বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১, ৩০ বৈশাখ ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

রাজধানীতে গুলি করে তরুণ প্রকৌশলীকে হত্যা

2_86379

 

রাজধানীর কলাবাগানে সোমবার গভীর রাতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হয়েছেন সাদবিন হোসেন সানি (২৫) নাসের তরুণ এক প্রকৌশলী। সোমবার রাত ১টার দিকে ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে। মুমূর্ষু অবস্থায় ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তির পর ভোরে মৃত্যু হয় সানির। নিহত সানি গ্রিন রোডের বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগের ঢাকা জেলা প্রচার সম্পাদক কাজী শওকত হোসেন শাহিনের একমাত্র ছেলে।
নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর সাভারে নর্দান টেক্সটাইলে চাকরি করছিলেন সাদবিন হোসেন সানি। সোমবার রাতে ধানমণ্ডিতে তার খালু ডা. শহীদুল আলম খানের বাসা থেকে বের হয়ে নিজ বাসায় ফেরার পথে সন্ত্রাসীরা তার ওপর হামলা চালায়। পূর্বশত্র“তার জের ধরে এ খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা। এ ঘটনায় কলাবাগান থানায় মামলা করেছেন নিহতের খালু ডা. শহীদুল আলম খান।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ল্যাবএইডের পেছনে চা দোকানি মুনসুর আলী যুগান্তরকে জানিয়েছেন, রাত ১টার দিকে ওই প্রকৌশলী সানি তার দোকানের সামনে এসে এক কাপ চা দিতে বলেন। এর মিনিটখানেক পরে একটি সাদা রঙের প্রাইভেট কার তার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রাইভেট কার থেকে অল্প বয়সী ২/৩ যুবক দ্রুত নেমে এসেই খুব কাছ থেকে সানিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে আবারও প্রাইভেট কারে চড়ে পালিয়ে যায়। পরে লোকজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে পার্শ্ববর্তী ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে যায়।
যে কারণে হত্যা : নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, সাদবিন হোসেন সানির খালু ডা. শহীদুল আলম খান একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক। তিনি ধানমণ্ডির ৭/এ রোডে ৬২/বি নম্বর বাড়িতে থাকেন। তার মেয়েও একজন চিকিৎসক এবং ল্যাবএইড হাসপাতালে কর্মরত। কয়েক বছর আগে তার বিয়ে হয় এবং একটি সন্তান রয়েছে। ডা. জাহাঙ্গীর নাজিম নামে এক মাদকাসক্ত চিকিৎসক তাকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করে আসছে। ২০১২ সাল থেকে বিয়ের দাবিতে কয়েক দফা হুমকিও দেয় ওই মাদকাসক্ত চিকিৎসক। এ নিয়ে কলাবাগান থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। ৩টি মামলাও রয়েছে ডা. জাহাঙ্গীর নাজিমের বিরুদ্ধে। এসব মামলায় ডা. জাহাঙ্গীর নাজিম বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, বিবাহিত এবং সন্তান আছে জানার পরও মাদকাসক্ত ওই চিকিৎসক বিয়ের জন্য চাপাচাপি করায় তারা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অশান্তিতে রয়েছেন। তাকে কিছুতেই বোঝানো সম্ভব হচ্ছিল না। এ নিয়ে ডা. জাহাঙ্গীর নাজিম প্রায়ই তাদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিত। ঘটনার দিন সোমবার রাত ১২টার দিকে ধানমণ্ডির ওই বাসার সামনে বখাটে ছেলেদের নিয়ে এসে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল ও চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে ডা. জাহাঙ্গীর নাজিম। এ ঘটনা টেলিফোনে স্বজনদের জানান ডা. শহীদুল আলম খান। খবর পেয়ে ওই রাতে সাদবিন হোসেন সানি ধানমণ্ডিতে খালুর বাসায় যান। রাত পৌনে ১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে ল্যাবএইড হাসপাতালের পেছনে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়ানো মাত্রই সন্ত্রাসীরা খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে।
পরিচয় : নিহত সাদবিন হোসেন সানি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক কাজী শওকত হোসেন শাহীনের ছেলে। এক ভাই এক বোনের মধ্যে সানি ছিলেন বড়। তাদের বাসা ৯৮ গ্রিন রোডে। গ্রামের বাড়ি নবাবগঞ্জের পাঞ্জিপ্রহরীতে। তার মায়ের নাম নাসরিন আক্তার চৌধুরী। নিহত সাদবিন হোসেন সানি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা বলে শোনা গেলেও এ তথ্যের সত্যতা কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি।
আমেরিকায় যাওয়া হল না : উচ্চ শিক্ষার জন্য চলতি সপ্তাহে আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিল সানির। তার সঙ্গে বাবা-মায়েরও আমেরিকা বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। ভিসাসহ ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র গুছিয়ে ফেলেছিলেন সানি। চাকরি থেকেও ইস্তফা দিয়েছিলেন। নিহতের স্বজনরা জানান, আমেরিকায়ই স্থায়ীভাবে বসবাসের ইচ্ছা ছিল সানির। ধীরে ধীরে তার বাবা-মাকেও সেখানে স্থায়ী করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার আগেই সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে সানির।
বাড়িতে শোকের মাতম : সাদবিন হোসেন সানির লাশ যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে তখন গ্রিন রোডে তার বাসায় চলছিল শোকের মাতম। একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা নাসরিন আক্তার। বাবা কাজী শওকত হোসেন শাহীনের চোখের পানি যেন বাঁধ মানছিল না। ওই বাড়িতে যারা এসেছিলেন তাদের কেউ সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা যেন খুঁজে পাননি।
মামলা : এ ঘটনায় মঙ্গলবার নিহতের খালু ডা. শহীদুল আলম খান বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ডা. জাহাঙ্গীর নাজিমকে আসামি করা হয়েছে।
কলাবাগান থানার ওসি মোঃ ইকবাল জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে পূর্বশত্র“তার জের ধরেই খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘাতকদের গ্রেফতারে পুলিশের বেশ কয়েকটি টিম মাঠে কাজ করছে। খুব অল্প সময়ে ঘাতকদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করেন।
বাড়িতে রাজনৈতিক নেতাদের ঢল : সাদবিন হোসেন সানি নিহতের খবরে মঙ্গলবার তাদের গ্রিন রোডের বাসায় ভিড় করেন সংসদ সদস্য ছাড়াও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। সকালেই ৯৮ গ্রিন রোডের বাসায় যান জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম। তিনি নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বেশ কিছু সময় কাটান ও তাদের সান্ত্বনা দেন।
দাফন : মঙ্গলবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে বিকালে নবাবগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় সাদবিন হোসেন সানিকে।