শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

সন্দেহবাতিক : শাহীন চৌধুরী ডলি

রিয়াদ অফিসে চলে যাওয়ার পর সুধার খুব নিঃসঙ্গ লাগছে। একা একা কিছু করার নেই। ছুটা কাজের মেয়েটা সকাল সকাল এসে কাজগুলো সেরে দিয়ে চলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুধার পদচারণা কম। বরং সে গল্পের বই পড়তে এবং বাগান করতেই বেশি ভালোবাসে।
রিয়াদ অফিস থেকে বারবার সুধাকে কল দেয়।
হ্যালো সুইটহার্ট কি করছো?
এই তুমি এতবার কল করো কেন? অফিসে কোন কাজটাজ নেই নাকি?
কাজ তো আছেই। কিন্তু কি করে মনকে বুঝাই বলো। সারাক্ষণ নতুন বউয়ের মুখটাই যেন দেখতে পাই। ইচ্ছে করছে অফিসের কাজ ফেলে বাসায় চলে আসি। তোমার সাথে আড্ডা দিই।
আচ্ছা আচ্ছা বুঝেছি তুমি বউ পাগলা, বলেই মুচকি হাসে।
তা এখন মনোযোগ দিয়ে কাজ করো। আমি একটা বই পড়ছি। দারুণ ক্লাইমেক্সের জায়গায় আছি। অফিস শেষে বাসায় আসো, তখন কথা হবে।

রিয়াদ মনে মনে ভাবে। সুধা তো খুব সুন্দর! আচ্ছা ও কি আমার মতন দেখতে খুব সাধারণ একজনকে স্বামী হিসেবে পেয়ে খুশি! নাকি ওকে ভাই – ভাবী জোর করে বিয়ে দিয়েছেন? ভার্সিটিতে পড়া সুন্দরী মেয়ে সুধা কি কখনো কারো প্রেমে পড়েনি! আবার নিজের মনেই বলে, ধ্যাৎ এসব কি ভাবছি!

এভাবেই দিন যেতে থাকে। ছুটির দিনে তারা বাইরে বেড়াতে যায়, সুধাদের বাসায় যায়। মাঝে মাঝে বাইরে খেতে যায়। একদিন অফিস ছুটির পর রিয়াদ অনেকগুলো গোলাপ কিনে বাসায় রওয়ানা হয়। বাসার গেইটের কাছে আসতেই দেখে গেইটের সামনে একটা সুন্দর ইয়াং ছেলে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। রিয়াদ উপরে তাকাতেই দেখে সুধা ছেলেটার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে।

সুধা উপর থেকে বলে, এই অপু দেখো তোমার পাশে যিনি এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি আমার হাজব্যান্ড। অপু রিয়াদের দিকে হ্যান্ডশেক করতে হাত বাড়িয়ে দেয়। রিয়াদের মনে সন্দেহ উঁকি দেয়। সে অপুর সাথে হ্যান্ডশেক তো করেই না উল্টো অপুর মুখের উপর সুধার জন্য আনা গোলাপগুচ্ছ ছুঁড়ে ফেলে রাগে গজগজ করতে করতে বাসার গেইটে ঢুকে যায়। ওদিকে অপু তার প্রিয় বন্ধুর হাজব্যান্ডের এমন অসৌজন্যমূলক আচরণে হতভম্ব হয়ে একটিও শব্দ উচ্চারণ না করে নিজের গন্তব্যে আগাতে থাকে।

রিয়াদ সুধার কাছে জানতে চায়, ছেলেকি কে ছিলো। সুধা
আজকের অপমান হজম করে বলে, আমাদের বাড়ির পাশের বাড়িটা অপুদের। অপু আর আমি একসাথে বেড়ে ওঠেছি।আমরা খুব ভালো বন্ধু। আমার বিয়ের সময় ও দেশে ছিলো না ।খালাম্মার চিকিৎসার জন্য তখন প্রায় মাস দুয়েক বিদেশে থাকতে হয়েছে তাই অপুকে আগে দেখোনি। ওর সাথে এমন দুর্ব্যবহার করা তোমার উচিৎ হয় নি। আজ অপু রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো দেখে আমি ডাক দিয়ে কথা বলছিলাম। তুমি বাসায় থাকলে ওকে বাসাতেই আসতে বলতাম। তুমি ছিলে না তাই বাসায় ঢুকতে বলিনি।

