শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

ভাত দাও, কাজ দাও’ স্লোগানে খালেদার অফিস ঘেরাও

dsc_6589_57960

 

অবরোধ ও হরতাল তুলে নেওয়ার দাবিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দুইদিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত ১০টি সংগঠন গুলশান-২ এর গোল চত্ত্বরে অবস্থান নিয়ে বেগম জিয়াকে কার্যালয় থেকে উচ্ছেদ করারও হুমকি দিয়েছে। অবিলম্বে তাকে গ্রেফতারের দাবিও জানানো হয়েছে। ‘ভাত দে, কাপড় দে’, ‘পেটে লাথি মেরো না, তুলে নাও অবরোধ’, ‘আমার বাবাকে পুড়িয়ে মারা হলো কেন?’ ‘অবরোধ মানি না মানব না’—ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে তারা খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় ঘেরাওয়ের চেষ্টাও করেন। বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে অনেককে শুয়ে বিক্ষোভ করতেও দেখা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের বাধায় গুলশান-২ এর গোলচত্ত্বরে সংগঠনগুলো আল্টিমেটাম দিয়ে ফিরে যায়। অবশ্য খেটে খাওয়া নগরবাসী ও কাচাবাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যানারে দুটি সংগঠন কার্যালয়মুখী ৮৬ নম্বর সড়কে বেশকিছু সময় অবস্থান নেয়। এ সময় খাওয়া নগরবাসীর কয়েকজন কর্মী খালেদা জিয়ার কার্যালয় লক্ষ করে কয়েকটি ডিমও ছুঁড়ে মারে। পরে পুলিশ বাধা দিলে তারা চলে যান।বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মিছিল নিয়ে খালেদা জিয়ার গুলশান অফিসের দিকে আসতে দেখা যায় ১০টি সংগঠনকে। এগুলো হলো—বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ, ঢাকা হিউম্যান হলার সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন, জাতীয় রিকশা ভ্যান শ্রমিক লীগ, ঢাকা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন, ঢাকা জেলা ট্রাক-কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়ন, গার্মেন্ট শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমাণ্ড, খেটে খাওয়া নগরবাসী ও কাচাবাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এছাড়াও গুলশান থানা ছাত্রলীগ-যুবলীগের বেশকিছু নেতা-কর্মী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।সকাল থেকেই পুলিশ গুলশান ২ নম্বর গোলচত্ত্বরে দুই প্রান্তের সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে রাখে। সেখানে পুলিশের জলকামান, রায়ট কার ও প্রিজন ভ্যানসহ অন্তত দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য অবস্থান নেয়। কয়েকঘণ্টা গুলশান ২ নম্বর থেকে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার রাস্তায় যান চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল। গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ফিরোজ আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, ‘জনগণের জান মালের নিরাপত্তার জন্য যা যা দরকার, সবই তাঁরা করেছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে কাউকে যেতে দেওয়া হয়নি।’বেলা পৌনে একটার দিকে ‘খেটে খাওয়া নগরবাসী’র ব্যানারে প্রায় ৫০ জনের একটি দল খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের কাছাকাছি চলে যায়। ৮৬ নম্বর সড়কের দক্ষিণে গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে তারা অবস্থান নেয়। তাদের সবার হাতে কোদাল ও ঝুড়ি ছিল। ‘ভাত চাই, কাপড় চাই’, ‘খালেদা জিয়া কেন কর্মসূচি দিয়েছেন?’, ‘পেটে লাথি মেরো না, তুলে নাও অবরোধ’, ‘আমার বাবাকে পুড়িয়ে মারা হলো কেন?’ ‘অবরোধ মানি না মানব না’—এমন বিভিন্ন  স্লোগান দিয়ে তারা কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কার্যালয়ের ভেতরে যেতে দেওয়ার জন্য তারা পুলিশকে অনুরোধও করেন। এ নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তারা কথা বলার সুযোগ চান। পরে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। এ সময় তারা খালেদা জিয়ার কার্যালয়কে লক্ষ্য করে অন্তত ৮টি ডিম ছুঁড়ে মারে।

লেবার সরদার পরিচয় দিয়ে সুমন নামে একজন বলেন, তাঁর বাসা উত্তর বাড্ডায়। দেড় মাস ধরে তাঁরা কোনো কাজ পাচ্ছেন না। ৬ জানুয়ারি অবরোধ শুরুর পর  থেকে এ পর্যন্ত মাত্র দুই থেকে তিন দিন কাজ পেয়েছেন বলে জানান সুমন। তিনি বলেন, ‘খাওয়া তো দূরের কথা, বাসা ভাড়া দিতে পারছি না।’ খেটে খাওয়া নগরবাসীর ব্যানারে যাঁরা মিছিল নিয়ে এসেছেন, তাঁরা সবাই নিজেদের শ্রমিক বলে দাবি করেন। রাজধানীর মিরপুর, বাড্ডা, গুলশান থেকে এসেছেন বলেও দাবি করেন তারা।

