রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

সম্প্রচার নীতিমালা স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করবে

pic-26_123043

সদ্য অনুমোদন পাওয়া সম্প্রচার নীতিমালাকে স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও বিশিষ্ট নাগরিকরা। সরকারের এই নীতিমালাকে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁরা বলেছেন, এই নীতিমালা স্বাধীন গণমাধ্যমের বিকাশকে রুদ্ধ করবে। রুদ্ধ করবে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা। গণমাধ্যমের সামগ্রিক নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে সবার আগে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত ‘গণমাধ্যমের সামনে চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ দাবি জানানো হয়েছে।
সম্প্রচার নীতিমালা প্রত্যাখ্যান করে সব অংশীজনের মতামত নিয়ে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের জন্য একটি আচরণবিধি তৈরি করারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সভায়।
গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এ আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার।
গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘সম্মিলিত প্রতিবাদে ও আলোচনার মুখে এই সম্প্রচার নীতিমালা এমনিতেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, এই নীতিমালা গাইডলাইন মাত্র। এই গাইডলাইনও থাকার দরকার নেই। সম্প্রচার নীতিমালা আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। ১৯৯১ সালের পরে আমরা যে অর্জন করেছি, তাতে গণমাধ্যম এখন অনেক শক্তিশালী।’ তিনি বলেন, ‘আগে একটা সম্প্রচার কমিশন গঠন করেন। কমিশন যেন সরকারের আজ্ঞাবহ না হয়। যোগ্য লোককে দিয়ে একটি শক্তিশালী যুগোপযোগী কমিশন চাই।’
বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বলেন, ‘যারা তড়িঘড়ি করে এ নীতিমালা করেছে তারা আসলে সরকারের বন্ধু বা শুভাকাঙ্ক্ষী কি না তা নিয়ে আমার প্রশ্ন জাগছে।’ তিনি বলেন, ‘জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক। এই জনগণকে প্রো-অ্যাকটিভ করতে বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও সংসদ যা করতে পারে না, সেই কাজটি করে গণমাধ্যম। জনগণের জানার একমাত্র মাধ্যম হলো গণমাধ্যম। এটাকে নিয়ন্ত্রণ করব কি না, করতে হলে কিভাবে করব, সে ক্ষেত্রে সরকারের জবাবদিহিতার জায়গাতে থাকতে হবে। সেখানে সম্প্রচার মাধ্যমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করা- এটা কখনো শুনিনি। এটা যারা তৈরি করেছে, সরকারকে তাদের খুঁজে বের করা উচিত। কারণ তৈরিকারকরাই জবাবদিহিতা বোঝে না, তাদের জ্ঞান-গরিমার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।’
‘সম্প্রচার নীতিমালা নতুন বিপদ’ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এমনিতেই বিপদের মধ্যে আছি। তারপর সম্প্রচার নীতিমালা একটা নতুন বিপদ। সরকার সম্প্রচার নীতিমালা করে গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা করছে।’ তিনি বলেন, এমনিতেই গণমাধ্যম ভীষণভাবে নিয়ন্ত্রিত। নতুন নিয়ন্ত্রক হয়ে এসেছে এই নীতিমালা। তিনি আরো বলেন, ‘সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য না থাকায় বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ হয়েছে। তবে আশার কথা আজ সম্পাদক পরিষদ সম্প্রচার নীতিমালার প্রতিবাদ করছে। মিডিয়া হচ্ছে আমাদের ভরসার জায়গা, মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করতে পারলে ভরসার জায়গা নষ্ট হয়ে যাবে।’
‘নিজস্ব নীতিমালা থাকা উচিত’ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, ‘সাংবাদিকদের নিজস্ব নীতিমালা থাকা উচিত। অনেক দিন থেকেই সাংবাদিকরা নিজেদের জন্য একটি নীতিমালা দাবি করে আসছিলেন। সেই সুযোগেই তথ্য মন্ত্রণালয় একটি নীতিমালা গণমাধ্যমের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটাকে প্রত্যাখ্যান নয়, আলোচনা-সমালোচনা করে এগিয়ে নিতে হবে।’
‘আচরণবিধি করার চেষ্টা করব’ : গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে আমাদের দায়বদ্ধতাও আছে, সেখানে শিথিলতাও আছে। আমাদের দুর্বলতার কথা স্বীকার করতে হবে।’ নীতিমালা বাদ দিয়ে সবার জন্য অনুসরণযোগ্য একটা আচরণবিধি তৈরি করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী সভায় সম্পাদক পরিষদ সম্মত হলে সকলকে নিয়ে আমরা একটি আচরণবিধি করার চেষ্টা করব, যাতে সকল গণমাধ্যম সেটি অনুসরণ করতে পারে।’
‘এ নীতিমালা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী’ : প্রারম্ভিক বক্তব্যে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম সম্প্রচার নীতিমালাকে একটি পশ্চাৎপদ নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এই নীতি গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করবে, গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যম সাম্প্রতিক সময়ে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে তা চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর। বর্তমান সম্প্রচার নীতিমালা ছাড়াই এসব সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। যদি নীতিমালা ছাড়াই যুগান্তকারী অর্জন সম্ভব হয়, তবে কেন একটি নীতিমালা প্রয়োজন। একটিই যুক্তি হতে পারে তা হলো নীতিমালার মাধ্যমে সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর বিকাশ ত্বরান্বিত করা। কিন্তু প্রস্তাবিত নীতিমালায় তা ঘটবে না, এ নীতিমালা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী, বিকাশ করতে নয়।’
