শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

কেন্দ্রীয় কারাগার জুনের মধ্যে কেরানীগঞ্জে

pic-02_166855

 

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার আগামী জুন নাগাদ লালবাগ থেকে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরিত হবে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় কারাগারের ৯ একর জায়গা জনগণের জন্য একটি পার্ক ও দুটি জাদুঘর নির্মাণে ব্যবহার করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার কাশিমপুর কারাগার ক্যাম্পাসের প্যারেড গ্রাউন্ডে কারা সপ্তাহ-২০১৪ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি আরো বলেন, দেশ ও জাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যাতে কারাগারের ভেতর থেকে জঙ্গি তৎপরতা বা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে না পারে সে লক্ষ্যে কারা নিরাপত্তাব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি কারারক্ষীদের হুঁশিয়ার করে বলেন, যারা এ জঙ্গি, সন্ত্রাসী কিংবা মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কারা সপ্তাহ উপলক্ষে কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ সাত বছর পর কারা সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। আমি আশা করি, এ সপ্তাহ পালনের মধ্য দিয়ে আপনাদের কর্মস্পৃহা আরো বাড়বে এবং বন্দিদের সুশৃঙ্খলভাবে নিরাপদ আটক ও তাঁদের প্রতি মানবিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ‘ক্রিমিনাল ডাটাবেইস’ তৈরি করা প্রয়োজন। এই ডাটাবেইসের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তথ্য সমন্বয় করে সহজেই অপরাধী বা ভুয়া পরিচয় প্রদানকারীকে শনাক্ত করা যাবে। এ উদ্দেশ্যে কারাগারে আসা বন্দিদের ডাটাবেইস তৈরির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া কারাগারে আটক অপরাধীদের শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, কোনো অপরাধীই যেন কারাগারে এসে আরো বড় অপরাধী হয়ে বের না হয়। তিনি বলেন, কারাগারে আসা বন্দিদের ‘বন্দি হিসেবে নয়’ সমাজের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সমাজের একজন সদস্য কারাগারের পরিবেশের কারণে অপরাধী হয়ে বের হলে, সমাজ আরো কুলষিত হবে। তাই বন্দিদের সুশৃঙ্খল ও নিরাপদভাবে আটক রেখে তাদের প্রতি মানবিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

‘পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়’- এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে দীর্ঘ সাত বছর পর কারা সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। কারা সপ্তাহ পালনের মধ্য দিয়ে কারারক্ষীদের কর্মস্পৃহা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমাদের সরকার সব সময় কারাগারের পরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে আমরা কারা বিভাগের সদর দপ্তরসহ ৩৬টি কারাগার নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম, যার সুফল বর্তমানে কারাবন্দিসহ পুরো প্রশাসন পাচ্ছে। বন্দিদের বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাসহ স্বাস্থ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, “২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার ‘কারা স্মৃতি জাদুঘর’ স্থাপন করি। এটি জাতীয় জাদুঘরের শাখা জাদুঘর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের পর এ জাদুঘর দুটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এতে মানুষ জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতার কারাবাসকালীন স্মৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবে। এ ছাড়া আমরা এক শ বছরের পুরনো জরাজীর্ণ খুলনা জেলা কারাগারকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে বৃহৎ আকারে নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারকেও আরো বড় পরিসরে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।’

শেখ হাসিনা জানান, বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় এরই মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, মেহেরপুর, গোপালগঞ্জ, নীলফামারী ও নেত্রকোনা জেলায় নতুন কারাগার চালু হয়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুর, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ফেনী, মাদারীপুর ও পিরোজপুর জেলায় নতুন কারাগার নির্মাণের কাজ চলছে। চট্টগ্রাম কারাগারের আধুনিকায়নের কাজ চলছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঝুঁকিপূর্ণ পেরিমিটার ওয়ালের স্থলে নতুন পেরিমিটার ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঢাকা, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার এবং কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে শিশুদের ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করেছি। কারা কর্মকর্তাদের জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় অফিসার্স মেস নির্মাণ করা হয়েছে। কারারক্ষীদের প্যারেডে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণের ব্যবস্থা আমরাই করেছি। বেশ কিছু কারাগারে মহিলা কারারক্ষীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের আবাসনের সমস্যা সমাধানের আরো একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৪৩ বছরেও কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। কারা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য রাজশাহীতে কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি এবং ঢাকায় একটি কারা স্টাফ কলেজ স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, কারা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণে প্রায় দুই একর জায়গায় পার্কিং ব্যবস্থাসহ বহুতল কনভেনশন সেন্টার স্থাপন করার পরিকল্পনা আছে। সেখানে সিনেপ্লেক্স, সুইমিংপুল, জিমন্যাশিয়ামসহ অন্যান্য বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে। এখান থেকে অর্জিত আয় কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। বাকি অংশে কারা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, স্বরাষ্ট্রসচিব মোজাম্মেল হোসেন খান, আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, জেলা পরিষদের প্রশাসক আখতারউজ্জামান, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ হারুন অর রশীদসহ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সকাল ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান মঞ্চের সামনে এসে পৌঁছালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন তাঁকে স্বাগত জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার প্যারেড গ্রাউন্ডে প্যারেড পরিদর্শন ও সশস্ত্র অভিবাদন গ্রহণ করেন। জাতীয় কারা সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর তিনি কারামেলা ও প্রদর্শনী কেন্দ্র উদ্বোধন এবং পরিদর্শন করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ দরবারে উপস্থিত হয়ে কারারক্ষী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। ওই সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও কারা মহাপরিদর্শক।