রবিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

সুন্দরবন রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুচ্ছ সুপারিশ

m2ik6xer_166850

 

শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকারডুবির ঘটনায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন যখন হুমকির মুখে, ঠিক সেই সময় মহামূল্যবান এই বন রক্ষায় এক গুচ্ছ সুপারিশ করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার সরেজমিন সুন্দরবন পরিদর্শন শেষে এর বর্তমান অবস্থার বিস্তারিত উল্লেখ করে সুপারিশগুলো পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে পেশ করেছেন। সম্প্রতি জমা দেওয়া এ প্রতিবেদনের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো আন্তমন্ত্রণালয় সভা করে দ্রুত কিভাবে এ বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারে সে বিষয়েও দেওয়া হয়েছে দিকনির্দেশনা। প্রতিবেদনটির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে লেখা একটি চিঠিও সংযুক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি কালের কণ্ঠের হাতে রয়েছে। এতে সুন্দরবন পরিদর্শনে পাওয়া সমস্যা ও করণীয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, সুন্দরবনে একটি গুরুতর সমস্যা হচ্ছে পশুর, শ্যালা নদী দিয়ে অনবরত শত শত অয়েল ট্যাংকার ও অন্যান্য জাহাজ চলাচল করে। ফলে জাহাজের তেল ও অন্যান্য বর্জ্য নিঃসরণ হয়, শব্দদূষণ ও পশু-পাখিদের ক্ষতি করে থাকে। গত ৯ ডিসেম্বর শ্যালা নদীতে মালবাহী জাহাজের ধাক্কায় সাড়ে তিন লাখ লিটার জ্বালানি তেলসহ একটি ট্যাংকার ডুবে গিয়ে তেল ছড়িয়ে পড়ে এবং মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। অবিলম্বে ঘষিয়াখালী চ্যানেলটি ড্রেজিং করে বিকল্প পথ চালু করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনে প্রকৃতপক্ষে কী কী প্রাণী, বৃক্ষ ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্য আছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদি, পরিকল্পিত ও ব্যাপক আকারের গবেষণার প্রয়োজন। সর্বশেষ ২০০২ সালে একটি জরিপ হলেও তাতে সম্পূর্ণ তথ্য উঠে আসেনি। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ইত্যাদি নিয়ে যতগুলো স্টাডি হয়েছে তার একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো মিল নেই।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড ও র‌্যাবের যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের মধ্যে আরো বেশি সমন্বয় প্রয়োজন। সুন্দরবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো সুপেয় পানির অভাব। এ জন্য আরো পুকুর-জলাশয় খনন করা দরকার। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো বন এলাকায় কর্মরতদের মধ্যে শুধু বন বিভাগের কর্মচারীরা কোনো রকম ঝুঁকিভাতা পান না। অথচ তাঁদের পায়ে পায়ে বিপদ। তাঁদের জন্য রেশন ও ঝুঁকিভাতার প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে সুন্দরবনে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জেলে-বাওয়ালিদের চিকিৎসার জন্য কটকা, হিরণ পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহকারী মৌয়ালদের মধু সংগ্রহের জন্য মৌসুমভিত্তিক অনুমতি দেওয়া যেতে পারে বলেও প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবন রক্ষা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা ও তদারকির জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পৃথক একটি ডেস্ক গঠন করা যেতে পারে। গহিন অরণ্যে দায়িত্বরতদের টেলিযোগাযোগের সুবিধার জন্য তিনটি স্থানে টাওয়ার স্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, করমজল হরিণ ও কুমির প্রজনন ও লালনপালন কেন্দ্রের ইনচার্জ ও ডেপুটি ফরেস্ট রেঞ্জার আবদুর রব দীর্ঘ সময় ধরে কুমির প্রজনন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধান করে আসছেন। তাঁর দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ফলে প্রজনন কেন্দ্রে কুমিরদের সুষ্ঠু ও নিবিড় পরিচর্যা করা সম্ভব হচ্ছে। তিনি আগামী ১৬ জানুয়ারি অবসরে যাবেন। তাঁকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে সুন্দরবনে মাছ ধরার ট্রলার ও বোটের ডাটাবেইস তৈরি করে লাইসেন্সিং ও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে মাছ ধরার নৌকার প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে, অন্যদিকে জলদস্যু ও বনদস্যুদের আক্রমণ অথবা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বিপন্ন ট্রলারকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বন বিভাগে কর্মরত বোট-স্পিডবোটের চালকদের ওভারটাইমের ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সুন্দরবনের বিশাল অঞ্চল নিবিড়ভাবে তত্ত্বাবধানে পর্যাপ্ত লোকবলের অভাব রয়েছে। এ ছাড়া বন বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে বিভিন্ন জনমানবশূন্য দুর্গম এলাকায় গড়ে উঠেছে অপরাধচক্র। তাদের মোকাবিলায় বন বিভাগের লোকবল বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরবন সুরক্ষায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে সেগুলোর কম্পোনেন্টগুলো যাচাই-বাছাই করে দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে লেখা যে চিঠিটি সংযুক্ত করা হয়েছে, সেটির নিচে তারিখ দেওয়া আছে ৪.২.৯৯। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘সুন্দরবন। প্রকৃতির দান। একে রক্ষা করতেই হবে। আমার দেশ এত সুন্দর দেশ পৃথিবীতে আর নেই। আমি বড় ভালোবাসি আমার বাংলাদেশকে। সোনার বাংলা গড়বই। জাতির জনকের স্বপ্ন আমরা পূরণ করব। সোনার বাংলা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে ইন্শাল্লাহ।