শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

নাশকতা ঠেকাতে যা দরকার করা হবে : প্রধানমন্ত্রী

2_203766
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান না করে বাসায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খালেদা জিয়াকে কেউ অবরুদ্ধ করে রাখেনি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি বাড়ি চলে যাক, কেউ বাধা দেবে না। খালেদা জিয়াকে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের নেত্রী আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, অনেক জায়গায় নাশকতা চলছে। সরকার জনগণের নিরাপত্তার জন্য যা যা দরকার তা সবই করবে। তিনি বিশ্ব ইজতেমা চলাকালে অবরোধ কর্মসূচি আহ্বানের তীব্র সমালোচনা করে দেশবাসীকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানান।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে সোমবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন শেখ হাসিনা। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ১০ জানুয়ারি হলেও বিশ্ব ইজতেমার কারণে জনসভার কর্মসূচি দুই দিন পিছিয়ে ১২ জানুয়ারি করা হয়। এদিকে আওয়ামী লীগের এ জনসভা ঠেকাতে ঢাকাসহ ১৫ জেলায় গতকাল হরতাল আহ্বান করেছিল বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল। তাই বিএনপি ও ছাত্রদলের হরতাল-অবরোধের মধ্যে আওয়ামী লীগের এ জনসভাকে ঘিরে টানটান উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসভা ঘিরে নেয়া হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সমর্থকরাও বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে দলীয়ভাবে। এতকিছুর পরও জনসভা ছিল মিছিল-স্লোগানে মুখরিত। দলীয় নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় ও নিজ নিজ সংগঠনের স্থানীয় নেতার ছবি এবং ব্যানার নিয়ে জনসভায় যোগ দেন।

অবরোধে নাশকতা ঠেকাতে যা যা করা দরকার সরকার তার সবই করবে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, কোন স্বপ্নে উনি বিভোর? উনি যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশের মানুষকে অবরুদ্ধ করে রাখবেন, এটা কখনও হবে না। বিশ্ব ইজতেমা হয়ে গেল, হাজার হাজার মুসল্লি এতে অংশ নেয়। বিশ্ব মুসলমানদের দ্বিতীয় জমায়েত এটা। উনি ইসলামের ধ্বজা ধরে থাকেন। তাহলে ইজতেমার সময় অবরোধ করেন কেন? সহ্যেরও একটা সীমা থাকে। সরকারপ্রধান বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস করলে, জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেললে বরদাশত করা হবে না। খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ নয় জানিয়ে তিনি বলেন, চাইলে যে কোনো সময় তিনি বাসায় যেতে পারেন, কেউ বাধা দেবে না।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, গত নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আপনি যে ভুল করেছেন, তার খেসারত আপনাকে ও আপনার দলকেই দিতে হবে। জনগণ কেন এর খেসারত দেবে। জনগণ ক্ষেপে গেলে কিন্তু বিপদ হবে। বাংলাদেশের মানুষ শান্তি চায়, নিরাপত্তা চায়। দেশের জনগণকে বিএনপির ‘অবৈধ’ অবরোধ প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, পাড়ায়, মহল্লায় কারা বোমা বানায় আর কারা বোমা মারে তাদের ধরে পুলিশে দেবেন। শান্তি বিনষ্ট হতে দেবেন না। আমাদের যা যা করা দরকার আমরা তা করব।

খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি অফিসে কী করেন? উনাকে তো অবরুদ্ধ করে রাখা হয়নি। বাড়িতে চলে যাক। উনি নাকি সরকার উৎখাত না করে ঘরে ফিরবেন না! সন্ত্রাস ও জঙ্গি রানীর কথায় জনগণ আসবে না। শেখ হাসিনা খালেদাকে কটাক্ষ করে বলেন, ঘর থুইয়া অফিসে কেন? পুরনো অভ্যাস। ঘর ছেড়ে পালানো উনার পুরনো অভ্যাস। এ সময় খালেদা জিয়ার ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন উদাহরণ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, স্কুলে পড়াবস্থায় উনি সিনেমা করার জন্য বাড়িছাড়া হয়েছিলেন, এরপর জিয়ার সঙ্গে পালিয়ে চলে যান ময়মনসিংহে, মুক্তিযুদ্ধের সময় চলে গেলেন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা আসলাম বেগের সঙ্গে, ১৯৮৫ সালে পালালেন পূর্বাণী হোটেলে, ’৮৬ সালে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের কথা বলে ৩ দিন নিরুদ্দেশ, বিডিআরের ঘটনার ২ ঘণ্টা আগেই উনি সেনানিবাসের বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন আত্মগোপনে। শেখ হাসিনা বলেন, এর ধারাবাহিকতায় এবার উনি খাট, সোফা, গদি নিয়ে উঠলেন গুলশান কার্যালয়ে। পত্রিকায় বেরিয়েছে কয়েক দফা উনি খাট পরিবর্তনও করেছেন। তিনি বলেন, নিজে পালাবেন আর বলবেন অবরুদ্ধ!

