বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

আজ শোকের গৌরবের অমর একুশে

pic-11_190376
আজ অমর একুশে। বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের, এমনকি মানব ইতিহাসের এক অনন্য দিন। মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৯৫২ সালের এই দিনে মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল বাঙালি। দিনটি তাই বিশ্বজুড়েও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত।
৬৩ বছর আগের এই দিনে বাঙালির মায়ের ভাষা প্রাণের ভাষা বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার দাবিতে ঢাকার রাজপথ হয়ে উঠেছিল উত্তাল। উর্দুভাষী পাকিস্তানি শাসকদের হুমকি-ধমকি, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে নেমে এসেছিল বাংলার ছাত্র-শিক্ষক, নারী-শিশুসহ নানা বয়সী অসংখ্য মানুষ। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তারা বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। পুলিশ গুলি চালিয়েছিল ওই মিছিলে। অসীম সাহসী বাঙালি তরুণরা বুক পেতে দিয়েছিল সেই বুলেটের সামনে। গুলিতে লুটিয়ে পড়েন রফিক, বরকত, সালাম, জব্বার, শফিউরসহ অনেকে। রাজপথে তাজা রক্ত আর পলাশ-শিমুলে রক্তিম হয়ে ওঠে বাংলার দিগন্ত।বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া এবং বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদেই জন্ম একুশের। অমর একুশের সেই শহীদদের স্মরণে তাই প্রতিবছর দেশের সব কণ্ঠে বেজে ওঠে- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি…।’ ঢাকাসহ সারা দেশের শহীদ মিনারগুলো ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় মধ্যরাত থেকেই। ভাষাশহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে ভোরের শিশির মাড়িয়ে নগ্ন পায়ে শহীদ মিনার অভিমুখে এগিয়ে যায় সব বয়সের সব স্তরের অগণিত মানুষ।অমর একুশে উপলক্ষে এবারও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে সাজানো হয়েছে রক্তিম আল্পনায়। শহীদ মিনারের পূর্বপাশে পলাশ গাছে গজিয়েছে হাজারো রক্তিম ফুল। পুরো বেদিতেই শহীদদের রক্তের ন্যায় গাঢ় লাল রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। সামনের রাস্তা সাজানো হয়েছে লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি ও সবুজ রং দিয়ে। দোয়েল চত্বর থেকে শুরু করে জগন্নাথ হলের পাশের রাস্তা এবং শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত সাজানো হয়েছে তুলির আঁচড়ে। বাদ যায়নি সেখানকার দেয়ালগুলোও। ভাষা আন্দোলনের স্মারক বহনকারী বিভিন্ন উদ্ধৃতি লেখা হয়েছে দেয়ালে দেয়ালে। বরাবরের মতোই কাজটি করেতে ব্যস্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আগে সাদা-কালো রঙে সাজানো হতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার পরে এ দিবসটি শোক দিবস থেকে উৎসবে পরিণত হয়েছে। সে জন্যই সাদা রঙের পাশাপাশি লাল-নীল-হলুদ-বেগুনি রঙের আল্পনা করা হচ্ছে, মাতৃভাষা দিবসে যা অন্য রকম সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। এ বছর চারুকলার ৩০০ শিক্ষার্থী এ কাজটি করেছে।’
অমর একুশে নির্বিঘ্নে পালন করতে নেওয়া হয়েছে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রতিটি প্রবেশপথ থেকে শুরু করে পুরো শহীদ মিনার এলাকায় বসানো হয়েছে ১১২টি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা। নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, বিরাজমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা হুমকি পর্যালোচনা করে সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে সবার শ্রদ্ধা নিবেদন নিশ্চিত করতে ট্রাফিক ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এম আমজাদ আলী বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সুবিধাজনক না হওয়ায় বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবারের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত থাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’আজ সরকারি ছুটির দিন। দিবসটি স্মরণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বিশেষ কর্মসূচি পালন করছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে, সেই সঙ্গে উড়ছে শোকের প্রতীক কালো পতাকা। প্রভাতফেরি, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ছাড়াও কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজিমপুরে শহীদদের কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গণমাধ্যমগুলোতে রয়েছে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশসহ নানা আয়োজন। মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন। বাণী দিয়েছেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা।আওয়ামী লীগের আজকের কর্মসূচি : মহান ভাষাশহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনে বিভিন্ন কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। আজ শনিবার ভোর সাড়ে ৬টায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারা দেশের সব শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত করে রাখাসহ কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ৭টায় কালো ব্যাজ ধারণ, আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করবে দলটি। এ ছাড়া আগামীকাল রবিবার বিকেল ৩টায় রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন।