শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

এ কে খন্দকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার দাবি

pic-29_125005

মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ‘বিকৃত’ করে বই লেখার অভিযোগে মুক্তিযুদ্ধকালীন উপসেনাপ্রধান ও সাবেক মন্ত্রী এ কে খন্দকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন সরকারি ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা। ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ শীর্ষক ওই বইয়ের ওপর দেড় ঘণ্টার আলোচনায় সংসদ অধিবেশন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উপস্থিত সব সংসদ সদস্য আলোচনায় অংশ না নিলেও আলোচকদের সমর্থন দেন। বক্তারা বইটি বাজেয়াপ্ত করা এবং লেখকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার দাবি জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে এ বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন সাবেক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। ওই সময় সংসদ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া। মাগরিবের নামাজের বিরতির পর অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় অংশ নেন সরকারি দলের প্রবীণ নেতা শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাসদের মঈন উদ্দীন খান বাদল ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ।
আলোচনা শেষে স্পিকারের আসনে থাকা ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, ‘ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের সময় আমারও কিছুটা সম্পৃক্ততা ছিল। জাতির জনককে হত্যার পর খুনি মোশতাককে সমর্থনকারী তাঁর বইতে কী লিখলেন, তাতে জাতির কোনো যায়-আসে না। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে উনি যা লিখেছেন তা অবশ্যই জাতির সামনে অবমূল্যায়িত হবে। কেননা বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু।’
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, একাত্তর নয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই দেশকে স্বাধীন করতে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু হয়। ধাপে ধাপে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন এবং একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই বাঙালি জাতি যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিল। এ কে খন্দকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘কাউকে ছোট করে কেউ বড় হতে পারে না। তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে টানাটানি করছেন না, তাঁরা স্বাধীনতা ও বাঙালি জাতির অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি করছেন। জাতির ওপর আঘাত করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের মিথ্যাচার করা হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রগুলো কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়, পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে। এই অপশক্তিই ১৫ আগস্ট ঘটিয়েছিল, ২১ আগস্ট ঘটিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে বারবার হত্যা করার চেষ্টা করছে। এদের ব্যাপারে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তোফায়েল আহমেদ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, “ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’ বলেই শেষ করেছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণের দিন আমরা মঞ্চেই ছিলাম। আমরা মঞ্চে থেকে জানলাম না অথচ এ কে খন্দকার সাহেব তাঁর লেখায় বললেন বঙ্গবন্ধু বক্তব্য শেষে নাকি ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন! এটা উনি কোথায় পেলেন? বায়ান্ন সাল থেকে ঊনসত্তর সাল পর্যন্ত এ কে খন্দকার পাকিস্তানে ছিলেন। এ দেশে কী হয়েছে তা তিনি জানতেন না। এই এ কে খন্দকারই বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রেডিও স্টেশনে গিয়ে খুনি মোশতাককে সমর্থন দিয়েছিলেন। উনার (এ কে খন্দকার) লেখায় রয়েছে, আমাদের যুদ্ধের নাকি প্রস্তুতি ছিল না! তবে কি হাওয়ার ওপর দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে? বাস্তবতা হচ্ছে- ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।”
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, “কে কী লিখল সেটা বাংলাদেশের ইতিহাস নয়। ২৫ মার্চের পর বাঙালি জাতি স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য কারোর ঘোষণার অপেক্ষা করেনি। ৭ মার্চের ভাষণেই বঙ্গবন্ধু পরিষ্কারভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। ‘জয় পাকিস্তান’ কোথায় পেয়েছেন এ কে খন্দকারকে প্রমাণ করতে হবে। বিকৃত ইতিহাস কার স্বার্থে করা হচ্ছে? এদের ব্যাপারে দেশবাসীকে নতুন করে ভাবতে হবে।” তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কোনো প্রতিবাদ না করে খুনি মোশতাকের প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করেছেন। এরশাদেরও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন। এবার মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ায় ‘ব্যর্থ প্রেমিকের আর্তনাদ’ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর বইয়ে। তিনি আরো বলেন, ‘একাত্তরে দুই ধরনের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একপক্ষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে, অপরপক্ষ পাকিস্তানের এজেন্ট হয়ে। এই ধরনের বিকৃত লেখা লিখে এ কে খন্দকার সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। আইএসআইয়ের টাকা খেয়ে লিখেছেন কি না জানি না, কিন্তু কারোর প্ররোচনায় কিংবা কোনো এজেন্সির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে এ ধরনের লেখা তিনি লিখেছেন।’ অবিলম্বে এ কে খন্দকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাঁর লেখা বইটি বাজেয়াপ্ত করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর-উত্তম বলেন, ‘কোনো মহলের প্ররোচনায় ইতিহাসের তথ্যগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করা হচ্ছে। আমি একাত্তরের ২৪ মার্চ চট্টগ্রামে যুদ্ধ শুরু করেছি। সেদিন জিয়াউর রহমান সেই যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বাংলাদেশকে ১০টি সেক্টরে ভাগ করা হয় ১০ এপ্রিল, এর আগে নয়। এ কে খন্দকার সাহেব বলেছেন, পাকিস্তানিরা নাকি তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কখনোই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল না। তিনি সব সরকারের আমলে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন।’ রফিকুল ইসলাম প্রশ্ন রেখে বলেন, “হঠাৎ করেই কিভাবে এ কে খন্দকার ৭ মার্চের ভাষণে কোথায় পেলেন ‘জয় পাকিস্তান’? এত দিন না বলে এখন কেন বলছেন? এর পেছনে রহস্য রয়েছে। আমি তাঁর এই লেখার নিন্দা করি। আমি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই, এ ধরনের বিকৃত ইতিহাসসংবলিত বইটি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করুন।”
জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, ‘যিনি জাতীয় পার্টির মন্ত্রী ছিলেন, মাত্র কদিন আগে আওয়ামী লীগেরও মন্ত্রী ছিলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যাঁরা খুনি মোশতাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন এ কে খন্দকার সাহেব। স্বাধীনতার এত বছর পর তিনি মিথ্যা ইতিহাস লিখে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। ‘জয় পাকিস্তান’ উনি কোথায় পেলেন? এসব কুলাঙ্গার বিকৃত বই লিখে জাতিকে বিভ্রান্ত করছেন।’
জাসদের মঈন উদ্দীন খান বাদল বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রবাদ আছে- বাংলাদেশে উপকার করলে গালি খেতে হয়। উনি সব সুবিধা নিলেন, পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন। মন্ত্রী থাকাকালে কোনো ফোরামে এ ব্যাপারে সামান্য কথা বলেননি কেন? সংবিধান লঙ্ঘন করা যদি অপরাধ হয়, তবে সেই অপরাধ করেছেন এ কে খন্দকার।’
আলোচনার সূত্রপাত করে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে এ কে খন্দকার যে তথ্য দিয়েছেন, তার বেশির ভাগ সঠিক হলেও বেশকিছু বিভ্রান্তিকর তথ্যও রয়েছে। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান জয় বাংলা বলেই বক্তৃতা শেষ করেছিলেন- এটা সবাই জানে। এই ইতিহাস যারা বিকৃত করতে চায়, তাদের ধিক্কার জানাই।’