শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

এক দিনেই ৯৭ হত্যা

pic-11_109297

গাজায় কোনো সাইরেন বাজে না। আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা কোনো দিনই ছিল না এই ভূখণ্ডে। ইসরায়েলি বিমান আসে, বোমা ফেলে চলে যায়। ট্যাংকগুলো লক্ষ্য নির্ধারণ করে, গোলা ছোড়ে। আর নিরস্ত্র সাধারণ গাজাবাসী মারা পড়ে অথবা স্পি­ন্টারবিদ্ধ শরীর নিয়ে তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে। গাজার আকাশসীমা আর জলপথ নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েল। স্থলপথে গাজা থেকে বের হওয়ার বা ঢোকার ক্রসিংগুলোও তাদের কবজায়। ফলে গাজাবাসীর যাওয়ার জায়গা নেই, বাঁচারও পথ নেই। আর তাদের প্রাণও এতটাই মূল্যহীন যে পশ্চিমা দেশগুলোও উদ্যোগী হয়ে অস্ত্রবিরতি কার্যকরে আগ্রহী নয়। আরব দেশগুলোর অক্ষমতা বরাবরের মতো দৃশ্যমান এবারও। ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ শুরুর ১৩ দিন পার হয়ে গেলেও অবরুদ্ধ-নিরস্ত্র গাজাবাসীকে রক্ষার কোনো বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেই। গতকাল রবিবার ইহুদি রাষ্ট্রটি অভিযান আরো জোরদার করলে নিহতের সংখ্যা ৪৩৫ ছাড়িয়ে যায়। শুধু গতকালই নিহত হয় ৯৭ ফিলিস্তিনি।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি পূর্ব গাজার শেজাইয়া জেলায়। গত শনিবার রাতভর শেজাইয়ায় হামলা চালায় ইসরায়েলের ট্যাংক। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, ওই এলাকায় অ্যাম্বুল্যান্সও ঢুকতে পারছিল না। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই স্ত্রী-সন্তানের হাত ধরে এক কাপড়ে এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে ফিলিস্তিনিরা। তখনো হামলা চলছিল। রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল লাশ। লাশ ডিঙিয়ে কেউ খালি পায়ে, কেউ বা শুধু পায়জামা পরেই ছুটতে শুরু করে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শেজাইয়া থেকে ৬০টি লাশ উদ্ধার করা হয়। হতাহতদের উদ্ধারের জন্য গতকাল দুপুরে আন্তর্জাতিক রেডক্রসের উদ্যোগে দুই ঘণ্টা অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয় ইসরায়েল এবং গাজা নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠন হামাস। তবে এক ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই এই অস্ত্রবিরতি ভেঙে পড়ে। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোষারোপের খেলা চলে দুই পক্ষের মধ্যে।
এক দিনেই ৯৭ হত্যা
শেজাইয়ায় ইসরায়েল হামলা শুরু করে গত শনিবার স্থানীয় সময় রাত ৯টায়। সময় পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়তে থাকে হামলার তীব্রতা। এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পানির লাইন উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল আগেই। এই হামলায় নিহতদের মধ্যে হামাস নেতা খলিল আল হায়া, ওসামা ও তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের দুই সন্তানও রয়েছেন। শেজাইয়ার এক অধিবাসী হাসপাতালে আসার পর কাতারভিত্তিক টিভি চ্যানেল আল-জাজিরাকে বলেন, ‘শেজাইয়ায় গণতহ্যা চালিয়েছে ইসরায়েল। নিরীহ বেসামরিক মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করছে তারা। শেজাইয়ার রাস্তা ভরে গেছে লাশে।’ ২৯ বছর বয়সী ইবতেসাম বাতনিজি সন্তানদের হাত ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ট্যাক্সির খোঁজে। বললেন, ‘সারা রাত আমরা ঘুমাইনি। চার পাশে বোমা ফেলেছে ওরা। আমি জানি না এখন কোথায় যাব। বাচ্চারা ভয় পাচ্ছে। আমরা আরো আগেই বের হতে চেয়েছিলাম, সাহস পাইনি। এ যেন ভূতের নগরী। সর্বত্র লাশের গন্ধ আর গোলাগুলির শব্দ।’
গাজার নাজ্জাজ জেলা (রাতভর হামলার শিকার শেজাইয়ার পার্শ্ববর্তী এলাকা) থেকে টেলিফোনে ২৩ বছর বয়সী মারাহ আল ওয়াদিয়া বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিন এটি। রাত থেকে একটি কক্ষের মধ্যে আমরা সবাই বসে আছি। অপেক্ষা করছি কখন হামলা থামবে, আমরা বের হতে পারব। গত রাতে আমাদের প্রতিবেশীর বাড়িতে বোমা পড়েছে। আমরা ওদের চিৎকার শুনেছি। কিন্তু বের হয়ে ওদের কাছে যেতে পারিনি। এখনো জানি না ওরা কেমন আছে। আদৌ বেঁচে আছে কি না।’
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই অভিযান শুরু করার দুই দিন আগে থেকে ওই এলাকায় বিমান থেকে লিফলেট ছড়িয়েছিল তারা। লিফলেটে এলাকাবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। লিফলেট ছড়ানোর কর্মসূচিকে ইসরায়েলিরা ‘নক অন দ্য রুফ’ বলে অভিহিত করে। তবে গাজার আজকের বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো এলাকাই বেসামরিক নাগরিকদের জন্য নিরাপদ নয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, এ পর্যন্ত গাজায় নিহতদের ৮০ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক। যার এক-পঞ্চমাংশই শিশু। অন্যদিকে ইসরায়েলের ১৭ সেনাসহ ২০ জন নিহত হয়েছে। জানা গেছে, গতকাল গাজার গোলানি সেতুর ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ইসরায়েলের একটি সেনাবাহী গাড়ি হামাসের রকেট হামলার শিকার হয়। এতে ইসরায়েলের ১৩ সেনা নিহত হয় বলে জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী।
