Tuesday, July 25Welcome khabarica24 Online

বাতিল হচ্ছে ৫৭ ধারা, রোববার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

খবরিকা ডেক্সঃডিজিটাল নিরাপত্তায় করা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের (আইসিটি এ্যাক্ট) বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল হচ্ছে। এই ধারাটি বাদ দিয়ে আসছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ নামে নতুন আইন। আগামীকাল রোববার বেলা ১১টায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় উচ্চ পর্যায়ের সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। নতুন ওই আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সমালোচিত ও বিতর্কিত ৫৭ ধারা ছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৪, ৫৫ ও ৫৬ ধারা বাতিল করা হতে পারে। এসব ধারা বাদ দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি আইন থেকে ডিজিটাল সংক্রান্ত বিষয়গুলো সরিয়ে নেয়া হবে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের নাম পরিবর্তনসহ বেশকিছু ধারায় সংশোধনী আনা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ডিজিটাল ডিভাইস বা প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ব্যবহার করে পরিচালিত যেকোন ধরনের নেতিবাচক কার্যক্রম আইনের আওতায় আনতে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করছে। এই আইনে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘন সংক্রান্ত বিষয়ে সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদ-ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া, অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে আলাদা সর্বনিম্ন শাস্তির বিধানও থাকছে। মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এবং তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক বিস্তার লাভ করায় নতুন এই আইন করা হচ্ছে। এছাড়া তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলে বিভিন্ন মহলের দাবিও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে।

রোববারের এই সভায় ২১ সরকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতামত নেবে লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ। একই সঙ্গে গত ১৬ মে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৬’-এর খসড়া নিয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভার সিদ্ধান্তও আলোচনায় স্থান পাবে। এ সভায় উপস্থিত থাকতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, এ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ, জননিরাপত্তা বিভাগ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্প, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই), র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট, সিআইডি, পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (আইসিটি), বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ও বেসিসকে অনুরোধ করা হয়েছে।

এর আগে ২০০৬ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। এর পর থেকে এ আইনের ৫৭ ধারায় ব্যাপক প্রয়োগ করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা। ৫৭ ধারায় ২০১৫ সালে সাংবাদিক প্রবীর শিকদারের বিরুদ্ধে মামলা হলে পুলিশ তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করে। তখন ধারাটি বাতিলের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে জোর দাবি ওঠে। আইনমন্ত্রী তখন ধারাটি বাতিলের আশ্বাস দিয়েছিলেন। এরপর গত ২ বছরে হয়েছে আরও বেশকিছু মামলা। এরপর মামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা, খুলনা ও হবিগঞ্জের ৪ সাংবাদিক।

চারদিনের ব্যবধানে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা হয়। খুলনার সিএমএমের বিষয়ে রিপোর্ট করায় সিএমএমের পক্ষে ওই আদালতের নাজির তপন কুমার বাদী হয়ে ১৪ জুন খুলনা মেট্রোপলিটন সদর থানায় আলোকিত বাংলাদেশের খুলনা প্রতিনিধি মোতাহার রহমান বাবু ও স্থানীয় সময়ের খবরের স্টাফ রিপোর্টার সোহাগ দেওয়ানের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করেন। এর তিন দিন আগে ১১ জুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কমের স্টাফ করসপন্ডেন্ট গোলাম মুজতবা ধ্রুব’র বিরুদ্ধে এবং এর দুই দিন আগে ১২ জুন হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি ও হবিগঞ্জ সমাচার পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এ ছাড়া ওয়ালটনের পণ্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জের ধরে ৫৭ ধারায় দায়ের হওয়া এক মামলায় সম্প্রতি অনলাইন নিউজ পোর্টাল নতুন সময় ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক আহমেদ রাজুকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। কয়েক দিন কারাগারে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্ত হন।

সর্বশেষ চট্টগ্রামে দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরোর সিনিয়র রিপোর্টার তৌফিকুল ইসলাম বাবর এবং দিনাজপুরে যমুনা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার নাজমুল হোসেনসহ চারজনের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, মতপ্রকাশের দায়ে ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে আইসিটি এ্যাক্টে মামলা করা হচ্ছে।

