বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

সালাহ উদ্দিনকে খুঁজে বের করতে সরকারকে হাইকোর্টের রুল

pic-15_198080
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদকে কেন খুঁজে বের করা হবে না এবং তাঁকে কেন আগামী ১৫ মার্চ (রবিবার) সকাল সাড়ে ১০টায় আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হবে না- জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও র‌্যাব মহাপরিচালকসহ আটজনকে আগামী রবিবারের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এ রুল জারি করেন। সালাহ উদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমদের করা এক আবেদনের শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দেন।আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, আদালত রুল জারি করেছেন। এরই মধ্যে সালাহ উদ্দিন আহমদকে খুঁজে পাওয়া গেলে তাঁকে আদালতের সামনে হাজির করতে হবে।সালাহ উদ্দিন আহমদকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে গতকাল হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন হাসিনা আহমদ। তাঁর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এ জে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, রাগিব রউফ চৌধুরী, মাসুদ রানা প্রমুখ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশিরউল্লাহ।
হাসিনা আহমদের আবেদনটি গতকাল সকালে সংশ্লিষ্ট আদালতে উপস্থাপন করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। আদালত দুপুরের পর শুনানির জন্য সময় নির্ধারণ করেন। দুপুর আড়াইটার পর শুনানি শুরু হয়। আবেদনকারীপক্ষ রুল জারির পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে।
শুনানির শুরুতে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সালাহ উদ্দিন আহমদকে মঙ্গলবার রাত সোয়া ১০টার দিকে উত্তরার একটি বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটবর্তী কোনো আদালতে হাজির করা হয়নি। তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে খুঁজে পাচ্ছে না। আমরা সালাহ উদ্দিন আহমদকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের সামনে হাজির করার জন্য রুল জারির আবেদন করছি।’
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ আবেদনের বিরোধিতা করে বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে, সালাহ উদ্দিন আহমদ তাদের হেফাজতে নেই।’ তিনি বলেন, সালাহ উদ্দিন আহমদ দুই মাস ধরে আত্মগোপনে থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করছিলেন। এখন তিনি নিজেই সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে আত্মগোপন করেছেন নাকি কেউ তাঁকে তুলে নিয়ে গেছে- তা জানা নেই। তাই এ বিষয়ে রুল জারির প্রয়োজন নেই। তিনি (সালাহ উদ্দিন) যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক থাকতেন, তাহলে তাঁকে হাজির করার প্রশ্ন উঠত। যেহেতু তিনি পুলিশের হেফাজতে নেই তাই এ আবেদন চলতে পারে না।
এ সময় আদালত বলেন, রাষ্ট্রের একজন নাগরিক নিখোঁজ হলে তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। যদি তিনি (সালাহ উদ্দিন) আত্মগোপনে গিয়ে থাকেন তার পরও তাঁকে খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে না থাকলে হাজির করবে কোথা থেকে? একপর্যায়ে তিনি বলেন, রবিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি রাখা হোক। এ সময়ের মধ্যে তাঁর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তা আদালতকে জানানো হবে। সে অনুযায়ী আদালত আদেশ দেবেন।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রমহান মান্নাকে ধরে নেওয়ার পর পুলিশ একই কথা বলেছিল। কিন্তু কয়েক দিন পর তাঁর খোঁজ মেলে। অ্যাটর্নি জেনারেল দায়িত্ব নিক যে এর মধ্যে কোনো অঘটন ঘটবে না? তাহলে আমরা রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি আছি। সালাহ উদ্দিন আহমদকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর জিডি করার জন্য গুলশান ও উত্তরা থানায় যাওয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশ জিডি নেয়নি। আমাদের উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে, আদালত যদি কোনো আদেশ না দেন, তাহলে এরই মধ্যে যদি তাঁকে হত্যা করা হয় তবে তার দায় কে নেবে?’এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় দুটি বেঞ্চ যে আদেশ দিয়েছেন সরকার তা পালন করেছে। এ ক্ষেত্রেও আদালত যে আদেশ দেবেন, তা পালন করা হবে। অন্য কেউ যদি মেরে ফেলে, তাঁকে কি কেউ বাঁচাতে পারবে? অভিজিৎকে কি কেউ বাঁচাতে পেরেছে? এ জন্যই রবিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি রাখার আবেদন করছি। কারণ এটা নিয়ে বিরোধী দল রাজনৈতিক খেলা খেলতে চায়।’
এরপর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘দেশের কী অবস্থা তা সবার জানা। সালাহ উদ্দিন আহমদ পুলিশের কাছে নাও থাকতে পারেন- এটা সত্য হতেও পারে। কয়েক বছর আগে আমাকে যেমন অন্য একটি বাহিনী তুলে নিয়ে আটকে রেখেছিল। এটা সালাহ উদ্দিন আহমদের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। আমরা পছন্দ করি আর না-ই করি, দেশে তো একটা সরকার আছে। সরকারের দায়িত্ব দেশের সব নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়া। কেউ নিখোঁজ হলে সরকারের দায়িত্ব তাকে খুঁজে বের করা। সরকার এসে বলুক যে সালাহ উদ্দিন আহমদ তাদের হাতে নেই। এ জন্যই রুল জারি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, আপনারা যদি রুল না দেন, তাহলে জাতির কাছে কী বার্তা যাবে? আর এরপর যদি তাঁর (সালাহ উদ্দিনের) মৃতদেহ শেরে বাংলানগর বা অন্য কোথাও পাওয়া যায় তবে আদালত সম্পর্কে জনগণের কী ধারণা হবে? আদালতের মর্যাদা রক্ষার স্বার্থেই রুল দেওয়া প্রয়োজন।’উভয় পক্ষের শুনানির পর আদালত রুল জারি করেন। স্বরাষ্ট্রসচিব, আইজিপি, র‌্যাব মহাপরিচালক ছাড়াও পুলিশের দুজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (সিআইডি ও এসবি), ঢাকার জেলা প্রশাসক, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ও উত্তরা থানার ওসিকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতের আদেশের পর খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও হাসিনা আহমেদ পৃথক ব্রিফিং করেন।