সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

দুই ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ বাংলাদেশের

pic-19_155916
বাংলাদেশ : ৫০ ওভারে ২৯৭/৬
জিম্বাবুয়ে : ৩৯.৫ ওভারে ১৭৩
ফল : বাংলাদেশ ১২৪ রানে জয়ী
হতে পারত এনামুল হকের চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরি। হলো না কিন্তু।
৫০ ওভারের ক্রিকেটে তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানের চার হাজার রানের মাইলফলকও ছিল দৃষ্টিসীমায়। সময়ের প্রবাহে সেটি দৃষ্টির আড়ালে মিলিয়ে গেল যদিও।
স্পেলের শুরুটা এমন বিধ্বংসী ছিল যে মাশরাফি বিন মর্তুজার টানা দ্বিতীয় ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার জয় অসম্ভব ছিল না মোটেও। সম্ভব তো তা হলো না তবু।
এত সব না হওয়ার ভিড়ে কাল শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সবুজ চত্বরে হলো যা, সেটির মূল্য অমূল্য। এর তুল্য খুঁজে পাওয়া অসাধ্য না হলেও দুঃসাধ্য। বছরজুড়ে হারের চক্রে হাবুডুবু খাওয়া বাংলাদেশের জন্য পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ তিন খেলা শেষে পকেটে পুরে ফেলা কী চাট্টিখানি ব্যাপার! জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১২৪ রানের দাপুটে জয়ে দারুণ সেই প্রাপ্তি যোগ হলো কাল। আর দলীয় সেই অর্জনের আনন্দে কোথায় ভেসে গেল ব্যক্তিগত হা-হুতাশগুলো!
অনেক বছর ধরেই, বিশেষত ওয়ানডে জয় আর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কাছে বিশেষ কিছু না। একদার ওই ‘সোনার হরিণ’ দক্ষ শিকারির মতো শরবিদ্ধ করে তারা নিয়মিত। সমশক্তি তো বটেই, নিজেদের দিনে হারিয়ে দেয় পরাশক্তিদেরও। কিন্তু ২০১৪ সালে বাংলাদেশের কী যে হলো! জয়টা হয়ে ওঠে মহার্ঘ। আর জিততে জিততে হেরে যাওয়াটা তো পরিণত প্রায় নিয়মিত দৃশ্যে। চোখের সামনে ভেসে বেড়ানো সেই মেঘমালার মতো তাই তৈরি হয় বিভ্রম, সজল নয় বলে যা ঝরায় না বৃষ্টি।
বছরের শেষভাগে এসে অবশেষে সাফল্যের বৃষ্টিধারা ঝরল অঝোরে। যাতে খড়কুটোর মতো ভেসে গেল জিম্বাবুয়ে। প্রথম ওয়ানডেতে ৮৭ রানের ব্যবধানে, দ্বিতীয়টিতে ৬৮ আর কাল ১২৪ রানে। স্কোরকার্ডের সাক্ষ্য, কী আয়েশি জয়ের আনন্দেই না ভিজেছে বাংলাদেশ!
মিল আছে তিন ম্যাচের চিত্রনাট্যের আরো নানা উপাদানে। সব ম্যাচেই আগে স্বাগতিকদের ব্যাটিং করাতে যেমন। আবার এক ইনিংস শেষে খেলার গন্তব্য এক রকম নির্ধারিত হয়ে যাওয়াতেও তেমনি। বাংলাদেশের মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ২৫০-এর ওপর রান তাড়া করে জিতবে জিম্বাবুয়ে- তাদের নিজেদের প্রত্যাশার পরিধিও হয়তো এত বিস্তৃত না। আর কাল যখন ৩০০ ছুঁই ছুঁই রান উঠে যায়, সফরকারীদের জয়ের আশা কফিনবন্দি সেখানে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রস্তর যুগে এ দেশ সফরে আসা ডেকান ব্লুজ দলও এই জিম্বাবুয়ের চেয়ে শক্তিশালী কি না, প্রেসবক্সে এমন আলোচনা তুলে দেওয়া সফরকারীরা ২৯৮ রান করে জিতবে কিভাবে!
