রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

পবিত্র হজ পালিত

1_156145
‘লাব্বাইক, আলাহুম্মা লাব্বাইক’ সারা বিশ্বের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কণ্ঠে উচ্চারিত মুহুর্মুহু এ ধ্বনিতে শুক্রবার মুখরিত হয়ে উঠেছিল ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দান। পবিত্র মক্কা নগরী থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে হজরত আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলনের ঐতিহাসিক স্থান। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিদায় হজের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি আরাফাত ময়দানের আকাশ-বাতাস ও প্রতিটি বালুকণায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে হাজীদের হৃদয়মথিত লাব্বাইক ধ্বনি। চারদিকে শুধুই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শানে হাজির হওয়া দুই প্রস্থ সাদা কাপড় পরা লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ। এবার পবিত্র হজ শুক্রবার হওয়ায় এই হজের মর্তবা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকেই শুক্রবার হজকে আকবরী হজ হিসেবে অভিহিত করেন। আকবরী হজের সময় সৌদি সরকার তথা রাজপরিবারের পক্ষ থেকে উপঢৌকন দেয়া হয় হাজীদের।
পবিত্র হাদিস শরিফের বর্ণনা মতে, হজের তিনটি ফরজের মধ্যে আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম ফরজ। কেউ তাঁবুতে, কেউ সরকারি হজক্যাম্পে এবং অধিকাংশই খোলা আকাশের নিচে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এক কাতারে মিলিত হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়েছে। ৯ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায়ের পর আরাফাতের ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করে জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করেছেন। সূর্যাস্তের পর সবাই মুজদালিফায় গিয়েছেন। আরাফাত থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মুজদালিফায় রাত যাপন ও পাথর সংগ্রহ করবেন হাজীরা। ১০ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় ফিরে আসবেন। মিনায় এসে বড় শয়তানকে পাথর মারা, কোরবানি ও মাথা মুণ্ডন বা চুল ছেঁটে মক্কায় কাবা শরিফ তাওয়াফ করার মধ্য দিয়ে হজের প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। তাওয়াফ শেষে মিনায় ফিরে গিয়ে ১১ ও ১২ জিলহজ অবস্থান ও প্রতিদিন তিনটি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন।
বিশ্বের প্রায় ১৭৭টি দেশের ২৭ লাখেরও বেশি হজযাত্রীর ৬০ ভাগই শুক্রবার ভোরের মধ্যে পৌঁছে যান আরাফাত ময়দানে। আবার অনেকেই পৌঁছেছেন আগের দিন ভোররাতেই। কাফনের কাপড়ের অনুরূপ দুই খণ্ড শুভ্র বসনে এহরাম বেঁধে লাখ লাখ মানুষ আত্মসমর্পণ করেন মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে। গোনাহ মার্জনা আর বিশ্ব শান্তির জন্য দোয়ায় তাদের কান্নার ধ্বনি, পাপমোচনের ব্যাকুলতা, একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি, মোনাজাত-সৌহার্দ্য বিনিময়ের এ অভূতপূর্ব দৃশ্য স্মরণ করিয়ে দেয় মানবতার ধর্ম ইসলাম, শান্তির ধর্ম ইসলাম, ইসলাম ধনী-গরিবের ভেদাভেদহীন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। বিশ্ব শান্তি প্রত্যাশায় মুসলিম উম্মাহ আরাফাতে সমবেত হয়ে যে যার যার মতো ইবাদতে মশগুল থেকেছেন। চারদিকে পাহাড়ঘেরা বিশাল আরাফাত ময়দানের মাঝে ৭ লাখেরও বেশি মুসল্লির ধারণক্ষমতার মসজিদুল নামিরাহ ভোররাতের মধ্যেই পূর্ণ হয়ে যায়। আরাফাত ময়দানের