লিখিত বক্তব্যে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘নীতিমালার তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে ৭০টি ধারা ও উপধারা আছে, যা বিষয়বস্তু কেন্দ্রিক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক, যা সৃজনশীলতার ওপরই আঘাত। বলা হয়েছে দেশবিরোধী বা জনস্বার্থবিরোধী বক্তব্য প্রচার করা যাবে না। কোনটি জনস্বার্থবিরোধী তা নির্ধারণ করবে কে?’
মাহফুজ আনাম বলেন, ‘অন্তঃসারশূন্য এই নীতিমালা যদি বলবত থাকত তাহলে আমরা দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় এনএসআই এবং ডিজিএফআইয়ের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে মুখ খুলতে পারতাম না। একইভাবে ২১ আগস্টের ঘটনা নিয়ে কিছুই লিখতে পারতাম না।’
তিনি আরো বলেন, ‘বলা হয়েছে সম্প্রচার নীতিমালার আলোকে প্রতিটি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যা কোনোমতেই সম্প্রচার নীতিমালার পরিপন্থী হতে পারবে না ও কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত হবে। এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। তাহলে তো ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার আর কোনো প্রয়োজন নেই।’ তিনি অবিলম্বে স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন গঠন করার এবং তাদেরকেই নীতিমালাটি তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
‘চারটি দাবি প্রতিফলিত হয়নি’ : বৈশাখী টিভির প্রধান সম্পাদক ও বিএফইউজে একাংশের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘চারটি সুরক্ষার জন্য আমরা নীতিমালা চেয়েছিলাম। এর মধ্যে ছিল লাইসেন্সের সিকিউরিটি। লাইসেন্স পাওয়ার ও থাকার কোনো নীতিমালা নেই, যার কারণে এটি চেয়েছিলাম। দ্বিতীয়ত, তরুণ পেশাজীবীদের চাকরির সুরক্ষা। তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীর নিরাপত্তা। চতুর্থটি হলো তথ্য জানানোর ও জনগণের তথ্য জানার বিষয়। কিন্তু খসড়া নীতিমালায় সেই চারটি দাবি প্রতিফলিত হয়নি। হয়নি বলেই আমরা আজ কথা বলছি।’ তিনি বলেন, ‘সম্প্রচার নীতিমালার ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ ধারা থাকা উচিত নয় বলে আমি মনে করি। এ নীতিমালা করার সময় বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা হিসেবে মতামত চাওয়া হয়েছিল। লিখিতভাবে বলেছিলাম, এসব ধারার প্রয়োজন নেই।’
বুলবুল বলেন, ‘দেশে উজ্জ্বল সাংবাদিকতা যেমন অগ্রসর হচ্ছে, তেমনি অপসাংবাদিকতাও কম নেই। এই অপসাংবাদিকতা দূর করতেই নীতিমালা প্রয়োজন।’
‘টক শো নিয়ন্ত্রণের জন্যই এই নীতিমালা’ : বিএফইউজের অপর অংশের সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, ‘দেশে এখন ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সাংবাদিকদের ধরে নিয়ে মামলা দেওয়া হচ্ছে আইসিটি অ্যাক্টে। টেলিভিশনের টক শো নিয়ন্ত্রণের জন্যই এই নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে।’ তিনি সাংবাদিকদের উদ্যোগে একটি নীতিমালা তৈরি করে কমিশনের কাছে প্রস্তাব করার আহ্বান জানান।
‘আমাদের বাইপাস করা হয়েছে’ : অ্যাসোসিয়েশন অব টিভি চ্যানেল ওনার্সের (অ্যাটকো) সাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল আইয়ের পরিচালক শাইখ সিরাজ বলেন, ‘অ্যাটকো প্রতিষ্ঠার পর আমরা লিখিতভাবে তথ্য মন্ত্রণালয়কে বলেছিলাম, নীতিমালাটি পাঠানো হোক আমরা মতামত দেব। জাতীয় কমিটি যতটুকু কাজ করেছিল, আমরা তার ওপর মতামত দিয়েছিলাম। কিছু কিছু মতামত সংযোজন করা হয়েছিল। আর কিছু বাদ দেওয়া হয়েছে। পরে খসড়াটি কেবিনেটে যাওয়ার আগে আমাদের এক ধরনের বাইপাস করা হয়েছে। এমন অনেক কিছু যুক্ত করে কেবিনেটে নেওয়া হয়েছে, যা আমাদের দেখানো হয়নি।’ তিনি বলেন, স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন গঠনের মাধ্যমে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে যদি কোনো নীতি অথবা গাইডলাইন করা হয়, তাহলে গণমাধ্যমের বিকাশ অব্যাহত থাকবে।
‘ভীতিমালা’ : নিউজ টুডে সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমদ সম্প্রচার নীতিমালাকে ‘ভীতিমালা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘এই নীতিমালা অগণতান্ত্রিক সরকারকে উৎসাহিত করতে। এটাকে প্রতিহত করতে হবে।’
‘অনেক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে’ : টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকার এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে গেলে তথ্য অধিকার আইনসহ তাদের আমলেই করা অনেক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। এই নীতিমালায় কিছু ইতিবাচক দিক আছে, কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকার মানবাধিকার হরণ হবে। নীতিমালাটি হলে সীমান্তে মানুষ হত্যা করা হলেও কোনো কথা বলা যাবে না।’
আলোচনায় আরো অংশ নেন মাছরাঙ্গা টিভির প্রধান সম্পাদক ফাহিম মুনয়েম, একাত্তর টেলিভিশনের সিইও ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু, জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ জ ই মামুন ও এটিএন নিউজের হেড অব নিউজ মুন্নী সাহা।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত। সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, ডেইলি সান সম্পাদক আমির হোসেন, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির, বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক শাহজাহান সরদার, সকালের খবর সম্পাদক মোজাম্মেল হক মঞ্জু, সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুনীরুজ্জামান, ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান প্রমুখ।