মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

সংলাপের জন্য জনগণ অনির্দিষ্টকাল বসে থাকবে না

41350_f2

সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় সরকারের কাঠামো নিয়ে আলোচনায় বসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধী জোট নেতা খালেদা জিয়া। বলেছেন, আমরা এখনও এবং আমি আজ আবারও সরকারকে আলোচনা ও সংলাপের পথে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। আলোচনার মাধ্যমে সকলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার উপযোগী নির্দলীয় সরকার কাঠামোর ব্যাপারে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানাচ্ছি। সংলাপের উদ্যোগ না নিলে শিগগিরই রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, আমরা দেশে অশান্তি, সংঘাত, অস্থিরতা ও রাজপথের উত্তাল আন্দোলনে সহসা যেতে চাই না। জনগণ এমন একটি সংলাপের জন্য অনির্দিষ্টকাল বসে থাকবে, তা মনে করার কোন কারণ নেই। সংলাপের উদ্যোগ না নিলে জনগণের দাবি আদায়ে চাপ প্রয়োগের জন্য দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে শিগগিরই আমাদের রাজপথে আন্দোলনে নামতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান খালেদা জিয়া। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গতকাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব)-এর উদ্যোগে ‘উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র’ শীর্ষক মহাসমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। বিএনপি চেয়ারপারসন দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে অঙ্গীকার করেছিলেন- আলোচনা চলবে এবং সমঝোতা হলে সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন করা যাবে। এখন সেই অঙ্গীকার ভুলে গিয়ে তিনি আলোচনা ও সংলাপে বসতে অস্বীকার করছেন।
ন্যায়বিচারের সুযোগ সঙ্কুচিত হবে
বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার উদ্যোগের সমালোচনা করেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গণতন্ত্র হত্যা করে আওয়ামী লীগই দেশে একদলীয় স্বৈরশাসন কায়েম করে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের কাছে দিয়েছিল। সেই ক্ষমতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম জুডিশিয়াল গঠনের মধ্য দিয়ে সেটা বিচারপতিদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আজ সেই ক্ষমতা আবার অনির্বাচিত সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হচ্ছে। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হবে। ন্যায়বিচারের সুযোগ আরও সঙ্কুচিত হয়ে পড়বে। একই ভাবে জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালার মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হচ্ছে। খালেদা জিয়া বলেন, দলীয়করণে স্থবির হয়ে পড়েছে জনপ্রশাসন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নগ্ন দলীয়করণ ও অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপে ভূলুণ্ঠিত। মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। এ্যাবের সভাপতি মাহমুদুর রহমানকে দীর্ঘদিন বিনাবিচারে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। কারণ, একটি জনপ্রিয় পত্রিকার সাহসী সম্পাদক হিসাবে তিনি অন্যায়, অপশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তার সম্পাদিত দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা অন্যায়ভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
দেশে অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে
খালেদা জিয়া বলেন, আধুনিক বিশ্বে কোন জবরদস্তির সরকার, অবৈধ সরকার বা স্বৈরাচারী সরকার দেশ ও জনগণের উন্নয়ন করতে পারে না। তারা লুণ্ঠন ও দুর্নীতির মাধ্যমে জাতীয় সম্পদ কুক্ষিগত করে। দেশের সম্পদ বাইরে পাচার করে দেয়। বাংলাদেশেও ঠিক তা-ই হচ্ছে। দুর্নীতি, লুণ্ঠন, অনিরাপত্তা, অস্থিতিশীলতা, সন্ত্রাস, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতিতে মানুষ আজ উৎকণ্ঠিত, অস্থির ও জর্জরিত। জনগণের ভোটাধিকার লুণ্ঠিত। তিনি বলেন, সারা দেশের রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী। ব্যাপক লুটপাট হলেও বিদ্যুৎ সঙ্কটের সুরাহা হয়নি। কারখানা বন্ধ হচ্ছে। শ্রমিকেরা বেকার হচ্ছে। সংকুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থান। শেয়ার বাজার লুট করে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে পথে বসানো হয়েছে। ব্যাংকগুলো ক্ষমতাসীনদের মতদপুষ্টরা লুটপাট করে খাচ্ছে। অর্থনৈতিক অঙ্গনে একের পর এক বিরাট বিরাট দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারির ঘটনা সংবাদ-মাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হচ্ছে। আর্থিক শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি চলছে। ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতুর বৈদেশিক অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেছে। খালেদা জিয়া বলেন, পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এক নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পাশের হার বাড়িয়ে দেখাতে গিয়ে শিক্ষার মানকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। দলীয়করণ ও সশস্ত্র সংঘাতে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ কলুষিত হচ্ছে। পরিস্থিতির এতো অবনতি হয়েছে, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সশস্ত্র ট্রেনিং সেন্টার খুলে শিক্ষকদেরকে পর্যন্ত অবৈধ অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সমাবেশ শুরুর আগে ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও নিজের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন খালেদা জিয়া।
সন্ত্রাসী-খুনিদের সামলান
এদিকে বক্তব্যের শেষ মুহূর্তে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহত ড. মাহবুব উল্লাহ। সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে তার ওপর হামলার বিষয়টি অবহিত করে বক্তব্য দেয়া অবস্থায় খালেদা জিয়ার কাছে একটি চিরকূট পৌঁছে দেন নেতারা। এ সময় খালেদা জিয়া বলেন, এই মাত্র শুনতে পেলাম সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে ড. মাহবুব উল্লাহর ওপর হামলা করা হয়েছে। আমরা মনে করি, হাসিনার সন্ত্রাসীরাই মাহবুব উল্লাহ’র উপর হামলা করেছে। অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করুন। পরে ড. মাহবুব উল্লাহকে মঞ্চে ডেকে নেন তিনি। প্রকৌশলীদের মহাসমাবেশে খালেদা জিয়ার সামনে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, আমি সাধারণত সভা-সেমিনারে কাউকে আক্রমণ করে কোন বক্তব্য দেই না। সত্য ও তথ্যনির্ভর কথা বলার চেষ্টা করি। আমি একজন শিক্ষক। তারপরও আমার উপরে এই বর্বরোচিত হামলা হলো, আমি এর বিচার চাই।
আব্বাসের আত্মসমালোচনা
বিগত দিনে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগরের আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি অপরাধী। ২৯শে ডিসেম্বর যখন নেত্রীকে ঘর থেকে বের হতে দেয়া হয়নি সেদিন আমি কিছুই করতে পারিনি। আমরা কেন বুঝিনি যে নেত্রীকে বের হতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন, এ অপরাধের কারণে আমি অনেক দিন ম্যাডামের সামনে যেতে পারিনি।
সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রকৌশলী আ ন হ আখতার হোসেনের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রুহুল আমিন গাজী, সদস্য সচিব প্রফেসর ডা. জাহিদ হোসেন, এ্যাবের মহাসচিব প্রকৌশলী হারুন-উর রশীদ, প্রকৌশলী মহসিন আলী, সৈয়দ মুনসেফ আলী, রিয়াজুল ইসলাম রিজু, খালিদ হাসান চৌধুরী, গোলাম মওলা, মহিউদ্দিন আহমেদ সেলিম, মনিরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম খান, একেএম জহিরুল ইসলাম, ড. ইকবাল, হেলাল উদ্দিন তালুকদার, প্রফেসর সাব্বির মোস্তফা খান, একরামুল হক বক্তব্য দেন। সমাবেশ থেকে এ্যাবের সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবি জানানো হয়। সমাবেশে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান। সমাবেশে বিএনপি নেতাদের মধ্যে সেলিমা রহমান, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, প্রফেসর আবদুল মান্নান, আবদুল হালিম, জয়নাল আবেদীন, আহমেদ আজম খান, নুর মোহাম্মদ খান, আবদুস সালাম, জয়নুল আবদিন ফারুক, নাজিম উদ্দিন আলম, শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানিসহ বিএনপি ও জোটের শরিক দলের কেন্দ্রীয় নেতা এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।