শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ৪ আষাঢ় ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

ডেমরায় ৮ হাজার মিটার গ্যাস লাইন তুলে নিল তিতাস

2_139392

ডেমরার কোনাপাড়া সংলগ্ন শূন্যাটেংরা, ধার্মিকপাড়া ও মল্লিকবাড়ি গ্রামে মাত্র দুই মাস আগে বসানো প্রায় ৮ হাজার মিটার গ্যাস সংযোগ লাইন সোমবার তুলে নিয়েছে তিতাস গ্যাস এন্ড ট্রান্সমিশন কর্তৃপক্ষ। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে তাদের ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। গ্যাস লাইন তুলে দেয়ার প্রতিবাদে এলাকার কয়েকশ’ নারী-পুরুষ ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়ক অবরোধ করে। তবে পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তিতাস গ্যাসের বিক্রয় বিভাগ-১ এর কিছু কর্মকর্তা, কয়েকজন ঠিকাদার, স্থানীয় চেয়ারম্যান ও রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীরা সাড়ে তিন কোটিরও বেশি টাকা নিয়ে গ্যাসের সংযোগ দিয়েছেন। এখন তারা ওই টাকা আত্মসাতের জন্য সংযোগ লাইন তুলে নিয়েছেন। এদিকে হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে লাইন তুলে নেয়ায় রান্নাবান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকার প্রায় ১২ হাজার মানুষ।
সরেজমিন দেখা গেছে, কোনাপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে শূন্যাটেংরা পর্যন্ত চার ইঞ্চি, তিন ইঞ্চি ও দুই ইঞ্চি ব্যাসার্ধের ৮ হাজার মিটারের বেশি লাইন রয়েছে। সোমবার প্রায় আট হাজার মিটার লাইন তুলে নেয়া হয়। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মাহবুব-উর-রহমানের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্টের একটি দল এসব লাইন তুলে নেয়। এই লাইনে ডেমরার ধার্মিকপাড়া, মল্লিকবাড়ি ও শূন্যাটেংরা এলাকার সাত শতাধিক আবাসিক সংযোগ রয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের দাবি, কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সংযোগ পাইপ তুলে নেয়া হচ্ছে।
এভাবে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে লাইন তুলে নেয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকার মানুষ। বিশেষ করে মহিলারা। সোমবার শত শত মহিলা একজোট হয়ে লাইন তুলে নিতে বাধা দেয়। তারা ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ ধাওয়া করে তাদের কোনাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে শূন্যাটেংরা রোডে নিয়ে যায়। সেখানে চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এ সময় পুলিশের লাঠিচার্জে কমপক্ষে ২০ জন আহত হন।
আহতদের কয়েকজন জানান, রোজার প্রথম সপ্তাহে নতুন এই গ্যাস লাইন বসানো হয়। তাদের বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেয়ার পর হঠাৎ করে সেটি তুলে নেয়ায় তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গ্রাহক বাতাসী বেগম জানান, এলাকায় লাকড়ির সংকট। অনেক বাড়িতে পানি উঠে গেছে। এ অবস্থায় গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়ায় তাদের রান্না বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ মাত্র তিন মাস আগে তিনি এনজিও থেকে সুদে টাকা নিয়ে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করে গ্যাস সংযোগ নিয়েছেন। অথচ অবৈধ বলে দুই মাসের মাথায় লাইন কেটে দেয়া হল।
সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ : স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গ্যাস সংযোগ দেয়ার জন্য তারা প্রথমে ১৫ হাজার টাকা, এরপর তিন দফায় আরও ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। যাদের বাড়ি দূরে তাদের অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। মোর্শেদা নামের এক গ্রাহক জানান, তাদের বাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেয়ার জন্য এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। শূন্যাটেংরা, ধার্মিকপাড়া ও মল্লিকবাড়িতে সাতশ’র বেশি সংযোগ আছে। প্রতিটি সংযোগের জন্য ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি নেয়া হয়েছে। নন্দীপাড়া এলাকার ঠিকাদার নূরুজ্জামান ও রইজ উদ্দিন এবং তিতাস গ্যাসের কিছু লোকজন, স্থানীয় চেয়ারম্যান ও সরকারি দলের নেতাকর্মীরা এসব টাকা নিয়েছে। তারা সাতশ’ সংযোগ দেয়ার জন্য কমপক্ষে সাড়ে তিন কোটি টাকা নিয়েছেন। অথচ সংযোগ দেয়ার দুই মাসের মাথায় লাইন তুলে নেয়া হল। টাকা আত্মসাতের জন্যই সংযোগ দেয়া হয়েছে এবং লাইন তুলে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
স্থানীয় দোকানদার হারেস উদ্দিন বলেন, একটি চক্র সংযোগ দেয়ার নাম করে টাকা নিয়েছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সংযোগ না দিলে কারও সাধ্য নেই সেখানে সংযোগ দেয়া। আবার তারাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে লাইন তুল নিচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা হাবীবুর রহমান বলেন, তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এলাকায় শক্তিশালী চক্র বৈধ-অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মাহবুব-উর-রহমান বলেন, অবৈধ সংযোগ বিছিন্নকরণের অভিযানের অংশ হিসেবে লাইনগুলো তোলা হয়েছে। এর আগেও এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। তবে বিচ্ছিন্নের পর পুনরায় অবৈধ সংযোগ নেয়া হয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত তিতাসের মেট্রো বিক্রয় বিভাগ-১ এর ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম প্রকৌশলী মমিনুল হক বলেন, এর আগেও কয়েকবার ডেমরার বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। কিছুদিন পরই এলাকাবাসী স্থানীয় চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় অসাধু ঠিকাদারদের মাধ্যমে এলাকাবাসী পুনরায় সংযোগ স্থাপন করে নেয়। তারা কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধও শোনে না।