মসজিদুল নামিরাহতে খুতবা পাঠ করেন পবিত্র মসজিদ, মসজিদুল হারাম-মক্কার ইমাম আবদুল আজিজ আল শাইখ। খুতবায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুসলিম উম্মাহকে একান্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। মোনাজাতে বিশ্ব শান্তি, ভ্রাতৃত্ব, মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ ও ঐক্য এবং সারা দুনিয়ার মানুষের সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করে জ্ঞাত ও অজ্ঞাত গোনাহর জন্য মহান আল্লাহর দরবারে সবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়।
এ বছর হজযাত্রীর পরিমাণ খুব বেশি না হলেও কোনো স্থানে বিশৃংখলার খবর পাওয়া যায়নি। এ বছর আকাশে কোনো মেঘ না থাকায় ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রায় হাজীরা অস্থির হয়ে পড়লেও আরাফাতে ছিল স্বস্তির নানা ব্যবস্থা। হাজার হাজার নিমগাছের মাঝে ছিল পানির অসংখ্য ফোয়ারা। ফোয়ারার শীতল বাতাসে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও হজযাত্রীরা ছিলেন মোটামুটি স্বাভাবিক। ফলে তারা অনেকটা স্বস্তিতেই হজের এই মূল পর্বটি পালন করতে পেরেছেন। সৌদি রাজপরিবার এবং সে দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি প্রতি বছরের মতো এবার যে কোনো বছরের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে নানা ধরনের খাবার বিনা পয়সায় বিতরণ করেছে। শুধু ইহুদিদের তৈরি কোমল পানীয় ছাড়া সব ধরনের কোমল পানীয়, জুস, বহু রকমের ফল, শুকনো খাবার, রুটি, মাংস আর মিনারেল ওয়াটারের সহজ প্রাপ্তি ছিল সর্বত্র। আরাফাত ময়দানের নামিরাহ মসজিদটিতে স্থানসংকুলান না হওয়ায় অসংখ্য হাজী অবস্থান নেন মসজিদঘেঁষে খোলা আকাশের নিচে। সকাল ৭টার পর থেকে মসজিদে নামিরাহয়ে জায়গা না পেয়ে অনেকে রাস্তার দু’ধার থেকে খোলা ময়দানে প্রায় ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ জামাত করেন।
খুতবায় বিশ্ব শান্তি, সন্ত্রাস তথা যুদ্ধ পরিহার ও মুসলিম উম্মাহর একাত্মতা ছিল মূল আরজি। বাংলাদেশের হাজীরা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেশের সার্বিক উন্নতি ও মঙ্গল কামনা করে মোনাজাত করেন।
হজযাত্রীদের দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত মোয়াল্লিমের নেতৃত্বে আরাফাত ময়দানে জোহর ও আসর নামাজ একত্রে আদায় শেষে সূর্যাস্তের পর রওনা দেন মুজদালিফার উদ্দেশে। চারদিকে উঁচু পাহাড়ঘেরা সমতল উপত্যকা মুজদালিফায় তারা মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন। সৌদি সরকারের বিশেষ ব্যবস্থায় এবারও উন্মুক্ত ময়দানের সব তাঁবু কেবলামুখী করে বাঁধা হয়। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিশেষ সতর্কতার জন্য এবার যানজট সমস্যায় পড়তে হয়নি কাউকে। সড়কের পাশেই প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার দূরত্বে ছিল অনেকগুলো অস্থায়ী হাসপাতাল। এছাড়া কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, হেলিকপ্টারসহ ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সার্বক্ষণিক টহল দেয় আরাফাতের ময়দানের চারদিকে। এবারও মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় ছোট ছোট অসংখ্য ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালে সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবার গরমের প্রকোপ বেশি থাকায় বিশাল ময়দানজুড়ে শত শত শীতল পানির ফোয়ারার মাধ্যমে পানি ছিটিয়ে তাপমাত্রা ঠাণ্ডা রাখা হয়।
