রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ৯ কার্তিক ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

বৃষ্টিতে ভেসে গেল ক্যারিবীয় স্বপ্ন : শ্রীলংকা ফাইনালে

2_84509
বৈশাখ আসছে ঝড় নিয়ে। তারই মহড়া হয়ে গেল কাল। চৈত্রের আগুনঝরা দিনশেষে ঝড়ো-বৃষ্টি। নগরবাসী পুলকিত স্বস্তির পরশে। শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজই চায়নি আকাশ কাঁদুক। তবু ক্রিকেটের চিরশত্র“ বৃষ্টি এলো স্যামিদের কাঁদাতে। সেই কান্নায় ধুয়ে-মুছে গেল তাদের স্বপ্ন। সাজঘরে স্যামিরা হয়তো ঠিকই গেয়েছেন- ‘রেইন রেইন গো অ্যাওয়ে। কাম অ্যাগেইন অ্যানাদার ডে…।’ কিন্তু প্রকৃতি শুনলে তো! গেইলের দুরবস্থা দেখে হয়তো ঝড় তোলার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিল প্রকৃতি। যখন ঝড় থামল, শ্রীলংকা জয়ী। মালিঙ্গারা পৌঁছে গেলেন রবিবাসরীয় ফাইনালে। ক্যারিবীয়দের সিংহাসনচ্যুত করে প্রতিশোধ নিল শ্রীলংকা। ২০১২-তে নিজেদের আঙিনায় লংকানদের কাঁদিয়েছিল ক্যারিবীয় কার্নিভাল। কাল মিরপুরে একইদিনে ক্যারিবীয় কন্যাদের মতো ব্রাভোদেরও বিদায় হয়ে গেল।বৃষ্টিভেজা ম্যাচে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে ২৭ রানে শ্রীলংকার জয় যখন এলো, তখন রাত ১০টা ২৬ মিনিট। আকাশ যখন সবক’টা জানালা খুলে বারিধারা নামালো ধরণীতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের তখন দরকার ৩৭ বলে ৮১। হাতে ছয় উইকেট। বৃষ্টি-আইন গেল শ্রীলংকার পক্ষে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ হয়তো সিংহাসন হারানোর জন্য দায়ী করতে পারে ভাগ্যকে। তারা নিজেরাও কম দায়ী নয়। বৃষ্টি যখন আসি-আসি করছে, তখন তাদের ব্যাটে ঝড় ওঠেনি। প্রথম ওভারে ১৭ রান নেয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ পরের ছয় ওভারে মাত্র ১৭ রান নেয়। ড্যারেন স্যামি এবারের টি ২০ বিশ্বকাপে চমৎকার ফিনিশারের কাজ করেছেন। সেই তিনি যখন প্রথম বলের মুখোমুখি হবেন, তখনই বাদ সাধল বৃষ্টি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন ৮০/৪। টার্গেট ছিল ১০.৫ ওভারে ১০৮।এর আগে দারুণ শুরুর পর মাঝপথে ছন্দ পতন। শেষে ম্যাথিউস ঝড়। সবমিলিয়ে লড়াই করার মতো পুঁজি পেয়ে যায় শ্রীলংকা। কুশাল পেরেরার (২৬) ঝড়ো সূচনার পর থিরিমান্নে (৪৪) ও ম্যাথিউসের (৪০) দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ছয় উইকেটে ১৬০ করে লংকানরা। বাংলাদেশ সিরিজের পর এশিয়া কাপেও দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন কুমার সাঙ্গাকারা। টি ২০ বিশ্বকাপের আগে হুট করে জানিয়ে দিলেন, দেশের হয়ে ক্রিকেটের এই ক্ষুদে ফরম্যাটে এটাই তার শেষ টুর্নামেন্ট। বেলা শেষের গান কি তবে আগেই শুনতে পেরেছিলেন সাঙ্গাকারা? নাকি আগাম অবসরের ঘোষণা দিয়ে চাপে পড়ে গেছেন! কারণ যাই হোক, সাঙ্গাকারার এমন ধারাবাহিক ব্যর্থতা আগে কখনোই দেখা যায়নি। সুপার টেনে তিন ইনিংস মিলিয়ে করেছেন সাকুল্যে ১৮ রান। সেমিফাইনালেও পারলেন না দুঃসময়ের আলিঙ্গন থেকে বেরিয়ে আসতে। ছয় বলে মাত্র এক রান করে স্যামুয়েল বদ্রিকে রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে সাজঘরের পথ ধরলেন। প্রিয় বন্ধুর মতোই বিশ্বকাপের পর টি ২০ থেকে অবসরের আগাম ঘোষণা দেয়া মাহেলা জয়বর্ধনেও বিপদের মুহূর্তে দলের হাল ধরতে পারলেন না। সাঙ্গাকারার আগেই ডাক মেরে ফিরে যান তিনি। কোনো বল না খেলেই রান আউট! দুই বন্ধু পিঠাপিঠি ফিরে যাওয়ার আগে প্রতিশোধের ম্যাচে শ্রীলংকার শুরুটা দুর্দান্ত হয়েছিল। ৩.৫ ওভারেই ৪১ তুলে ফেলেছিলেন দুই ওপেনার কুশাল পেরেরা ও তিলকারত্নে দিলশান। চতুর্থ ওভারের শেষ বলে কুশাল পেরেরাকে বোল্ড করে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে প্রথম সাফল্য এনে দেন পেসার ক্রিসমার সান্টোকি। মাত্র ১২ বলে দুই চার ও দুই ছক্কায় ২৬ রান করে দলকে একটি শক্ত ভিত গড়ে দিয়ে যান কুশাল। কিন্তু চমৎকার সূচনার পরও জোড়া আঘাতে থমকে যায় লংকানদের অগ্রযাত্রা। পরের ওভারে দ্বিতীয় বলেই রান আউট জয়াবর্ধনে। সপ্তম ওভারে সাঙ্গাকারাকে ফিরিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দারুণভাবে ম্যাচে ফেরান বদ্রি। বিনা উইকেটে ৪১ থেকে মুহূর্তেই শ্রীলংকার স্কোর ৪৯/৩। চতুর্থ উইকেটে ৪২ রানের জুটি গড়ে লংকান শিবিরে স্বস্তি ফেরান দিলশান ও লাহিরু থিরিমান্নে। কিছুটা মন্থর হলেও ৪৩ বলের এই জুটিই কক্ষপথে ফেরায় শ্রীলংকাকে। ১৪তম ওভারে দিলশানের রান আউটে ভাঙে এই জুটি। ৩৯ বলে ৩৯ করেন দিলশান। এরপর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি থিরিমান্নে। ৩৫ বলে ৪৪ রান করে ১৭তম ওভারের শেষ বলে সান্টোকির দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন তিনি। শ্রীলংকার স্কোর তখন ১২১/৫। সেখান থেকে দলকে লড়াকু পুঁজি এনে দেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস। ২৩ বলে ৪০ রানের ঝড়ো ইনিংসের সুবাদেই শ্রীলংকার স্কোর দাঁড়ায় ছয় উইকেটে ১৬০। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে সান্টোকি দু’টি এবং বদ্রি ও রাসেল একটি করে উইকেট নেন। এর আগে নিয়মিত অধিনায়ক দিনেশ চান্দিমালকে ছাড়াই মাঠে নামে শ্রীলংকা। ফর্মে না থাকায় একাদশে জায়গা হয়নি চান্দিমালের। তার পরিবর্তে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে শ্রীলংকাকে নেতৃত্ব দিলেন লাসিথ মালিঙ্গা। এছাড়া থিসারা পেরেরার জায়গায় কাল খেলেছেন সেকুজ্জ প্রসন্না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ আগের ম্যাচের দলটিই খেলিয়েছে।শ্রীলংকার ইনিংসের শুরুতে ঝড় তুলেছিলেন কুশাল পেরেরা আর শেষে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস। কিন্তু ১৬১ তাড়া করতে নেমে শুরুতেই পথ হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রতিশোধের ম্যাচে আগুন ঝরানোর জন্য ডেথ ওভার পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন না লাসিথ মালিঙ্গা। ইনিংসের পঞ্চম ও নিজের দ্বিতীয় ওভারেই জোড়া আঘাত হেনে ক্যারিবীয়দের কোমড় ভেঙে দেন লংকান অধিনায়ক। নিজের নামের সঙ্গে একদম বেমানান এক ইনিংস খেলে ওই ওভারের প্রথম বলে বোল্ড ক্রিস গেইল (১৩ বলে ৩)। পঞ্চম বলে আরেক ওপেনার ডুয়ানে স্মিথকেও (১৭) সাজঘরের পথ দেখিয়ে দেন মালিঙ্গা। অষ্টম ওভারে লেন্ডল সিমন্সকে এলবিডব্লুর ফাঁদে ফেলেন টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো খেলতে নামা সেকুগে প্রসন্না। বিনা উইকেটে ২৫ থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর তখন ৩৪/৩। এরপর ঝড় তুলেছিলেন ডুয়ানে ব্রাভো (১৯ বলে ৩০)। কিন্তু ১৪তম ওভারে ব্রাভো ফেরার পর সত্যিকারের ঝড় দেখল মিরপুর। ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে শুরু হয় প্রবল শিলাবৃষ্টি। খেলা বন্ধ হওয়ার সময় ১৩.৫ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ছিল ৮০/৪। জয়ের জন্য বাকি ৩৭ বলে আরও ৮১ রান প্রয়োজন ছিল তাদের। আর ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে ২৬ রানে এগিয়ে ছিল শ্রীলংকা।
উৎস- যুগান্তর