দুপুরে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইসমত কাদির গামা, কমান্ডার নাজমুল হুদা, ডেপুটি কমাণ্ডার গোফরান চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ গুলশান-২ এর গোলচত্ত্বরে অবস্থান নেন। পরে তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের দিকে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু পুলিশি বাধায় তারা যেতে পারেননি। এ সময় ইসমত কাদির গামা সাংবাদিকদের বলেন, অবিলম্বে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা না হলে তাঁরা খালেদা জিয়ার বাসভবন ও কার্যালয়মূখী অবরোধ করবেন। একটি পাখিও সেখানে  যেতে পারবে না। অবরোধ, হরতালে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

নাজমুল হুদা বলেন, খালেদা জিয়া ইচ্ছা করেই অবরুদ্ধ। আগামী তিনদিনের মধ্যেই অবরোধ প্রত্যাহার করে নিতে হবে। নইলে দেশের সব মুক্তিযোদ্ধারা বেগম জিয়ার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেবে।

অবরোধ প্রত্যাহারে খালেদাকে দুইদিনের আল্টিমেটাম: অবরোধ প্রত্যাহার করে নিতে খালেদা জিয়াকে ২ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পরিবহন শ্রমিক লীগের শতাধিক নেতা-কর্মী মিছিল নিয়ে গুলশান-২ এর গোলচত্ত্বর থেকে খালেদা জিয়ার বাসা অভিমুখে রওয়ানা দেন। একই সময়ে গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ নামে একটি সংগঠনের নেতা-কর্মীদেরও তাদের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখা যায়।

সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলী বলেন, ‘আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে খালেদা জিয়া অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার না করলে তার  গ্রেফতার দাবিতে ২৫ জানুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গণঅনশন কর্মসূচি পালন করা হবে। এর আগে বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক লীগ ও গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের নেতাকর্মীরা দশটা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে গোলচত্বরে আসতে শুরু করে।

দুুপুরে পৃথক ব্যানারে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের নেতা-কর্মীরা গুলশান-২ চত্ত্বরে অবস্থান নেয়। এ সময় খালেদা জিয়ার গ্রেফতার দাবি করে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা খালেদা জিয়ার কার্যালয় অভিমুখে রওয়ানা দিলে পুলিশ তাদেরকেও বাধা দেয়।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম স্বপন সাংবাদিকদের জানান, হরতাল-অবরোধে সহিংসতার দায়ে খালেদা জিয়াকে আসামী করে কাঠগড়ায় দাড় করাতে হবে। আগামী দুইদিনের মধ্যে তাকে গ্রেফতার কিংবা অবরোধ প্রত্যাহার করা না হলে প্রজন্মলীগ সারাদেশে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে। একইসঙ্গে বেগম জিয়াকে গুলশান কার্যালয় থেকে টেনে হিচড়ে বের করবে।

লাউ-টমেটোসহ সবজি হাতে বিক্ষোভ: বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়মুখী সড়কে ফুলকপি, লালশাক, ডাঁটাশাক, টমেটো, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, পেঁয়াজের কলি ও মূলা হাতে বিক্ষোভ করেছেন বেশকিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দুপুর ২টার দিকে বেশ কয়েকজন সবজি বিক্রেতা খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের উত্তরপাশ্বে অবস্থান নেন। তারা সেখানে বিভিন্ন সবজি হাতে নিয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের  সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।

দিনভর সতর্ক ছিল গুলশান কার্যালয়: এদিকে বেশ কয়েকটি সংগঠনের ব্যানারে কার্যালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণায় দিনভর সতর্ক ছিল বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষীরা। তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী সিএসএফ সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের তত্পরতা লক্ষ করা যায়। কার্যালয়ের বাইরে থাকা পুলিশ সদস্যরাও সজাগ দৃষ্টিতে ছিলেন। একইভাবে সেখানে অবস্থানরত গণমাধ্যমের কর্মীদেরও সরব হতে দেখা যায়। তবে বৃহস্পতিবার দিনভর গুলশান কার্যালয়ে বিএনপি বা পেশাজীবী সংগঠনের কোনো প্রতিনিধিদের দেখা যায়নি।