শুক্রবার, ২৫ জুন ২০২১, ১১ আষাঢ় ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

ঢাকা-দিল্লি নিরাপত্তা চুক্তিগুলো অজানা

47260_f6

 

ভারতে ক্ষমতায় এসেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। তার সময়ে ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক শক্তিশালী হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তবে তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনা সরকারের বৈধতা নেই। তাই তার পক্ষে ভারতের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে সমঝোতা করা সম্ভব নয়। কারণ তাদেরকে কেউ গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। খালেদা জিয়ার ভাষায়, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোটবদ্ধতাকে নিছক নির্বাচনী সমঝোতা, আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘জামায়াত ও অন্যান্য উগ্র ধর্মীয় দলের ঘনিষ্ঠতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে’ বলে উল্লেখ করেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন ঢাকায় তার দপ্তরে টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাংবাদিক জয়দীপ মজুমদারকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিভিন্ন ইস্যু উঠে আসে। খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার অবৈধ। আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থকে সামনে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ওই সাক্ষাৎকারটির তরজমা এখানে অবিকল তুলে ধরা হলো:প্রশ্ন: ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কি? উত্তর: পরিবর্তনের আশায় ভারতের মানুষ নরেন্দ্র মোদিকে বিপুলভাবে জয়যুক্ত করেছে। ভারতের নতুন সরকার তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমপর্কের ক্ষেত্রে কি ধরনের নীতি গ্রহণ করবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। আমাদের অনিষপন্ন দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো সমাধানে তার দেয়া নিশ্চয়তার ব্যাপারে আমাদের আশাবাদ রয়েছে। সার্ক শক্তিশালী করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর জোর দেয়ার বিষয়টি একটি ভালো সূচনা।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশের ব্যাপারে মোদি সরকারের নীতি পূর্ববর্তী কংগ্রেস সরকারের চেয়ে ভিন্ন হবে?
উত্তর: বাংলাদেশের সঙ্গে সমপর্কোন্নয়নের ব্যাপারে ভারতের নতুন সরকার কিভাবে অগ্রসর হয় সেটা পরিষ্কার হতে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। ভারতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে এনডিএ সরকারের নীতি বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাবে। অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত এলাকায় নিরীহ মানুষ হত্যা, স্থল সীমান্ত ইস্যু ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার মতো অনিষপন্ন দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলোর ক্ষেত্রে উভয়পক্ষের জন্য লাভজনক হয় এমন কোনো সমাধানের জন্য দিল্লি আন্তরিকভাবে কাজ করবে বলে আমরা আশা রাখি। এর মাধ্যমে উভয় দেশের মানুষের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি হবে এবং আমাদের সমপর্ককে আরও গভীরতা ও দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা দেবে।
প্রশ্ন: আপনি কিংবা আপনার দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা কি মোদির সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী? যদি তা-ই হয়, সেক্ষেত্রে আপনারা মোদির সঙ্গে কি কি বিষয়ে কথা বলতে চাইবেন? এবং সে সাক্ষাৎ থেকে আপনাদের প্রত্যাশাইবা কি হবে?
উত্তর: আমরা সবসময় বিজেপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে আগ্রহী। বিএনপি বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের মানুষ আমাদের ওপর তাদের আস্থা রেখেছে, আমাদের বেশ কয়েকবার ক্ষমতায় এনেছে। তাই এটা যৌক্তিক যে, আমাদের দলের সঙ্গে বিজেপি ও ভারতের অন্যান্য দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ হওয়া দু’দেশের দ্বিপক্ষীয় সমপর্ক উন্নত করার স্বার্থেই একটি রীতিতে পরিণত হওয়া উচিৎ। এ ধরনের যোগাযোগের ফলে তা আমাদের উভয় পক্ষকে জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল বিষয় নিষপত্তিতে সক্ষম করবে।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন যে বিজেপির সঙ্গে বিএনপির সমপর্কোন্নয়নে জামায়াতের সঙ্গে আপনার জোটবদ্ধতা একটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে?
