শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

মৃত্যু উপত্যকাই পাকিস্তান

pic-17_164003
নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) পেশোয়ারে সামরিক বাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলের শিশুদের ওপর নৃশংসতম হামলা চালিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ শেষে স্কুলটিতে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক উৎসব চলছিল। এ কারণে তারা জড়ো হয়েছিল স্কুল মিলনায়তনে। বাইরে গুলি ও বোমার আওয়াজ শুনে শিক্ষকরা ছাত্রদের দ্রুত মিলনায়তন ছাড়তে নির্দেশ দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি, মিলনায়তনের ভেতরে বোমা হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। জঙ্গিদের গুলিতে স্কুলের বারান্দায়ও শিশুদের মৃতদেহ ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে আসা প্রত্যক্ষদর্শী স্কুলের এক বাসচালক।নিরাপত্তা বাহিনী সূত্র জানাচ্ছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পাকিস্তানের ইতিহাসে শিশুদের ওপর বর্বরোচিত এ হামলা চালায় মাত্র ছয় টিটিপি জঙ্গি। অবশ্য হামলার পর পরই নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীরা এলাকাটি ঘিরে ফেলেন। কিন্তু যেহেতু ভেতরে শত শত শিক্ষার্থী তখনো জিম্মি, তাই নিরাপত্তা বাহিনী রয়ে-সয়ে উদ্ধার অভিযান চালায়। অবশেষে ঘণ্টা আটেকের চেষ্টায় ছয় জঙ্গি নিহত হলে একটি কালো দিনের অবসান ঘটে। কিন্তু রেখে যায়  অগণিত মৃতদেহ, যাদের বেশির ভাগই শিশু। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে আরো অসংখ্য শিশু। সারা দিন স্কুলের গেটে মায়েদের আর্তনাদে বাতাস ভারী ছিল। এখন সে কান্নার রোল ছড়িয়েছে গোটা পাকিস্তানে।
টিটিপির পক্ষ থেকে এ হামলার দায় নিয়ে জানানো হয়, অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সের শিশুদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে যে নির্বিচারে বোমা হামলা হয়েছে, সেটা হাসপাতালে শিশুদের মরদেহ দেখে টের পাওয়া যাচ্ছে।পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এ ঘটনায় শোক প্রকাশের পাশাপাশি বলেছেন, জঙ্গিবিরোধী অভিযানটি চলবে। এক বছর ধরে টিটিপি অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলে সেনা অভিযানের প্রতিশোধ নিতেই এ হামলা চালানো হয়েছে। সুতরাং এখন জঙ্গিদের সমূলে উৎপাটনের আর কোনো বিকল্প রইল না।আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তরও জানিয়েছে, পুরো পাকিস্তানেই জঙ্গিবিরোধী সামরিক অভিযানটি চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো বিকল্প নেই। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ তাঁর কোয়েটা সফর সংক্ষিপ্ত করে ঘটনাস্থলে আসেন। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানটি আরো ব্যাপকভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে পরিচালনার অঙ্গীকার করেন তিনি।
পেশোয়ারের স্কুলে শিশু হত্যার ঘটনায় পুরো পাকিস্তানেই শোক বিরাজ করছে। নাগরিক সমাজ এই বর্বরোচিত ঘটনায় আতঙ্কিত। মূল ধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারকে দায়ী করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে।
গত এক বছরে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে পরিচালিত সেনা অভিযানে তালেবানের বেশ কিছু অস্ত্রঘাঁটি ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প উড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে তালেবানরা অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সেনা স্থাপনার ওপর হামলা চালাতে শুরু করে। সেনাবাহিনীর বেশ কিছু কর্মকর্তা ও জওয়ান টিটিপির হামলায় নিহত হন।বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা, বিভিন্ন কারাগারে আটক তালেবান সদস্যদের মুক্ত করার জন্য জেলে আক্রমণের মতো ঘটনা ঘটায় টিটিপি ও বিভিন্ন নামে তাদের উইংগুলো। কিছুদিন আগে ওয়াগাহ সীমান্তের কাছে একটি রেস্টুরেন্টে বোমা হামলা করে বেশ কিছু প্রাণহানি তারা ঘটায়। এক অর্থে পাকিস্তান যে টিটিপির বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধে রয়েছে, তা পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে হামলায় ও শিশুদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে স্পষ্ট হয়ে গেল। এ স্কুলে সেনা সদস্যদের সন্তানরা পড়াশোনা করে। বেসামরিক ব্যক্তিদের সন্তানরাও পড়ে। সন্তানদের হত্যা করে সেনাবাহিনীকে নিজেদের শক্তি জানান দিয়েছে টিটিপি জঙ্গিরা। এর আগে বেসামরিক স্কুল, বিশেষত মেয়েদের স্কুল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটিয়েছে তালেবান। সামগ্রিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার এ প্রবণতা জঙ্গিদের মাঝে প্রথম থেকেই পরিলক্ষিত হয়েছে।হামলার পর পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই বর্বরোচিত হামলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নয়াদিল্লি এই মর্মান্তিক ঘটনায় ইসলামাবাদ ও পাকিস্তানের মানুষের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে জঙ্গিদের মূল ঘাঁটিগুলো সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়ায়, পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি পাকিস্তান-ভারত সীমান্তের অরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য এলাকাগুলো দিয়ে জঙ্গিরা ভারতেও ঢুকেছে। তাই চিরশত্রু দুটি দেশ এখন পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রয়োজনে তথ্যবিনিময় ও সহযোগিতায় বাধ্য হবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
পেশোওয়ার ট্র্যাজেডিতে থমকে গেছে পাকিস্তান। পিটিআই নেতা ইমরান খান তাঁর বিক্ষোভ কর্মসূচি বাতিল করেছেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টি, এমকিউএমসহ সব রাজনৈতিক দলই এখন তালেবানদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে কঠোর অভিযান ও জঙ্গিবাদ চিরতরে নির্মূলের দাবি জানিয়েছে।
পেশোয়ারের অগণিত শিশুর লাশ পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভ্রান্তি ও সিদ্ধান্তহীনতার ফল বলেও সমালোচনা করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। তাঁরা বলছেন, এ অভিযান আরো আগেই পরিচালিত হলে এ রকম মর্মন্তুদ ঘটনা হয়তো এড়ানো যেত। সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তানের অংশীদার ওয়াশিংটন এই ট্র্যাজেডিতে পাকিস্তানের পাশে থাকার ও পাকিস্তানে তৎপর জঙ্গিদের নির্মূলে আরো কার্যকর সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের এই অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডির পরিসমাপ্তি খুব সহজে হবে বলে মনে হয় না। জাতীয় বিপর্যয় পরিস্থিতি ঘোষণা করে ইসলামাবাদ চেষ্টা করছে আর যাতে এ রকম ঘটনা না ঘটে সে পদক্ষেপ নিতে।
আসছে দিনগুলোতেই নির্ধারিত হবে পাকিস্তান নামক এই ‘মৃত্যু উপত্যকা’র জনমানুষের নিরাপত্তায় সরকার শেষ পর্যন্ত কতটা উদ্যোগী হলো এবং তাতে নিরাপত্তার ভিত কতটা মজবুত হলো।