চট্টগ্রামে যেখানে শেষ করেছিল, ঢাকায় সেখান থেকে শুরুর সংকল্প অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার মুখে শোনা গেছে ম্যাচের আবহে। আর সেটির যথার্থ প্রতিফলন ওপেনিং জুটিতে। তামিম ইকবাল ও এনামুল হক দ্বিতীয় ওয়ানডে অবিচ্ছিন্ন থেকেছেন ১৫৮ রান পর্যন্ত। কাল বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে জমা করে গেছেন ১২১ রান। টানা দুই ম্যাচে ওপেনিংয়ে শতরানের জুটি! এ সিরিজ শুরুর আগ পর্যন্ত খেলা ২৯৭ ওয়ানডেতে সাকল্যে যেখানে ছিল ইনিংসের শুরুতে সাতটি মাত্র সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ। দাপুটে বাংলাদেশ কিংবা কুঁকড়ে যাওয়া জিম্বাবুয়ের এক খণ্ড প্রতিফলন হয়ে রইল তাই তামিম-এনামুলের জুটি।
কাল সেটি অবশ্য হতে পারত আরো বড় রানের। হলো না তামিমের দুর্ভাগ্যের রান আউটে। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে চার হাজার রান থেকে ৯৫ রান পিছিয়ে ক্রিজে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৪০ রান কমিয়ে আনেন অনায়াসে, ফ্রি-হিটে ‘ক্যাচ’ দেওয়া মাথায় রেখেও বলা যায় তা। এর পরই ২৬তম ওভারের সেই দুর্ঘটনা। এনামুলের সঙ্গে বোঝাপড়ায় দুই রান হয়ে যায় সহজে, ব্যাট হাত থেকে পড়ে যাওয়ার পরও তামিম পৌঁছে গিয়েছিলেন দাগের ভেতর। কিন্তু বেলস ফেলে দেওয়ার সময় তাঁর দুই পা-ই যে শূন্যে! ১২১ রানের ওপেনিং জুটি ভেঙে যায় এভাবেই।
আগের ম্যাচে ব্যাটিং অর্ডারের সাতে চলে যাওয়া মমিনুল হক কাল এসেছেন ৩ নম্বরে। কিন্তু স্বচ্ছন্দ ছিলেন না খুব, পারেননি ১৫-র বেশি করতে। ওদিকে এনামুল খেলেছেন নিজের মতো। আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি মিসের আক্ষেপ ঘোচানোর খুব কাছে গিয়েছিলেন পৌঁছে। কিন্তু ৯৫ রানে দাঁড়িয়ে অহেতুক পুল করতে গিয়ে বাউন্ডারিতে দেন ক্যাচ। বেখেয়ালে ফেলে আসেন চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরিটি।
ব্যক্তিগত অমন অর্জনের হাতছানি ছিল সাকিবের সামনেও। ওয়ানডেতে চার হাজার রানের মাইলফলকে পৌঁছানো যে ‘মল্লযুদ্ধ’ চলছে তাঁর তামিমের সঙ্গে, সেখানে এগিয়ে ছিলেন এ অলরাউন্ডার। কাল বন্ধুর সমান ৪০ রান করেও রইলেন এগিয়ে। তবে চার হাজারি ক্লাবে ঢোকা হয়নি এখনো। ৩৯৭৬ রানে গেলেন থেমে। সাকিবের পর মুশফিকুর রহিম (৩৩), মাহমুদ উল্লাহ (৩৩*), সাব্বির রহমানদের (২২) ছোট; কিন্তু কার্যকর ইনিংসগুলো বাংলাদেশের ইনিংস নিয়ে যায় ২৯৭ রানে।
জিম্বাবুয়ের জন্য সেটিই তো এভারেস্টসম!
ব্যাটিংয়ের শুরুর মিল যেমন আগের ম্যাচের মতো, বোলিংয়েও তেমনি। অনেক দিন পর আবার গোখরোর ফোঁসফাঁস মাশরাফির বোলিংয়ে। চট্টগ্রামের প্রথম স্পেলের তিন উইকেটের ধারাবাহিকতায় কাল শুরুতে তুলে নিলেন দুই উইকেট, একটি যদিও আম্পায়ারের বদান্যতায়। ব্যাটে না লাগার পরও কট বিহাইন্ড ঘোষণা করায় তুমুল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখালেন হ্যামিল্টন মাসাকাদজা। ওদিকে মাশরাফির প্রতিক্রিয়ায় তীব্র হতাশার ছাপ পরবর্তী সময়ে আরো অন্তত দুটি নিশ্চিত শিকারে আম্পায়ারের সায় না থাকায়। ভুল ঢাকতে গিয়ে আবারও ভুলের পথে পা বাড়ালেন যে আম্পায়ার আনিসুর রহমান!
বাংলাদেশের জয়ের পথে কাঁটা হতে পারেনি সেই ভুল। এলটন চিগুম্বুরার অপরাজিত ৫৩ রানও নিঃসঙ্গ সেনাপতির লড়াই। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে চার উইকেট নিয়ে আরাফাত সানি যখন জিম্বাবুয়েকে ১৭৩ রানে অলআউট করে দেন, ১০.১ ওভার অব্যবহৃত তখনো। ১২৪ রানের বিস্ফোরক জয়ে সব মিলিয়ে ১৬তম আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অষ্টম সিরিজ জয় নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের।
উপলক্ষ উৎসবের। কাল ম্যাচ শেষে বল্গাহীন আনন্দের প্রকাশে তাই হতে পারত অনেক কিছু। স্টেডিয়ামের কংক্রিটের মাঝে বিজয়ী বীরদের ল্যাপ অব অনার, ফ্লাডলাইটের রুপালি আলোয় উৎফুল্ল দর্শকদের রূপসী মিছিল, ছায়াপথে আনন্দকণা ছড়িয়ে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের উল্লাসের কাঁপুনি। হলো না কিন্তু এর প্রায় কিছুই। বিজয়ী সবার উল্লাসে বরং পরিমিতি, উচ্ছ্বাসে সংযম। তোলা রইল সব যেন পহেলা ডিসেম্বরের জন্য। ৫-০ প্রত্যাশায়! হোয়াইটওয়াশের প্রতীক্ষায়!
দোল পূর্ণিমার দোলায় সে দিনই তাহলে দুলবে বাংলাদেশ!