উত্তর: জামায়াতের সঙ্গে আমাদের জোট হচ্ছে শুধুমাত্র নির্বাচনী বোঝাপড়া। এটা কোনো অবস্থাতেই আদর্শগত নয়। বরং এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই জামায়াত ও অন্যান্য উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আমরা আমাদের প্রতিবেশী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্য বন্ধুদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় আমাদের জনগণের কল্যানে যা কিছু দরকার সেটাই আমরা করব। বিজেপির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সেই আলোকেই জোরদার হবে।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন যে, শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশ থেকে ভারত বিরোধী জঙ্গি গ্রুপগুলোর মূলোৎপাটন করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে?
উত্তর: শেখ হাসিনার সরকার ভারতের সঙ্গে বেশ কিছু নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তিতে প্রবেশ করেছে বলে প্রকাশ। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এখনও ওইসব চুক্তির ব্যাপ্তি এবং তার বিস্তারিত কিছু জানে না। কারণ ওইসব চুক্তির কোনটিই এ পর্যন্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এটা কতদূর সফলতা লাভ করেছে সে বিষয়েও আমরা অবগত নই। যদিও সাম্প্রতিক মিডিয়া রিপোর্ট থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার, বোমা বিস্ফোরণ, জঙ্গি কর্মকাণ্ড এবং মাদক, অর্থ ও অস্ত্র পাচারের  মধ্যে যোগসূত্র থাকার কথা জানা যাচ্ছে।
বিএনপি কখনও সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ অথবা কট্টরপন্থি কোন কর্মকাণ্ড  সহ্য করবে না। আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে জঙ্গি, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে, তাদের গ্রেপ্তার করে এবং তাদেরকে আইনের আওতায় এনে নিয়মিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছি। অন্যের দ্বারা ভারতের স্বার্থের পক্ষে অনিষ্টকর এমন কোন কাজ কখনও আমরা আমাদের ভূখণ্ডে হতে না দেয়ার ব্যাপারে আমাদের সংকল্প অটুট রয়েছে।
প্রশ্ন: তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি কি নিষ্পত্তির দিকে যাচ্ছে ?
উত্তর: এই সময়ে, এই দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সমাধানের কোন ইঙ্গিত নেই। আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থকে সামনে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে  বাংলাদেশের অনেকেই মনে করেন। ঢাকায় যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের কোন বৈধতা নেই এবং তারা বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে কথা বলার মতো অবস্থানে নেই। আর গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা তো দূরের কথা, কেউ তাদেরকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন না ।
প্রশ্ন: ভারতের সঙ্গে আর কি কি ইস্যুর সমাধান হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ও সীমান্তে নিরপরাধ বাংলাদেশীদের হত্যার মতো বিষয়গুলোর সমাধান আমাদের অনুকূলে হতে ন্যায্য অগ্রাধিকার পেতে হবে। বাংলা-ভারত সম্পর্কের শেকড় ইতিহাসে এবং ভুগোল তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা নির্দেশক। পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, পারস্পরিক সুবিধা ও পারস্পরিক স্বার্থের নীতির ভিত্তিতে সামনে অগ্রসর হওয়ার প্রয়াস চালাতে হবে। সন্ত্রাস ও বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে আসা হুমকি ও নিরাপত্তার মতো মূল ইস্যুগুলো নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে সে বিষয়ে আমাদেরকে অবশ্যই আরও সংবেদনশীল হতে হবে। আমাদের সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করতে দ্বিপক্ষীয় পর্যায় ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট উভয় ক্ষেত্রে টেকসই সহযোগিতা হলো মৌলিক ভিত্তি।
প্রশ্ন: ভারতে একটি সাধারণ ধারণা আছে যে, আওয়ামী লীগ হলো ভারতের প্রতি বন্ধুসুলভ। অন্যদিকে বিএনপি তা নয়…
উত্তর: বিএনপি ভারতের বন্ধু নয়- এমন একটি ধারণা সৃষ্টির জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা আছে। অথচ এটা সত্য থেকে অনেক দূরে। বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির প্রধান সফলতা হলো- সব দেশের সঙ্গে বন্ধুতপূর্ণ ও পারস্পরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক  পারস্পরিক সুবিধা ও মর্যাদার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বছরের পর বছর ভারতের পর্যায়ক্রমিক সরকারের নেতাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তখন আমরা কিভাবে সব ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে পারি সে বার্তা তাদের কাছে আমি পৌঁছে দিতে পেরেছি। আমাদের জনগণের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেছি। এবং আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছেন বলেই আমি আভাস পেয়েছি।