শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ৩১ বৈশাখ ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

নূরের বাসা থেকে মাইক্রোবাস জব্দ নারায়ণগঞ্জে হরতাল আজ

21817_f3

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণ মামলার প্রধান আসামি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি নূর হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল সকাল থেকে টানা চার ঘণ্টাব্যাপী এ অভিযানে ওই বাড়ি থেকে একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। আটক করা হয় বেশ কয়েকজনকে। তবে জব্দ তালিকা ও আটকের বিষয়ে কোন তথ্য জানায়নি পুলিশ। অভিযানের সময় ওই বাসায় গণমাধ্যমকর্মীদেরও প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত টানা ৪ ঘণ্টা চলা অভিযানে আটককৃতদের মধ্যে নূর হোসেনের বডিগার্ড, বাড়ির দারোয়ান ও কাজের লোক রয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। নূর হোসেনের বাড়ি থেকে আটককৃত মাইক্রোবাস থেকে বিভিন্ন আলামত, ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করেছে সিআইডির ফরেনসিক দল। এর আগে শনিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন বলেন, কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণের মামলায় মূল আসামি নূর হোসেনের ২ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অপরদিকে একই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অপহৃত এডভোকেট চন্দন সরকারের মোবাইল ফোনটি এক যুবক ব্যবহার করতো। শুক্রবার রাতে তাকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শনিবার বেলা সাড়ে ১২টায় নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণের ঘটনায় ২ জন ও অপহৃত আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের মোবাইলসহ ১ জন এবং কাউন্সিলর নূর হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মাইক্রোবাস উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক।
ওই সময় তিনি বলেন, একটি শার্ট উদ্ধার করা হয়েছে যার মধ্যে অনেক দাগ রয়েছে। সেটা আসলে রক্তের দাগ কিনা পরীক্ষা করে দেখা হবে। এছাড়াও নূর হোসেনের পাসপোর্ট খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান। নারায়ণগঞ্জের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের কিছু সময় দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড় টেকপাড়া এলাকায় অবস্থিত নূর হোসেনের বাড়ির চারপাশ সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ঘেরাও করে রাখে বিপুল সংখ্যক পুলিশ। পরে বেলা ১১টায় সেখানে তল্লাশি শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা। অভিযান বিকাল ৩টায় শেষ হয়।
এ সময় বাসা থেকে একটি ডিপ বোটল গ্রিন কালারের ১৫ আসন বিশিষ্ট হায়েস মাইক্রোবাস, কিছু কাপড়, নাম ইস্যু করা একটি ডিজিটাল পাসপোর্টসহ আরও অনেক কিছু জব্দ করে। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ পরিদর্শক মো. জাকারিয়া বলেন, আনুমানিক ৩০-৩৫ বছর বয়সের ১০-এর অধিক ব্যক্তিকে আটক ও মাইক্রোবাসসহ কিছু মালামাল জব্দ করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে। অভিযানে নূর হোসেনের পরিবারের কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আটকৃতদের নাম ঠিকানা তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা  যাচ্ছে না। তবে তাদের মধ্যে কোন শিশু ও নারী নেই বলে জানান তিনি। দুপুর দু’টার দিকে আটককৃতদের দু’টি কালো রঙের কালো কাচ ঘেরা মাইক্রোবাসে করে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ জব্দকৃত মাইক্রোবাস ও বিভিন্ন মালামালের রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য তাদের হেফাজতে নিয়ে যায়।
অভিযান নিয়ে প্রশ্ন