২০১৩ সালে প্রণয়নের পর থেকেই আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সংগঠন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও ধারাটি বাতিলের জন্য ব্যক্তিপর্যায় থেকে জোর দাবি এসেছে বিভিন্ন সময়ে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থা এ ধারার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ৫৭ ধারাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বড় অন্তরায় মনে করেন আইনটির সমালোচকরা। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, বিরোধী মতকে দমন করতেই আইসিটি আইনে ৫৭ ধারা রাখা হয়েছে।

২০১৩ সালে তথ্য প্রযুক্তি আইনটি সংশোধনের পর ৫৭ ধারাটির অপব্যবহার ও প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়ে ওঠে। আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞরা এটাকে অসাংবিধানিক অভিহিত করে তা সংশোধনের দাবি তোলেন। সংবাদপত্রের প্রকাশক, মালিক ও সম্পাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদ এবং বাংলাদেশ নিউজ পেপার ওনার্স এ্যাসোসিয়েশন (নোয়াব) ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি জানায়।

এদিকে গত ১৬ মে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভার পরদিন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, নতুন ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারার সব বিভ্রান্তি দূর করা হবে। বাক-স্বাধীনতার ব্যাপারে যাতে কারও মনে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব না থাকে, এ নিয়ে কারও মনে কোন প্রশ্ন না ওঠে তা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে পরিষ্কার করা হবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের খসড়ায় মন্ত্রিপরিষদ ইতিমধ্যেই নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় এখন আইনটি যাচাই-বাছাই করছে। এ নিয়ে সম্প্রতি একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাও হয়েছে। সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে সভায় উপস্থিত সকলেই এ আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হন। এর ভিত্তিতেই উচ্চ পর্যায়ের সরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মতামত নেয়ার জন্য ডাকা হয়েছে।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব ওমর ফারুক বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি আইন যখন প্রণীত হয়, সে সময়ই আমরা আইনটির ৫৭ ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সতর্কতার সঙ্গে ৫৭ ধারা প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু বিভিন্ন সময় এই ধারাটির অপব্যবহার হয়েছে। নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গণমাধ্যম কর্মীরাও অনেক সময় হয়রানির শিকার হয়েছেন।

তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে সাইবার নিরাপত্তা আইন করার উদ্যোগ নেয়া হয়, যে আইনে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা রহিত করার কথা বলা হয়। আইনটি এখন নতুন নামে প্রণীত হওয়ার জন্য খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এই আইনে একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা আছে, যারা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বিতর্কিত কোন কিছু মুছে দেয়ার এখতিয়ার রাখবে। এ রকম হলে সেটি গণমাধ্যমের কর্মীদের জন্য ভাল হবে না। কারণ গণমাধ্যমের জন্য সম্প্রচার নীতিমালা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আরও আইন আছে। এ জন্য নতুন ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন করতে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে নতুন আইনের কোন কিছু বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। এছাড়া এই আইনে যাতে গণমাধ্যমকর্মীদের বাক স্বাধীনতা খর্ব না করে সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

যা ছিল আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায়
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহা ইহলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।’ (২) ‘কোন ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বৎসর এবং অন্যূন সাত বৎসর কারাদ-ে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদ-ে দ-িত হইবেন।’

হাইকোর্টে রিট
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বিলুপ্ত করতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে চার সপ্তাহের রুল জারি করে হাইকোর্ট, যা বর্তমানে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। ধারাটি বিলুপ্তির নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদনটি দায়ের করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহমেদ কামাল, আকমল হোসেন, গীতি আরা নাসরিন, ফাহমিদুল হক, তানজীম উদ্দিন খান, সামিনা লুৎফা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনু মুহাম্মদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, সংস্কৃতিকর্মী অরূপ রাহী, লেখক রাখাল রাহা ও আবদুস সালাম। এতে আইন সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব এবং স্বরাষ্ট্র সচিবকে বিবাদী করা হয়।