Saturday, November 25Welcome khabarica24 Online

ব্লু হোয়েল: মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে যা করবেন

অনলাইন ডেস্ক

ব্লু হোয়েল বা নীল তিমি। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এক মৃত্যুআতঙ্ক। ব্লু হোয়েলের মাধ্যমে এক ভয়াল মৃত্যুজাল পেতে সম্ভাবনার সাইবার দুনিয়ার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে জীবনবিচ্ছিন্ন একদল তরুণ। আদতে এটি কোনো গেম নয়, ডাউনলোড করা যায় না। কোনো সাইটে পাওয়া যায় না। বিশেষ কিছু সোশ্যাল নেটওয়ার্ক থেকে হতাশ ছেলে-মেয়েদের বেছে নিয়ে ওই চক্রটি তাদের সামনে আত্মহত্যার বাজি ছুড়ে দেয়।

গেমটি রাশিয়া থেকে ছড়িয়ে ইতিমধ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও অল্প বয়সীদের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। কিছুদিন ধরে বাংলাদেশেও মৃদুভাবে আলোচনায় ছিল গেমটি। চলতি সপ্তাহে রাজধানীর এক সুপরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক ছাত্রীর আত্মহত্যার পর ব্লু হোয়েল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

ব্লু হোয়েলের ভয়াবহ থাবা একের পর এক দেশে দৃশ্যমান হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করে দিচ্ছেন। তাদের মতে, প্রযুক্তির প্রবাহ বন্ধ করা যাবে না, বিটিআরসির মতো কর্তৃপক্ষ দিয়েও সব উৎস আটকানো যাবে না, যে চেষ্টা এখন ভারত করছে। তবে বিকল্প অ্যাপ তৈরি করা যেতে পারে; যেমন ব্লু হোয়েলের বিপরীতে ইতিমধ্যেই পিংক হোয়েল তৈরি করা হয়েছে; এখানেও ৫০টি ধাপ রয়েছে, যার সবই ইতিবাচক। তিনি লেখাপড়ায় ছোটদের ওপর অহেতুক চাপ না দেওয়ারও পরামর্শ দেন।

সাইবারজগতের অপরাধীরা নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না বলে এক ধরনের সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে এবং সমাজকে বড় রকমের হুমকিতে ফেলে দিতে পারে। এ জন্য রাষ্ট্রের প্রাযুক্তিক কাঠামো যেমন শক্তিশালী করতে হবে, সাধারণ মানুষকেও প্রযুক্তির সর্বশেষ বিষয়গুলোতে আপডেটেড থাকতে হবে।

শিশু মনস্তাত্ত্বিক ও শিশুতোষ গ্রন্থ রচয়িতা মায়া ভন শা বলেছেন, ব্লু হোয়েলের কথিত নির্মাতাদের মতো ব্যক্তিরা সব সময়ই থাকবে এবং মানসিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের টার্গেট করবে। এসব ব্যক্তিকে হটিয়ে দিয়ে কিংবা অল্প বয়সীদের ইন্টারনেটের বাইরে রেখে সমাধান হবে না। সমাধান প্রথম খুঁজতে হবে পরিবারে। গেমটি নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের জন্য মিয়া ভন শা ১৩টি নির্দেশনা দিয়েছেন, যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হচ্ছে।

১. বড়দের প্রধান কাজটি হবে সন্তানের সঙ্গে গভীরভাবে মেশা; অনলাইনে, অফলাইনে মিশুন; তাদের ভাষা বুঝুন। বেশি বেশি কথা বলুন। তাদের জীবন ও অনুভূতি বুঝুন, তাদের বন্ধুদের জানুন। তারা কোন সাইটে বেশি যায় বের করুন। কোনো ওয়েবসাইট জোর করে টেনে বের না করে বরং চেষ্টা করুন এমন নিরাপদ সাইটে সময় দিতে, যেখানে দুজনেরই ভালো লাগে।

২. সন্তানের মূল্যবোধগুলো কী, কিসে তারা প্রাণ পায়, উৎসাহ পায়, সেগুলোর প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। এর বাইরে তাদের অর্থপূর্ণ যেসব কাজ করা উচিত সেগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সময় শিশু প্রতিদিনই যাতে পায় তা নিশ্চিত করুন। সবাই কী চাইছে, সমাজ কী আশা করছে কেবল সেসবের পেছনে যদি দৌড়ান সন্তান শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে পড়বে।

৩. বাচ্চাদের বেশি চাপে রাখা বন্ধ করুন। ভবিষ্যতে কী করবে, ক্যারিয়ার কী হবে এখনই এসব নিয়ে অতিমাত্রায় ভাববেন না। শিশুর নিত্যদিনকার চাহিদাগুলো পূরণ করুন। মানুষ হিসেবে মানবিকভাবে মিশুন। তার মানসিক সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত অবসর সময়ও বের করতে হবে।

৪. সন্তানকে কখনোই ওয়ানসাইডেড বা একপেশে হতে বলবেন না। যদি সারাক্ষণ তাকে বলতেই থাকেন, দয়ালু হও, কঠোর হয়ো না; ভদ্র হও, রূঢ় আচরণ করো না, অন্যের উপকার করো, আলসেমি করো না – তার হতাশা আসবেই। আপনি নিজে যা নন, তা করতে বলবেন, শিশুর কাছে অবাস্তব হয়ে ধরা দেবে, নিজের প্রতি আত্মবিদ্বেষ তৈরি হবে।

