শুক্রবার, ২৯ অক্টোবর ২০২১, ১৪ কার্তিক ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

জালভোট, কেন্দ্র দখলের উৎসব, রাতেই ব্যালটে সিল, সংঘর্ষ-আগুন, সহিংসতায় নিহত ৪, তবুও সন্তুষ্ট ইসি

16275_f1

 

সহিংসতা, জাল ভোট ও কেন্দ্র দখলের নয়া রেকর্ড হলো চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে। ভোট শুরুর আগেই কেন্দ্র দখল করে ব্যালট বোঝাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সংঘাত-সহিংসতায় নিহত হয়েছেন চারজন। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে অন্তত ৩২টি কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। নয়টি উপজেলায় ২৬ জন প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন নির্বাচন চলাকালেই। দুপুরের মধ্যেই এসব উপজেলায় ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীর লোকজন কেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে সিল মেরে বাক্স বোঝাই করে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় নির্বাচন চলাকালে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মারা গেছেন। ঝালকাঠির রাজাপুরে সংঘর্ষে মারা গেছেন এক যুবলীগ কর্মী। আখাউড়ায় ব্যালট ছিনতাইয়ের সময় বিজিবি’র গুলিতে মারা গেছে একজন। কুমিল্লার বরুড়ায় সংঘর্ষে আহত যুবদল কর্মী চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান। বিভিন্ন স্থানে হামলা ও সংঘর্ষে নির্বাচনী কর্মকর্তা, পুলিশ ও সাধারণ ভোটাররা আহত হয়েছেন। নির্বাচন বর্জন করে হরতালের ঘোষণা দেয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি উপজেলায়। ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। বিএনপি অভিযোগ করেছে,  প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর লোকজন কেন্দ্র দখলের উৎসব করেছে। নির্বাচন কমিশন সেনাবাহিনীকে চিঠি দিয়ে ওই বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বলেও দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। সহিংসতার কথা স্বীকার করলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক জানিয়েছেন, নির্বাচন সম্পন্ন করতে পেরে কমিশন সন্তুষ্ট। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে,  আগের ধাপগুলোর চেয়ে এ ধাপে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সিইসি নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদের নিজ এলাকা চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে দিনভর কেন্দ্র দখল ও বোমাবাজির ঘটনা ঘটে। এ উপজেলায় নির্বাচন বর্জন করে হরতালের ডাক দিয়েছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। বরিশালের কয়েকটি উপজেলায় ভোট শুরুর আগেই কেন্দ্র দখল করে ভোট দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি কেন্দ্রে ভোট শুরুর আধাঘণ্টা  পর ১৮০০ ভোট পড়ে। যশোর সদর উপজেলায় দিনভর কেন্দ্র দখল ও বোমাবাজির ঘটনা ঘটে। ধামরাইয়ে দুই পক্ষের হামলা প্রিজাইডিং অফিসারসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন।
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে জানান, রাতেই বাক্স ভর্তি, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ভাঙচুর, প্রিজাইডিং অফিসারকে মারধর, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ হয়েছে নির্বাচন চলাকালে। গুলিতে মনির হোসেন নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। বরুড়া উপজেলায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম মিঠুকে মারধরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক আটকের ঘটনায় তার মা রাশেদা খানম বিকাল ৩টায় সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে তার ছেলেকে মুক্ত করে দেয়ার দাবি জানান। এদিকে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা  পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় বরুড়া উপজেলার দু’টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল নির্বাচনে বরুড়া ও মেঘনা উপজেলায় সংঘর্ষে প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিশ, ইউপি চেয়ারম্যানসহ কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচন চলাকালে বরুড়া উপজেলার মহেশপুর আজিজিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে একাধিকবার হামলা চালানো হলে প্রথম দফায় সোয়া ১১টার দিকে পুলিশ ৩০ রাউন্ড শটগানের গুলি ও ২ রাউন্ড  টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে বিকালে আবারও দখলের চেষ্টায় হামলা চালানো হলে ৬৪ রাউন্ড শটগান ও ১২ রাউন্ড চায়না রাইফেলের গুলি ছোড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। এ সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণে হোসেনপুর গ্রামের মনির হোসেন ও পুলিশ কনস্টেবল সোলেমানসহ কমপক্ষে ১৫ জন আহত হন। মনির হোসেনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। তিনি ছিলেন উপজেলার খোশবাশ ইউনিয়ন যুবদলের কর্মী। ওই কেন্দ্রে কর্তব্যরত পুলিশ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন জানান, কেন্দ্রটি দখলের জন্য দেড়/দুই হাজার লোক হামলা চালায়। এদিকে, তলাগ্রাম লাহা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ব্যাপক হামলা চালিয়ে ব্যালট পেপার ভর্তি ১০টি ব্যালট বাক্স ভাঙচুরসহ প্রিজাইডিং অফিসার ড. মহিউদ্দিন মো. শাহজাহান ভূঁইয়াকে বেধড়ক মারধর করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে কুমিল্লা সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ওই কেন্দ্রে আলী হোসেন নামের নতুন প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ দিয়ে বেলা ১১টার দিকে ভোটগ্রহণ শুরু করা হয়। কামেড্ডা শালুকিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে না পেরে স্থানীয় জনগণ বিক্ষোভ করে। ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ডা. জাকির হোসেন জানান, রাতে ৩০-৩৫ জন লোক আমাকে জিম্মি করে ১৭৫০টি ব্যালট পেপারে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের আনারস প্রতীকে সিল মারে। এসব ব্যালট পেপার সংরক্ষণ করা হয়েছে। পূর্ব নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ফখরুল ইসলাম জানান, শনিবার রাত ৩টার দিকে সশস্ত্র অবস্থায় ৩৫-৪০ জন লোক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আমাকে মারধরসহ জিম্মি করে ৮০০ ব্যালট পেপারে আনারস প্রতীকে সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়ে রাখে। বাগমারা পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে রাতে আনারস প্রতীকের পক্ষে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে রাখে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কেন্দ্রটি বন্ধ দেখা যায়। এছাড়া মুগুজী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আবদুল অদুদ জানান, রাতে ১০টি ব্যালট বই ছিনিয়ে নিয়ে  আনারস প্রতীকে সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়ে রাখা হয়। রাতে আদমপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ১১ শ’ ও খোশবাশ কেন্দ্রে ১৩ শ’ ব্যালট পেপারে আনারস প্রতীকে সিল মারা হয়। বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুল খালেক চৌধুরী ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সৈয়দ জহিরুল হক অভিযোগ করেন, উপজেলার ৮৬টি কেন্দ্রের মধ্যে আমড়াতলী, জোরপুকুরিয়া, শিলমুড়ী, লগ্নসার প্রা. বিদ্যালয়, সুন্দরদৌল, নসরতপুর সর. প্রা. বিদ্যালয়, কৃষ্ণপুরসহ প্রায় ৪০টি কেন্দ্রে সংশ্লিষ্ট প্রিজাইডিং অফিসারদের জিম্মি করে আওয়ামী লীগ দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের আনারস প্রতীকে রাতের বেলা ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সভর্তি করা হয়। এদিকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম মিঠুর মা সংবাদ  সম্মেলন করে একই অভিযোগ করে ভোট বর্জন করেন। তারা এসব কেন্দ্রে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানান। সরজমিন ঘুরে এসব কেন্দ্রের সামনে ভোট দিতে না পারা ভোটারদের বিক্ষোভ প্রদর্শন করে মিছিল করতে দেখা যায়।
স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে জানান, আখাউড়ার তারাগন কেন্দ্রের পাশে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার ১৫ মিনিট আগে বিজিবি’র গুলিতে  হাদিস মিয়া নামে উপজেলা যুবদলের সহ-সভাপতি নিহত হয়েছেন। গতকাল বিকাল  পৌনে ৪টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। জেলা প্রশাসক ড. মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বিজিবি’র গুলিতে নিহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছেন কেন্দ্র দখল করার চেষ্টা চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিজিবি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে গুলিবিদ্ধ হন উপজেলা যুবদলের সহ-সভাপতি হাদিস মিয়া (৩৫)। হাদিসকে  হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায়। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, সরকার দলীয় লোকজন কেন্দ্রের ভেতর ঢুকে সিল মারছে এই খবর পেয়ে বিএনপির কর্মীরা কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হলে দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যদের বাকবিতণ্ডা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনতে বিজিবি কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। এতে উপজেলা যুবদলের নেতা হাদিস মিয়া (৪৫) গুলিবিদ্ধ হন। হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মারা যান। এ ছাড়া আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন বলে খবর পাওয়া গেছে। বিজিবি জানায়, বিএনপি’র কর্মীরা ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে গুলিবর্ষণ করা হয়। তবে প্রিজাইডিং অফিসার জানান, আমার কেন্দ্রে কোন গোলযোগ হয়নি। আখাউড়ায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ৬টি কেন্দ্র দখল করে সব ভোট দেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে নাসিরনগর উপজেলার বুড়িশ্বর ইউনিয়নের শ্রীঘর দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্রীঘর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্বভাগ ইউনিয়নের পূর্বভাগ এসইএসডিপি উচ্চ বিদ্যালয়, চান্দেরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দাঁতমণ্ডল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কমপক্ষে ১৫টি ভোট কেন্দ্রে থেকে সকালে সরকার সমর্থকরা প্রতিপক্ষের লোকজনকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়।
রাজাপুর (ঝালকাঠি) প্রতিনিধি জানান, সরকারদলীয় প্রার্থীদের ভোট কারচুপি, অনিয়ম ও প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী নাসিম উদ্দিন আকন নির্বাচন বর্জন করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। অপরদিকে রাজাপুর উপজেলার তারাবুনিয়া ভোট কেন্দ্রে সহিংসতায় রিপন হোসেন নামে এক যুবলীগ কর্মীকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু ঘটে। রোববার দুপুরে উপজেলার তারাবুনিয়ায় নির্বাচনী সহিংসতায় রিপন হোসেন নামে এক যুবক আহত হন। পরে হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। তবে বিকাল চারটায় রাজাপুর প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মনিরউজ্জামান মনির নিহত রিপনকে যুবলীগ কর্মী বলে দাবি করেন। নির্বাচনে তার ১০-১৫ জন সমর্থকদের প্রতিপক্ষরা আহত করেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

 

উৎস- মানবজমিন