শেখ হাসিনা বলেন, দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ) ও ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নে (আইপিইউ) জয়ী হয়েছি। এ নির্বাচন যদি বৈধ না হতো তাহলে এতগুলো দেশের ভোট বাংলাদেশ পেত না। তিনি বলেন, সারা বিশ্ব বোঝে না, বুঝেন শুধু উনি (খালেদা জিয়া)। আর উনার কুলাঙ্গার পুত্র (তারেক রহমান) যে মুচলেকা দিয়ে গিয়েছিল আর রাজনীতি করবে না। মানি লন্ডারিং মামলা ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি। শেখ হাসিনা বলেন, আর এখন যেমন মা তেমন পুত্র। দেশের মানুষের ওপর জুলুম-অত্যাচার শুরু করেছে।

শেখ হাসিনা তার সরকারের গত এক বছরের নানা অর্জনের কথা তুলে ধরে বলেন, এক বছর সফলতার সঙ্গে পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের কাছে এজন্য কৃতজ্ঞ। এ সময়ে সমুদ্রসীমার রায়ে বাংলাদেশ বিজয়ী হয়েছে। মন্দা মোকাবেলা করে অর্থনৈতিক গতি ঠিক রাখতে পেরেছে বিশ্বের এমন ৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আমাদের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২। মুদ্রাস্ফীতি ১২-১৩ থেকে নামিয়ে ৬ দশমিক ১-এ নিয়ে এসেছি। দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে পেরেছি। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করেছি।

শেখ হাসিনা বলেন, সরকার যখন সফলতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করছে এমন সময় বিএনপি নেত্রীর মাথায় ভূত চাপল, ৫ জানুয়ারি থেকে আন্দোলন। কিসের আন্দোলন? জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গিবাদীদের নিয়ে জঙ্গির নেত্রী ও সন্ত্রাসের নেত্রী মানুষ খুন করেন। বিএনপি নেত্রীর আগুনে মানুষ পুড়ছে, উনার ভেতরে মনুষ্যত্ব থাকলে মানুষ হত্যা করত না।

জনসভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য এবং শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী ও মোহাম্মদ নাসিম, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ আজিজ, সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুগ্ম সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, শ্রমিক লীগের সভাপতি শুক্কুর মাহামুদ, মহিলা লীগের সভানেত্রী আশরাফুন্নেছা মোশাররফ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ, কৃষক লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাউছার, যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আক্তার প্রমুখ।

আমির হোসেন আমু বলেন, খালেদা জিয়া অবরোধ ডেকে ঘরে বসে আরাম-আয়েশ করছেন। তিনি চান অবরোধের নামে গাড়িতে আগুন দিয়ে, মানুষ হত্যা করে, দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে। তাই সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। তোফায়েল আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নত দেশ গড়ার জন্য কাজ করছেন। আর খালেদা জিয়া দেশকে পিছিয়ে দেয়ার জন্য অবরোধ ডেকে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়ার মধ্যে পার্থক্য এটাই। একজন বাংলাদেশকে উন্নত দেশে রূপান্তর করতে চান আর একজন বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, খালেদা জিয়ার পোলা (ছেলে), লন্ডনে বসে বাজে কথা কয়। আজকের এই জনসভা থেকে ঘোষণা করতে চাই, তার পোলাকে বাংলাদেশে চিরদিনের জন্য অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে চাই। এটা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। অবরোধকে অবিলম্বে অবৈধ ঘোষণার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, অবরোধের নামে জ্বালাও-পোড়াও কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নয়। প্রধানমন্ত্রী এখানে আছেন, আমি বলব- অবিলম্বে এই অবরোধকে অবৈধ ঘোষণা করা হোক এবং খালেদা জিয়াকে আইনের আওতায় আনা হোক।

খালেদা জিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে মতিয়া চৌধুরী বলেন, ভারতের বিজেপি নেতার টেলিফোন ভুয়া। ২৮টি মামলার আসামিকে দিয়ে কংগ্রেসম্যানদের নামে ভুয়া বিবৃতি দিয়েছেন। সেটাও ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। আপনাকে যদি অমিত শাহ ফোন করে থাকে আপনি ফোন রেকর্ড প্রকাশ করুন। আসলে আপনার জন্মদিন ভুয়া, সার্টিফিকেট ভুয়া, টেলিফোন ভুয়া- সব ভুয়া।

মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ২০১৯ সালে নির্বাচনের মাঠে খেলা হবে। আপনার সাহস থাকলে সেই খেলার মাঠে অংশ নেবেন। এর আগে নির্বাচন হবে না এবং সেই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হ্যাটট্রিক করবেন।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিএনপির উদ্দেশে বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও শেখ হাসিনার অধীনে হবে। ওই নির্বাচনও আপনারা বয়কট করতে পারেন। তবে করলে আপনাদের অস্তিত্ব থাকবে না।’ তিনি বলেন, ‘গত পরশু দিন একটি পত্রিকায় দেখলাম একজন বুদ্ধিজীবী লিখেছেন, শেখ হাসিনাকে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যেতে পারে। কেন যে এসব বুদ্ধিজীবী খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আসতে বলেননি। তারা মনে করেছিলেন, আওয়ামী লীগ ফুঁ দিলে উড়ে যাবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো ফুঁ দিলে উড়ে যাওয়ার দল নয়।’

বিএনপির উদ্দেশে আশরাফ আরও বলেন, ‘আপনারা যে নির্বাচনে আসলেন না এই ভুলটা স্বীকার করেন।’ তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বিএনপি অশুভ দল। এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। দলকে শক্তিশালী করুন।

উৎসঃ যুগান্তর