শুক্রবার, ২৯ অক্টোবর ২০২১, ১৪ কার্তিক ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

বিলুপ্ত হচ্ছে কাতারি ‘কাফালা’

24048_f1

বিদেশী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স প্রেরণের প্রবাহ অব্যাহতভাবে অস্থিতিশীল ও নিচের দিকেই নামছে। চলতি বছরে রেমিট্যান্স আয় ১০০ মিলিয়ন ডলার কমেছে, বৃদ্ধির লক্ষণ নেই। তবে সুখবর মিলেছে এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি বাংলাদেশী শ্রমিকের কর্মস্থল কাতার থেকে। বিশ্বব্যাপী হইচইয়ের মুখে কাতার সরকার গত ১৪ই মে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য বিতর্কিত স্পন্সরশিপ ভিসা ব্যবস্থা বিলোপের ঘোষণা দিয়েছে। কাতারে এটা ‘কাফালা’ নামে পরিচিত। এর আওতায় শ্রমিকরা একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির কর্মী হিসেবে কাজ করার লিখিত মুচলেকা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে কাতারে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ন্যায্য মজুরি না দিলেও তাদের সম্মতি ছাড়া কেউ অন্যত্র চাকরি লাভ, এমনকি দেশত্যাগও করতে পারে না। এখন আইনে সংশোধনী আনবে শূরা কাউন্সিল। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে কাতারি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা এর প্রতিবাদ করবেন। কাতারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানবাধিকার পরিচালক কর্নেল আবদুল্লাহ সাকর আল-মোহান্নদি লন্ডনের দি গার্ডিয়ানকে বলেন, আমরা ‘কাফালা’ ব্যবস্থা বিলোপ করতে যাচ্ছি। কাফালার পরিবর্তে চাকরিদাতা ও শ্রমিকের মধ্যে একটি চুক্তি হবে। আমরা আশা করি ‘এক্সিট ভিসা’ পুরোপুরি বিলোপ করা হবে।’
দোহা এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা তাদের শ্রম আইনে সংস্কার আনবে। গত ১৪ই মে দোহা থেকে দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্টে বলা হয়, কাতার ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ। গার্ডিয়ান একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করে বলেছিল, কাতারের বিদেশী শ্রমিকরা ‘বিশ্বকাপ ক্রীতদাস’। কারণ বিদেশী শ্রমিকরা তাদের নিজ পছন্দে কাজ ও কর্মক্ষেত্র বেছে নিতে পারে না। গার্ডিয়ান লিখেছে, নতুন আইনে বলা হচ্ছে, কোন চাকরিদাতা কোম্পানি কোন প্রবাসী শ্রমিকের দেশত্যাগে বাধা দিতে চাইলে তাকে ‘বাধ্যকর’ কারণ দেখাতে হবে। কোন বিরোধ দেখা দিলে তা তিন দিনের মধ্যে নিষ্পন্ন করতে হবে। ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটার যিনি কাতারে বিশ্বকাপ ২০২২ অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তিনি এই পদক্ষেপকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
উল্লেখ্য যে, গত বছর কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার সেদেশে মাসে ন্যূনতম ৭৫০ কাতারি টাকায় গৃহপরিচারিকা নিয়োগে একটি চুক্তি সই করে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে দেখা গেছে রেমিটেন্স প্রবাহ খুবই অস্থিতিশীল। গত জানুয়ারিতে ১৩২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিটেন্স পাওয়া গেলেও এই পরিমাণ অর্থ আর ফিরে আসেনি।
গত মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ মার্চের চেয়ে কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তা জানুয়ারিকে ছাড়িয়ে যায়নি। এর পরিমাণ হলো ১২৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত জানুয়ারির চেয়ে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার কম। এই পটভূমিতে গত ৪ঠা মে সৌদি আরবের গাল্ফ নিউজ পত্রিকার ডেপুটি বিজনেস এডিটর বাবুদাস অগাস্টিন লিখেছেন, ভারতের জনশক্তির মধ্যে গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। এর সারকথা হলো, ভারতীয়রা আর আগের মতো ‘অড জব’ বা কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে না। তারা ‘ব্লু কলার’ জব করে না, হোয়াইট কলার জব করে। আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে অর্থ প্রেরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ফিলিপাইনের চেয়েও নিচে নেমে এসেছে। ভারত যথারীতি শীর্ষে রয়েছে।
গাল্ফ নিউজ আরো লিখেছে, ‘দুবাই থেকে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফিলিপাইন ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির হার অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু ভারতে রেমিট্যান্সের ভেল্যু (মূল্য) ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফিলিপাইনও এই ধারায় আছে।’
