায় মামলা করতে বাধ্য হবেন বলে উল্লেখ করেন।