স্থল অভিযান জোরদার করেছে ইসরায়েল : ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গতকাল জানিয়েছে, গাজায় স্থল অভিযান আরো জোরদার করেছে তারা। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, আজ বিকেল থেকে অপারেশন প্রটেকটিভ এজ (গাজায় চলমান অভিযানের নাম) আরো বিস্তৃত করা হচ্ছে। গাজা ভূখণ্ডে সন্ত্রাসী নিধনের এই অভিযানে অতিরিক্ত সেনা যুক্ত করা হয়েছে। এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করা হবে যেখানে ইসরায়েলের নাগরিকরা নিরাপদ থাকবে। গাজা থেকে ইসরায়েলে হামাসের রকেট ছোড়া বন্ধে গত ৮ জুন থেকে বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয় তাদের স্থল অভিযান। মূলত গাজার সুড়ঙ্গপথগুলো ধ্বংসের জন্য এ অভিযান শুরু করে তারা। ইসরায়েলের অভিযোগ, এই সুড়ঙ্গপথেই মিসর থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ সংগ্রহ করে হামাস।
ইসরায়েলের দাবি, স্থল অভিযান শুরুর পর হামাস ১৯০টি রকেট ছুড়েছে। যার মধ্যে ৬৩টি ইসরায়েল তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আয়রন ডোমের সাহায্যে প্রতিহত করেছে। আর স্থল অভিযানে নিহত হয়েছে ৭০ হামাস সদস্য।
অস্ত্রবিরতির প্রচেষ্টা চলছে : হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা খালেদ মেশাল বর্তমানে কাতারে অবস্থান করছেন। মূলত তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস কাতার সফর করছেন। গতকালই তাঁদের বৈঠকে বসার কথা ছিল। বৈঠকের লক্ষ্য হামাসকে অস্ত্রবিরতিতে রাজি করানো। গাজায় ইসরায়েলের স্থল, জল, আকাশ থেকে তীব্র হামলা এবং ব্যাপক প্রাণহানি সত্ত্বেও অস্ত্রবিরতিতে রাজি নয় হামাস। বরং গাজায় আট বছর ধরে চলমান ইসরায়েলি অবরোধ প্রত্যাহার, হামলা বন্ধ ও বন্দি ফিলিস্তিনিদের মুক্তির মতো যে শর্তগুলো তারা শুরুতে দিয়েছিল, তাতেই অটল রয়েছে। প্রেসিডেন্ট আব্বাস তুরস্কও সফর করবেন। হামাসের সঙ্গে এ দুটি দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। হামাস অস্ত্রবিরতির আলোচনায় এ দুটি দেশকেও অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী।
অস্ত্রবিরতিকে ত্বরান্বিত করতে গতকাল কাতারের রাজধানী দোহা সফর করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। এ দফায় তিনি কুয়েত, মিসর, ইসরায়েল, ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ও জর্দান সফর করবেন। দোহায় গতকালই তাঁর প্রেসিডেন্ট আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল। এ ছাড়া কায়রোতে গিয়ে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ আল-সিসির সঙ্গেও দেখা করবেন তিনি। এখন পর্যন্ত অস্ত্রবিরতির ব্যাপারে সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে মিসর। তবে অভিযোগ রয়েছে, তারা বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে যেভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে সেভাবে হামাসের সঙ্গে কথা বলছে না। হামাসের দাবি, আগেরবারের চুক্তি প্রসঙ্গে তারা জানতে পারে গণমাধ্যম থেকে। চুক্তির শর্ত বা সময় কোনো কিছুই তাদের জানানো হয়নি। ফলে সে প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। জানা গেছে, মিসরের পূর্ববর্তী ব্রাদারহুড সরকারের সঙ্গে হামাসের সুসম্পর্ক ছিল। তবে প্রেসিডেন্ট সিসি গোড়া থেকেই হামাসের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী ছিলেন না। ফলে মিসরের দৌড়ঝাঁপ এ দফায় আর কাজে আসছে না।
তবে এবার কায়রো হামাসকেও আলোচনায় ডেকেছে বলে এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে; যদিও এ ব্যাপারে মিসরের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
বিপর্যস্ত মানবতা : জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজায় তাদের ৪৯টি স্কুলে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, এ সংখ্যা তাঁদের পূর্বানুমানকে ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে তাঁদের রসদও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে বলে জানান তিনি।
সংকটের শুরু যেখানে : হামাস-ইসরায়েলের এবারের সংকটের সূত্রপাত মাসখানেক আগে। ১২ জুন ইসরায়েলের তিন কিশোরকে অপহরণ করা হয়। পরে তাদের লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনার জন্য হামাসকে দায়ী করে ইসরায়েল। তবে হামাস গোড়া থেকেই এ অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। এর প্রতিশোধ নিতে ফিলিস্তিনের এক কিশোরকে পুড়িয়ে হত্যা করে কিছু কট্টরপন্থী ইহুদি। এই নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে ইসরায়েলে রকেট হামলা বাড়িয়ে দেয় হামাস। সর্বশেষ গত ৮ জুলাই এ রকেট হামলার অজুহাতেই গাজায় বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। সূত্র : আল-জাজিরা, বিবিসি, এএফপি, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য টেলিগ্রাফ, রয়টার্স।