এদিকে নুর হোসেনের বাড়িতে অভিযান নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। তারা বলছেন, ২৭শে এপ্রিল দুপুরে নাসিক কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম তার ৪ সহযোগিসহ অপহৃত হওয়ার পর ২৮শে এপ্রিল রাতে নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় যে মামলা করেন ওই মামলার প্রধান আসামি কাউন্সিল নুর হোসেন। বারবার নজরুলের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি জানোনো হলেও নুর হোসেনের বাড়িতে পুলিশ কোন অভিযান চালায়নি। বরং মঙ্গলবার রাত থেকে নুর হোসেনের বাড়ির সামনে অবস্থান নেয় পুলিশ। শনিবার সকাল পর্যন্ত বাড়িটি পুলিশের নজরদারিতে ছিল। কিন্তু ৫ দিন পর কেন অভিযান চালানো হলো? সূত্র জানায়, যে কোন সময় বাড়িতে অভিযান হতে পারে তাই নুর হোসেন ও তার লোকজন নিরাপদে সটকে পড়ে। সরিয়ে নেয়া হয় তার সব যানবাহন। বিশেষ করে নুর হোসেন ও তার বাহিনী যে ক’টি গাড়ি ব্যবহার করতো সেগুলোও সরিয়ে নেয়া হয়। অথচ অভিযানে জব্দকৃত একটি বটল গ্রিন কালার হায়েস মাইক্রোবাস জব্দ করে পুলিশ বলছে ‘গাড়িতে কিছু আলামত আছে, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে’। কিন্তু সব গাড়ি সরিয়ে নেয়ার পর আলামতযুক্ত গাড়ি জব্দের বিষয়টি রহস্যজনক।
অভিযান লোকদেখানো: নজরুল ইসলামের লাশ পাওয়ার পর সন্দেহভাজন অপহরণকারী আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনের বাড়িতে পুলিশের অভিযানকে ‘লোকদেখানো’ বলে দাবি করেছেন নিহতের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। গতকাল তিনি বলেন, পুলিশ লোকদেখানো অভিযান চালিয়েছে। অপহরণের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা পুলিশকে জানিয়েছিলাম, কিন্তু পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। ব্যবস্থা নিলে আমার স্বামীসহ অন্যদের জীবিত পাওয়া যেতো।
খুনিদের গ্রেপ্তার দাবিতে নাসিক কাউন্সিলরদের ৪৮ ঘণ্টার কর্ম বিরতি
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭জনকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে রোববার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার ৯টা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৪৮ ঘণ্টার এ কর্মবিরতি সিটির ২৭টি ওয়ার্ডেই পালন করা হবে।
শনিবার দুপুরে নগরভবনে নাসিকের প্যানেল মেয়র-১ হাজী ওবায়দুল্লাহর সভাপতিত্বে কাউন্সিলরদের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় ২৮ জন কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন। সভায় বলা হয়, কা্‌উন্সিলর নজরুল ইসলামসহ ৭জনকে অপহরণ করার পর নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। অপহরণের পর নজরুল ইসলামসহ অন্যদের খুঁজে না পাওয়ায় প্রশাসনের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অবহেলাকেই দায়ী করা হয়। লাশ উদ্ধারে পর ৪ দিন পার হয়ে গেলেও অপহরণ ও খুনে ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়্‌।
আজ হরতাল
নারায়ণগঞ্জ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকারের খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে আজ রোববার নারায়ণগঞ্জে হরতাল পালন করবে জেলা আইনজীবী সমিতি। হরতালে বিএনপির নৈতিক সমর্থন রয়েছে। এই নারায়ণগঞ্জে বামদল ছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের সমর্থন রয়েছে।
হরতাল সমর্থনে শনিবার সকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে জেলা আইনজীবী সমিতি।
জেলা আইনজীবী সমিতির সমাবেশে সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমরা আইনজীবী। আমাদের সঙ্গে কোন রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নেই। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল করব। দেশ থেকে সব ধরনের গুম, অপহরণ বন্ধ হোক।
উল্লেখ্য, ২৭শে এপ্রিল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোড থেকে নাসিকের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম তার সহযোগী লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর এবং  অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। বুধবার বিকাল থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর ও চরধলেশ্বরী এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে অপহৃত ৭ জনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।