শনিবার, ২ মার্চ ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

খোশ আমদেদ মাহে রমজান

30166_f4
১৪৩৫ হিজরির আজ প্রথম রমজানুল কারীম শুরু হলো। রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমত আর ফজিলতের মাস রমজান আমাদের মাঝে আবারও এসেছে তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের পুষ্প শুভ্র ইস্পাত দৃঢ় চেতনা নিয়ে। নানা কারণে ও তাৎপর্যে এই মাস গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত। রমজান সিয়াম সাধনার মাস, নুযুলে কোরআনের মাস, লাইলাতুল কদরের মাস, ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধের মাস, তারাবিহ, তাসবিহ, জিকির আসকার ও কোরআন তিলাওয়াতের মাস। ত্যাগ, সংযম, সমবেদনা ও সহমর্মিতার বার্তাবহ এ মাস। রহমত, মাগফিরাত ও দোজখ থেকে নাজাতের মাস রমজান। এ সম্পর্কে মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনুল কারীমে ঘোষণা করেন যে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা এ মাসটি পায়, তারা যেন অবশ্যই রোজা পালন করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। এসব আয়াতে আল্লাহপাক সিয়াম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় রোজাকে আলাদা মর্যাদা দেয়া হয়েছে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহপাক ঘোষণা করেন, ‘রোজা শুধু আমারই জন্য এবং ইহার প্রতিদান আমি নিজেই দেবো।’ অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগিতে লোক দেখানোর যে সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু রোজার ইবাদতে সেই সম্ভাবনা নেই। এটা এমন একটি গোপন ইবাদত যা স্বয়ং রোজা পালনকারী এবং আল্লাহপাকই জানেন। এই মহামূল্যবান প্রতিদান তারাই পাবেন যারা দৈহিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং সর্বাঙ্গীণ পবিত্রতা সহকারে একনিষ্ঠভাবে রোজা পালন করেন। সিয়াম আরবি শব্দ, এর অর্থ হলো বিরত থাকা, আর শরিয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার এবং ইন্দ্রিয় তৃপ্তি ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা। রোজার শর্ত হলো বিশেষ ওই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আল্লাহপাকের প্রেমে বিভোর থাকা এবং বাজে কথা ও বাজে কাজ, সব ধরনের অন্যায় অপকর্ম থেকে দূরে থাকা। প্রকৃতপক্ষে রোজা এমনই একটি ইবাদত যার মাধ্যমে মানুষের দৈহিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি পরিপূর্ণভাবে সাধিত হয়। কারণ শুধু পানাহার ত্যাগ করলেই রোজ পালন হয় না। সেই সঙ্গে সর্বপ্রকার অবৈধ কাজ থেকে বিরত থাকা মাহে রমজান শরিফের আসল বৈশিষ্ট্য। রমজানুল করীমে রোজাদারের ইবাদতের প্রতিদানকে বাড়িয়ে দেয়া হয়। যদি নফল কাজ করে তাহলে ফরজের বরাবর প্রতিদান দেয়া হয়, আর যদি এক ফরজ পূর্ণ করে, তখন সত্তর ফরজের বরাবর তাঁর প্রতিদান দেয়া হয়। (ফতওয়ায়ে মিশকাত খণ্ড-১. পৃষ্ঠা: ১৭৩)। নুজহাতুল মাজালিস গ্রন্থে একটি ঘটনা উল্লেখ আছে যে, ‘এটা তখনকার ঘটনা, যখন মুসলমানরা জয়ী ছিল এবং কাফেররা তাদের মাঝে থাকতো, একদা এক প্রাচীন পারসিক যাজকের ছেলে রমজান মাসে দিনের বেলা পানাহার করছিল, যখন যাজক দেখলো তার ছেলে রমজান মাসে দিনের বেলা প্রকাশ্যে খাবার খাচ্ছে তখন তিনি তার ছেলের ওপর রাগান্বিত হয়ে গেলেন। সে তার সন্তানকে ধমক দিয়ে বললেন যে, তোমার লজ্জা হয় না যে, এটা মুসলমানদের পবিত্র মাস, তারা দিনে রোজা রাখে আর তুমি দিনে প্রকাশ্যে খাবার খাচ্ছো। ওই যাজকের পাশেই এক বুযুর্গ থাকতেন। যখন ওই যাজকের মৃত্যু হলো তখন ওই বুযুর্গ এ যাজককে স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি জান্নাতের মধ্যে। তিনি খুব অবাক হলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, আপনি তো পারসিক যাজক ছিলেন অথচ আমি আপনাকে জান্নাতের মধ্যে দেখছি, যাজক উত্তরে বললেন, একদিন আমার ছেলে রমজানুল মোবারকে প্রকাশ্যে খাচ্ছিল। আর আমি রমজানুল মোবারকের আদব রক্ষার্থে তাকে তিরস্কার করেছিলাম। মহান আল্লাহপাকের কাছে আমার এই আমল এতই পছন্দ হলো যে, মৃত্যুর সময় আমাকে কলেমা পড়ার তাওফিক দিলেন এবং আমি মুসলমান হয়ে মৃত্যুবরণ করলাম। তাই এখন আমি জান্নাতের স্বাদ অনুভব করছি।’ (নুজহাতুল মাজালিস খণ্ড-১. পৃষ্ঠা: ১৯১)। সুবহানাল্লাহ! কেবল রমজানের আদব প্রদর্শনের কারণে এক যাজকের ইমান নসিব হলো। তাহলে যে ভালভাবে হক আদায় করে রোজা রাখবে তার কি সুফল হবে? আর যে ব্যক্তি রমজানের অসম্মান করবে তার শাস্তি কি হবে, তাও অনুমান করুন। যদি কোন ব্যক্তি রমজান শরিফে কোন ওজর ছাড়া রোজা না রাখে এবং প্রকাশ্যে পানাহার করে তখন সে ফাসিক বলে গণ্য হবে এবং সে ইসলামী নির্দেশনাবলির অবজ্ঞাকারী সাব্যস্ত হবে। মুসলমান খলিফার নির্দেশে এমন ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে, যেন অন্য কোন মুসলমান রমজান মাসে দিনের বেলা খাওয়ার সাহস পায় না। (ফতওয়ায়ে শামী-খণ্ড-২. পৃষ্ঠা: ১৫১)।