পরদিন রিয়াদ অফিসে চলে গেলে সুধা ভাইয়ের বাসায় গিয়ে ভাবির সাথে আগেরদিনের ঘটনা বলে কাঁদতে থাকে। ভাবী সুধাকে বুঝালেন এই নিয়ে যেন রিয়াদের সাথে বাড়াবাড়ি না করে। রিয়াদ অফিসে পৌঁছে সুধাকে মোবাইলে কল দেয়। সুধা কল রিসিভ না করায় রিয়াদ ভাবীর নাম্বারে কল দিয়ে জানতে চায় সুধা ওখানে গিয়েছে কিনা। সুধা ভাবীকে ইশারা করে বলে, রিয়াদকে যেন না বলে ও ভাবীর কাছে আছে। ভাবীও দুষ্টুমি করে বলে, না তো রিয়াদ, সুধা আমাদের এখানে আসেনি। রিয়াদের মনে উল্টাপাল্টা ভাবনার উদয় হয়। তার কাজে মন বসে না। ভাবতে থাকে যখন সে বাসায় থাকে না সেই সুযোগে সুধা অপুর সাথে দেখা করে।

রিয়াদ পাশের ফ্ল্যাটের ভাইকে কল দিয়ে বলে, অনোয়ার ভাই
ভাবীকে কি একটু বলবেন সুধা বাসায় আছে কিনা দেখতে। আমি কল দিচ্ছি কিন্তু রিং হলেও রিসিভ করছে না। আনোয়ার সাহেব মজা করে বলেন, ভাই সুন্দরী বউ বাসায় রেখে অফিস করতে যাওয়া আসলেই যন্ত্রণার। কে জানে কার সাথে বেড়াতে বের হয়েছে হা হা হা হা। রিয়াদ রাগে মোবাইলের অফ বাটনে চাপ দেয়। তার অস্থির লাগতে থাকে। এসিটা বাড়িয়ে দেয়, পানি পান করে নিজের কক্ষে পায়চারি করতে থাকে।

সুধা বিকেলে ভাবীকে নিয়ে একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যায়। ওখানে সুধার ইউরিন টেষ্টের রিপোর্ট তুলে। রিপোর্টে তার প্রেগন্যান্সি পজিটিভ আসে। উৎফুল্ল সুধা মনে মনে ভাবে আজকে রিয়াদকে দারুণ সারপ্রাইজ দিবে। ভাবী সুধাকে একটা রিকশা ভাড়া করে দেয় এবং সাবধানে বাসায় যেতে বলেন ।

রিয়াদও অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বের হয়ে বাসায় রওয়ানা হয়। বাসার কাছাকাছি পৌঁছাতে দেখে একটা রিকশায় সুধা আসছে। সে দূর থেকে খেয়াল করতে থাকে। সুধা বাসার গেইটে প্রবেশ করার মিনিট দশেক পর রিয়াদ বাসার ডোরবেল বাজায়।

কি ব্যাপার সুধা! অফিস থেকে কতবার তোমাকে কল দিলাম। রিসিভ করলে না। ভাবীকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন সেখানেও যাওনি। তুমি কি বাইরে অন্য কোথাও গিয়েছিলে? কোথায় গিয়েছিলে? মোবাইলে কল রিসিভ করার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করলে না!
সুধা জবাব দেয়, আমি বাসাতেই ছিলাম – কোথাও যাই নি তো।