৫. সন্তান আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যদি চলে গিয়েই থাকে এবং যদি অসহায় বোধ করেন – এমন বিশ্বস্ত বন্ধু, স্বজন ও থেরাপিস্ট, কোচ, গাইড খুঁজে বের করুন যে আপনার শিশুর সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে (ননজাজমেন্টাল), বন্ধুর মতো মিশতে পারবে।

৬. নিজের মনকে বিশ্বাস করুন। যদি মন বলে কোথাও বড় ভুল হয়ে গেছে, হয়তো তা ঠিক কথাই বলছে। তাই সন্তানের বিষয়ে ঝুঁকি নেবেন না। তার অস্বাভাবিক পোশাকও বড় কিছুর আভাস হতে পারে।

৭. আত্মহত্যার কারণ হতে পারে এমন গেম বা সাইট নিয়ে শিশুর সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন। হতাশার কথা, এই সমস্যা থেকে কারো কারো আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়ার বিষয়টি তাকে জানান। তাকে বুঝতে দিন, কখনো কখনো মানুষ বিপজ্জনক আচরণ করে এবং এ ব্যাপারে ছোট-বড় সবারই সাবধান থাকা উচিত। যদি আপনার বাচ্চা মরে যাওয়ার ইচ্ছের কথা ব্যক্ত করে ফেলে – একে গুরুত্বের সঙ্গে নিন। আত্মহত্যা যারা করে তাদের বেশির ভাগই বিষয়টি আগেভাগে একজনের সঙ্গে হলেও শেয়ার করে।

৮. শিশু-কিশোর খাদ্যের তালিকা দেখুন। খুব গুরুত্বপূর্ণ এটি। কিছু পুষ্টির অভাবেও বিষণ্নতা দেখা দেয়। সন্তানকে বিষাদগ্রস্ত দেখালে নিশ্চিত হোন তার খাবারে ওমেগা-৩, ভিটামিন বি৩, ভিটামিন ডি, মাগনেসিয়াম ও প্রোবায়োটিকস আছে কি না। চিনি ও মিহি শর্করা কমানো যেতে পারে।

৯. তাদের আচরণ লক্ষ করুন। ক্ষুধামান্দ্য, ঘুমের এলোমেলো সময়, চোখের নিচে কালো দাগ, নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা, সামাজিকভাবে একা হয়ে যাওয়া, বিষণ্নতা, খিটখিটে মেজাজ, রাগী ভাব, পছন্দের জিনিসগুলো অপছন্দ লাগা – এ জাতীয় সমস্যায় কথা বলুন।

১০. সন্তানকে বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ার উপযোগী করে গড়ে তুলুন। কৌশল বাতলে দিন। একটি বিষয় আপনার কাছে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু সন্তান হয়তো অনেক বড় করে দেখছে। যেমন বন্ধুদের টিজিংয়ের শিকার হওয়া, পরীক্ষার চাপ, ব্যক্তিগত সম্পর্কে সমস্যা, অর্থনৈতিক কারণে হীনমন্যতা, নিঃসঙ্গতা, নিজ পরিবারে সহিংস পরিবেশ, কারোর চলে যাওয়া, মৃত্যু, বিয়েবিচ্ছেদ, নির্যাতন, কারোর মদ্যপানে আসক্তি এসব বিষয় তাকে ভেতরে ভেতরে প্রবলভাবে আলোড়িত করতে পারে।

১১. সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহার কমিয়ে দিতেই হবে এমন নয় (মোবাইল ফোন হাতে না দিয়ে আজকাল পারবেনও না)। তবে শতভাগ নিশ্চিত হোন ইন্টারনেট সংযোগ সে কী কাজে ব্যবহার করছে। ছোটরাও জীবনের অসম্পূর্ণতার বিকল্প খুঁজছে ইন্টারনেটে। যেমন খেলাধুলার সময়, পরিবেশ বা মাঠে যাওয়া হয় না বলেই সে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বন্ধুদের সময় দিচ্ছে। মোবাইলে গেম যে খেলে তার কারণ হচ্ছে সেখানে তার যাতায়াতের সুযোগটি অবাধ।

১২. সন্তানকে উপলব্ধি করতে দিন যে তাকে আপনারা ভালো বাসেন, গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আমরা অনেকেই অনেক সময় ভেতরের আবেগটা চেপে রাখি। মুখে বলতেই হবে এমন নয়। আলিঙ্গন, চুমু, পিঠ চাপড়ে দিয়ে, হাত-পা ম্যাসাজ – কতভাবেই ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়। তাদের জগতটা এখন অফলাইনে যেমন, অনলাইনেও। সবভাবেই বুঝুন, ভেতর থেকে, বাইরে থেকে। সন্তানকে জানান, তাকে ভালোবাসেন। মাঝেমধ্যে অর্থবহ কিছু উপহার দিন; যেমন কয়েক লাইনের কবিতা বা ছড়া, কিংবা একটি ফুল – যা তীব্র আবেগ বোঝায়। তাদের চমকে দিন, কিছু বানিয়ে খাওয়ান। সম্পর্কে সৃজনশীল হোন।

১৩. সবশেষে শুনুন, শুনুন, শুনুন। মন দিয়ে শোনার দক্ষতা শিখুন। উপস্থিত থাকুন। শান্ত থাকুন। বেশি প্রশ্ন করা নয়। তাদের ভাবনা অনুসারে সাড়া দিন। নিজের ভুল সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবেন না। নিরপেক্ষ থাকুন। সন্তানের উপলব্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না, কখনোই না।