বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

লেবাননের বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফেরার নির্দেশ

3_18543

লেবাননে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এএফএম গাউসুল আজম সরকারকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। নিজ দূতাবাসের কাউন্সিলের সঙ্গে চলতে থাকা বিবাদের পর তদন্ত শেষে এই ব্যবস্থা নেওয়া হলো। রাষ্ট্রদূতকে ফেরত আসতে ঢাকা থেকে বৈরুতে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। পেশাগত দায়িত্ব পালনে অপারগতা ও মিশনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় এ ব্যবস্থা। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক গিয়েছেন লেবাননে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।তবে লেবাননের গণমাধ্যমে এসেছে ভিন্ন খবর। সেখানে বলা হয়েছে, লেবানন সরকার রাষ্ট্রদূতকে বলেছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বৈরুত ত্যাগ করার। অভিযোগ এক বাংলাদেশিকে আটকে রাখা ও অপর এক বাংলাদেশিকে অপহরণে সম্পৃক্ততা। গতকাল দিনভর ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে লেবাননের গণমাধ্যমের এ খবরের সত্যতা পাওয়া যায়নি। জানা যায়, গত বছরের জুলাই মাসে লেবাননে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস খোলা হলে সেখানে যোগ দেন রাষ্ট্রদূত এএফএম গাউসুল আজম। এর আগে তিনি সুইডেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি ইচ্ছা করেই যোগাযোগ করে সুইডেন থেকে নিজের বদলি নিয়েছিলেন। কারণ সুইডেনে একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল তাকে ও তার স্ত্রীকে। সেখানে গৃহকর্মী নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী। এজন্য রাষ্ট্রদূতের স্ত্রীকে সুইডেন ত্যাগের নির্দেশও দিয়েছিল সেখানকার সরকার। পরে নিজেই চেষ্টা করে সুইডেন থেকে বদলি করিয়ে নেন লেবাননে। কিন্তু লেবাননেও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে দূতাবাসে নিযুক্ত কাউন্সিলর ও হেড অব চ্যান্সারি তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা এটিএম মোমেনুল হকের সঙ্গে তৈরি হয় বিবাদ। যা প্রকাশ্য রূপ নেয় দূতাবাসের ভবন ভাড়া নেওয়া ও কনস্যুলার কাজের টাকা-পয়সার হিসাব রাখা নিয়ে। নিযুক্ত হওয়ার ছয় মাসের মাথায় ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রদূত ও কাউন্সিলর পরস্পরের বিপক্ষে অভিযোগ জানান। রাষ্ট্রদূত তাকে অবহিত না করে কাউন্সিল আগ বাড়িয়ে কাজ করেন বলে অভিযোগ করেন। অভিযোগ করেন কাউন্সিলর সরকারের টাকা- পয়সা সময় মতো জমা দিচ্ছেন না। কনস্যুলার সেকশনের কাজকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে রাষ্ট্রদূতের সম্পূর্ণ অগোচরে রাখেন কাউন্সিলর। এমনকি কনস্যুলারের কাজকে সিসি টিভি ক্যামেরাও আড়ালে রাখা হয়। এসব কাজে লেবাননের অসাধু জনশক্তি ব্যবসায়ী ও স্থানীয় প্রবাসী কমিউনিটির রাজনীতিকে ব্যবহার করছেন কাউন্সিলর। আবার রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে কাউন্সিলর অভিযোগ করেন তার কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপের। মিশনের কাজের বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের স্ত্রীর তৎপরতার অভিযোগও আসে। আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগও আসে রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মিসরে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে দিয়ে তদন্ত করায় সরকার। গত এপ্রিলে বৈরুত গিয়ে ঘটনার আদ্যপান্ত জেনে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন দাখিল করে কায়রোস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে রাষ্ট্রদূত ও কাউন্সিলর উভয়ে দেশে ফেরত আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ তাদের এই দ্বন্দ্বের ফলে দূতাবাসের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন লেবাননে থাকা লক্ষাধিক বাংলাদেশি। তদন্ত করে পাওয়া যায়, রাষ্ট্রদূত প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনতে চাইতেন না। আবার কাউন্সিলের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলোরও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দূতাবাসের স্বার্থে ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবা নিশ্চিত করার জন্য উভয়কেই দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়। রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও কাউন্সিলরকে পরবর্তীতে আবারও বিদেশে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।সূত্র মতে, সরকারের তদন্তের পর সিদ্ধান্ত জানাজানি হলে দূতাবাসের পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। হাতাহাতির মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আবারও সামনে আসে রাষ্ট্রদূতের স্ত্রীর গৃহকর্মী নির্যাতন। প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় দূতাবাসের কার্যক্রম। নানান ভাবে লেবানন সরকারের কাছেও বিভিন্ন অভিযোগ যায়। গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগসহ নানান বিষয়ে অনেকটা বিরক্ত হয়েই ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত সুরাহা করার তাগিদ দেয় লেবাননের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এজন্যই লেবাননে গিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম। রাষ্ট্রদূতের বৈরুত ত্যাগের সকল ব্যবস্থা, দূতাবাসের কাজকর্ম স্বাভাবিক করা ও লেবানন সরকারের মধ্যে থাকা সকল অস্বস্তি দূর করে তিনি ঢাকা ফিরবেন। অন্যদিকে, কাউন্সিলর এটিএম মোমেনুল হক আপাতত লেবাননে থেকে দূতাবাসের দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু শীঘ্রই তাকেও ঢাকা ফিরে আনা হবে বলে জানা গেছে।