ইউএই এক্সচেঞ্জ সেন্টার বলেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদিতে ফিলিপিনোরা সংখ্যায় অনেক বেড়েছে। ভারত অব্যাহতভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রমের বাজারের মর্যাদা ভোগ করে চলেছে। উপরন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় ভারতীয়রা কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রোফাইল উন্নত করে নিতে পেরেছে। ভারতীয়রা এটা কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতেই নয়, তাদের এই পরিবর্তন ধারা সমগ্র গাল্‌ফ্‌ কো-অপারেশন কাউন্সিল জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে দেখা যাচ্ছে। জিসিসিভুক্ত দেশ হলো বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
ঢাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে চোরাচালান, ভিসা জালিয়াতি ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ ওই দেশগুলো ভারত ছাড়াও পাাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকে শ্রমিক আমদানি অব্যাহত রেখেছে। সৌদি আরব ইতিমধ্যেই জনশক্তি রপ্তানিকারী দেশগুলোর সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড এমপ্লয়মেন্ট কন্ট্রাক্ট সম্পাদন করছে। ভারত, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা ইতিমধ্যেই তাদের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে।
গালফ নিউজ ওই প্রতিবেদনে আরও বলেছে, গত দশকগুলোতে দেখা যাচ্ছে ভারতীয় ‘পেশাদার শ্রেণীর’ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে তাদের রেমিট্যান্সের মূল্য বড় অঙ্কে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। ইউএই একচেঞ্জ সেন্টারের সিওও সুধীর কুমার শেঠী বলেন, ভারতীয় শ্রমিকদের একটি বিরাট অংশ এখন হাই ইনকাম গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে তাদের তরফে লেনদেনের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু ‘টিকিট সাইজ’ভুক্ত শ্রমিকদের লেনদেন বেড়ে যাবে। তার কারণ তাদের অনেকেই বিনিয়োগের জন্য নিজের দেশে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন।
গত বছর ভারত ৭০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। তার পরে রয়েছে চীন, ৬০ বিলিয়ন ডলার। মি. শেঠী বলেন, ‘আমাদের জন্য ভারতের পরে বাংলাদেশ হওয়া উচিত বৃহত্তম শ্রমের বাজার। কিন্তু সেটা দখল করে ফেলেছে ফিলিপাইন। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স নিচের দিকে নামছে। কিন্তু ফিলিপাইনের রেমিট্যান্সের ভ্যালু এবং ভলিউম দু’টিই বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ ২০১৩ সালে ফিলিপাইন পেয়েছে ২৫ বিলিয়ন। আর বাংলাদেশ মাত্র ১৪ বিলিয়ন। বাংলাদেশ ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। এমনকি নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানের চেয়েও।
উল্লেখ্য, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ৫ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। গত বছরের জুলাই এবং চলতি বছরের এপ্রিলের মধ্যে বাংলাদেশ ১১.৭৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স লাভ করেছে। গত অর্থবছরের একই সময় বাংলাদেশ রেমিট্যান্স পেয়েছিল ১২.৩১ বিলিয়ন ডলার। এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে এই নিম্নমুখী ধারা বজায় থাকতে পারে। এর কারণ ২০১৩ সালে মাত্র সাড়ে চার লাখ শ্রমিক বিদেশে চাকরি লাভ করতে সক্ষম হয়। এটা ছিল ২০১২ সালের চাকরি লাভকারীদের তুলনায় ৩৩ ভাগেরও বেশি কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট ওই তথ্য দিয়েছে।
উল্লেখ্য, শ্রমের বাজারের এই নিম্নমুখিতার অন্যতম বড় কারণ বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক ফিরে এসেছে। ওই ইউনিট মনে করে বিদেশে শ্রমের বাজারে বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েতের শ্রমবাজারে বাংলাদেশীদের জন্য পুনরায় খুলে দিতে না পারার ব্যর্থতার জন্য কূটনীতি দায়ী। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসাইন মনে করেন, এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ মার্চের চেয়ে কিছুটা বেশি দেখা গেছে। কিন্তু এই ধারা সামনের মাসগুলোতে ধরে রাখা সম্ভব হবে- এখন মনে করার কারণ নেই।
বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কুয়েত শ্রমের বাজার বন্ধ রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, তেলের দাম স্থিতিশীল এবং জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর অর্থনীতির ভিত মজবুত থাকলেও সৌদি আরব থেকে বহিষ্কার এবং অন্যান্য বাধার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি বাংলাদেশে স্তিমিত হয়েছে। সৌদি আরবের সরকার ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজারের বেশি অভিবাসীকে ফেরত পাঠিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সৌদি আরবের এই পদক্ষেপের ফলে যেসব দেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার একটা তালিকা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া, মিশর ও ইয়েমেন রয়েছে।