রিয়াদের সন্দেহ প্রবলতর হতে থাকে। সুধা কেন মিথ্যা বলছে। কিছুক্ষণ আগে সে নিজেই সুধাকে একটা রিকশায় চড়ে এসে বাসায় প্রবেশ করতে দেখেছে। এমন মিথ্যা কিভাবে হজম করবে রিয়াদ! সে কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকে। সুধা চা দিতে চাইলে, মানা করে দেয়।

দুইজনে একসাথেই ডিনার খায়। রিয়াদ টিভিতে খবর দেখতে থাকলে সুধা সবকিছু গুছিয়ে পাশে এসে বসে রিয়াদের হাতটা নিজের দিকে টানতেই রিয়াদ দূরে সরে বসে। সুধা বলে, তোমার জন্য একটা সুখবর আছে। তোমাকে সারপ্রাইজ দেবো বলে আগে বলিনি। আজকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়েছিলাম প্রেগন্যান্সি টেস্টের রিপোর্ট তুলতে। রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। তুমি বাবা হতে চলেছ।

রিয়াদ ক্রোধে জোরে চিৎকার করে বলে, অসম্ভব! এই সন্তান আমার না। আমি অফিসে চলে গেলে তুমি যখন যেখানে ইচ্ছে হয় চলে যাও। কে তোমার গোপন প্রেমিক আমি জানি না। এটা তার সন্তান হতে পারে। আমি এই সন্তানের দায় নেবো না। তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে মুক্ত করে দিবো। তখন তুমি মুক্ত পাখির মতন যখন যেখানে ইচ্ছে যেও। আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসতাম। আমার ভালোবাসার মর্যাদা তুমি রাখোনি। এখন কার না কার সন্তান গর্ভে ধারণ করে তার বৈধতা দিতে আমাকে ব্যবহার করার দুঃসাহস কিভাবে করতে পারো!
সুধা অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেও বিফল হয়। পরদিন ভোরে রিয়াদ ঘুম থেকে জেগে সুধাকে দেখতে না পেয়ে ভাবীকে কল দেয়। না সুধা সেখানেও যায় নি। ভাবী রিয়াদকে জানায় সুধা তোমার সন্তান কনসিভ করেছে। এটা তোমাদের প্রথম সন্তান। এইসময় সুধাকে মানসিকভাবে অস্থির করে তোলা তোমার একেবারেই ঠিক হয়নি। প্রেগন্যান্সির পজিটিভ রিপোর্ট হাতে পেয়ে কত হাসিখুশি ছিলো মেয়েটা। তোমাকে সারপ্রাইজ দেবে বলে আমাকে সাথে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতো। আমি মা হয়ে, বন্ধু হয়ে সুধার পাশে পাশে থেকেছি। বিয়ের পর যখন এই বাড়িতে আসি সুধা তখন মাত্র ক্লাস এইটে পড়ে। ওর ব্যক্তিত্ব, রুচি ছিলো অনেক উন্নত। কেবল সন্দেহবাতিকে তুমি একটা সুন্দর সম্পর্ক ধ্বংস করে দিতে পারো না রিয়াদ।

সেই দিনের পর সুধাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় নি। সন্দেহবাতিকগ্রস্ত রিয়াদ পাগলের মতন সর্বত্র তার সুধাকে খুঁজতে থাকে। আজো রিয়াদের খোঁজা অব্যাহত আছে। তাকে আর চেনা যায় না। উস্কুখুস্কু দাঁড়ি গোঁফের, ময়লা পোশাকের অন্তরালে রিয়াদের চোখদুটো চকচক করে। রিয়াদ এখন বধ্যপাগল। তাকে রেলস্টেশন, বাসষ্ট্যান্ড, লঞ্চঘাটে একটি ছবি নিয়ে ঘুরতে দেখা যায়। যাকে সামনে পায় তাকেই ময়লা হয়ে যাওয়া ছবিটি বাড়িয়ে দিয়ে জানতে চায়। আমার সুধাকে কোথাও দেখেছেন?

শাহীন চৌধুরী ডলি, কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। ব্রাক্ষনবাড়িয়া থেকে।