সৌদি রাজপরিবার, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যসহ দেড় লক্ষাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, আলরাজি ব্যাংক এবং স্থানীয় বিত্তবানরা দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই খাবারের প্যাকেট, জুস জাতীয় কোমল পানীয় ও মিনারেল ওয়াটার বিতরণ করেন। নিরাপত্তাসহ খাদ্য-পানীয়, যাতায়াত ও স্বাস্থ্যগত ক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় পড়েননি হাজীরা। সৌদি সরকারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এবার কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই হজ পালন করেন হজযাত্রীরা। সৌদি সরকার মিনায়ও লাখ লাখ কার্টন কোমল পানীয়সহ দই-মাঠা এবং খাদ্য বিতরণ করে। সূর্যাস্তের পর হাজীরা চলে যান মুজদালিফায়। চারদিক পাহাড়বেষ্টিত এ উন্মুক্ত উপত্যকাটিতে ধনী-গরিব, উঁচু-নীচু, রাজা-বাদশাহ সবাই এক কাতারে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করেন। এটাই ইসলামের মহান শিক্ষা। এখানে নেই কোনো ভেদাভেদ, নেই কোনো আশরাফ-আতরাফের বালাই। সবাই এক আল্লাহর সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাত। তারা যখনই মুজদালিফায় পৌঁছান না কেন, পৌঁছামাত্র মাগরিব ও এশার নামাজ দুই একামতে একসঙ্গে আদায় করেন। সুউচ্চ পাহাড়বেষ্টিত ময়দানে সারারাত ইবাদত-বন্দেগি করে ভোরে সাড়ে ৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাঁবুর শহর মিনায় যান। মিনায় গিয়ে মুজদালিফার খোলা ময়দান থেকে সংগ্রহ করা ৪৯টি নুড়ি (ক্ষুদ্রাকৃতির পাথর), ৭টি নুড়ি বড় শয়তানের প্রতিকৃতিতে (জামারায়ে আকাবা) ছুড়ে মারেন। সৌদি সরকার পদপিষ্ট হয়ে দুর্ঘটনা রোধে জামারাহ যেতে হয় এসকেলেটরের সাহায্যে। প্রত্যেক মুমিন মুসলিমের জীবন ও কর্ম থেকে শয়তানের প্রভাবকে দূর করতেই এই প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ। একই সঙ্গে তারা আল্লাহর কাছে মোনাজাত করেন জীবনের পাপমুক্তি ও শয়তানের প্রভাবমুক্ত থাকার জন্য। নুড়ি নিক্ষেপের পর তারা চলে যান মক্কায়।
মক্কায় পবিত্র কাবাগৃহকে ঘিরে ৭ বার তাওয়াফ করবেন, মাকামে ইব্রাহিমের পাশে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত শোকরানা নামাজ আদায় করেন। এরপর পবিত্র কাবা শরিফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের বেজমেন্টে জমজম কূপের পানি পান করেন এবং সেখান থেকে বের হয়ে পাশেই সাফা-মারোয়াহ পাহাড়ে দ্রুত হাঁটার আনুষ্ঠানিকতা পালন করেন। এরপর সবাই যান মসজিদুল হারামের দেয়ালঘেঁষে গড়ে ওঠা অসংখ্য নাপিতের দোকানে। সেখানে তারা মাথা মুণ্ডন করেন এবং নিজ নিজ হোটেলে গিয়ে গোসল করার মধ্য দিয়েই শেষ হয় হজের প্রথম পর্ব। এরপর তারা স্বাভাবিক পোশাক পরে আবার মিনার তাঁবুতে ফিরে যান। মিনায় ফিরে তারা জোহরের নামাজের পর তিনটি প্রতীকী শয়তানকে সাতটি করে ২১টি কংকর নিক্ষেপ করেন। এ স্থানেই হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করতে নিয়ে যাওয়ার সময় শয়তান তিনবার তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য নানা প্রলোভন ও মিথ্যা কথা বলেছিল। হজরত ইব্রাহিম (আ.) শয়তানের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হয়ে তিনবারই শয়তানের দিকে পাথর ছুড়ে মেরেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় আচারের পথ ধরেই হাজীরা তিনটি প্রতীকী শয়তানের (জামিরাহ) স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। সেখানে শয়তানকে কংকর নিক্ষেপের পর মক্কা প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে হজব্রতের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।