শুক্রবার, ২৯ অক্টোবর ২০২১, ১৪ কার্তিক ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

বর্ষবরণের উৎসবে মেতেছে পাহাড়

1_87968

 

 

পুরনোকে বিদায় আর নতুনকে বরণে উৎসবে মেতেছে পাহাড়ের মানুষ। চৈত্রসংক্রান্তি আর পহেলা বৈশাখ ঘিরে পাহাড়ি বাঙালিদের মাঝে বইছে আনন্দের বন্যা। নানা আয়োজনে বিদায় ও বরণ উৎসব সাজাতে ব্যস্ত পাহাড়ের তিন জেলার মানুষ। আজ বাংলা বছরের শেষ দিন চৈত্রসংক্রান্তি। পাহাড়ে মূলত চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব ঘিরেই আয়োজন করা হয় বৈসুক-সাংগ্রাই-বিজু। এই তিন মিলে হয় বৈসাবি। তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক। বাংলা বর্ষ বিদায় আর নতুন বছর বরণকে চাকমা ও তঞ্চংগ্যা সম্প্রদায় বিজু, মারমাদের-সাংগ্রাই, ত্রিপুরা ও উসুইরা বৈসুক বা বৈসু নামে এ উৎসব পালন করে থাকে। যার সমন্বিত নাম বৈ-সা-বি। পাবর্ত্য অঞ্চলে চাকমা মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের আদ্যাক্ষর নিয়ে হয়েছে বৈ-সা-বি।
বৈসাবি ঘিরে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত পাহাড়ি পল্লীসহ সর্বত্রই বইছে আনন্দধারা। পুরনো বছরের সব দুঃখ, বেদনা, গ্লানি, ব্যর্থতা জলে ভাসিয়ে দিয়ে নতুন বছরে জীবনের অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রার্থনায় মহান সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে জলে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শনিবার পার্বত্যাঞ্চলে শুরু হয়েছে তিন দিনের উৎসব। প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তিতে পাহাড়ে জনগণ তাদের প্রাণের উৎসব আয়োজন করে।চাকমারীতি মতে, প্রতি বছর চৈত্রের ২৯ তারিখ ফুলবিজু, ৩০ তারিখ মূলবিজু এবং পহেলা বৈশাখ গোজ্যেপোজ্যা দিন হিসেবে পালিত হয় উৎসবটি। সে অনুযায়ী শনিবার আদিবাসীদের ঘরে ঘরে পালিত হয়েছে ফুলবিজু। ভোরে পার্বত্য তিনটি জেলায় বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ি ছড়া, ঝরনা, ঝিরি ও কাপ্তাই হ্রদের জলে ফুল ভাসিয়ে শুরু হয় উৎসবের প্রথম দিবস ফুলবিজু। রাঙ্গামাটিতে ভোর সাড়ে ৬টায় উদযাপন কমিটির উদ্যোগে শহরের রাজবন বিহারঘাটে সার্বজনিনভাবে ফুল ভাসানো হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার। এছাড়া উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও আদিবাসী নেতা প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, এমএন লারমা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিজয় কেতন চাকমাসহ পাহাড়ি নেতারা উপস্থিত ছিলেন। শহরের গর্জনতলী, আসামবস্তী, রাজবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ফুল ভাসানো হয়েছে।ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ঝিনুক ত্রিপুরা জানান, শনিবার ভোরে ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গর্জনতলীতে ফুল ভাসানো, বয়োজ্যেষ্ঠদের স্নান ও বস্ত্রদান, ঐতিহ্যবাহী গড়াইয়া নৃত্য, পিঠা আপ্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ (রোববার) উদযাপিত হবে মূলবিজু- অর্থাৎ উৎসবের প্রধান দিবসটি। এদিন সাধ ও সাধ্যমতো আয়োজন ও আপ্যায়ন হয়ে থাকে ঘরে ঘরে। ধনী, গরিবের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। জাতি, সম্প্রদায়, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ যোগ দেয় আনন্দ উৎসবে। এতে প্রতিটি ঘরে তৈরি হয় সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্র। কাল (সোমবার) ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠানে পালিত হবে উৎসবের সমাপনী দিবস গোজ্যেপোজ্যা দিন। এদিন বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান, আপ্যায়ন এবং মন্দিরে মন্দিরে প্রার্থনার আয়োজন চলে। ঘরে ঘরে আয়োজন করা হবে প্রীতিভোজের।তিন দিনব্যাপী উৎসবকে চাকমারা প্রথম দিন ফুলবিজু, মারমারা পাইংছোয়াই, ত্রিপুরারা হারিবৈসুক, দ্বিতীয় দিন চাকমারা মূলবিজু, মারমারা সাংগ্রাই আক্যা, ত্রিপুরারা বৈসুকমা এবং তৃতীয় দিন চাকমারা গোজ্যেপোজ্যা দিন, মারমারা সাংগ্রাই আপ্যাইং ও ত্রিপুরারা বিসিকাতাল বলে পালন করে। তিন দিনের উৎসবে ঘরে ঘরে আয়োজন করা হয় ভিন্ন স্বাদের সুস্বাদু খাবার। সবাই উৎসব আনন্দে মেতে ওঠে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জনগণের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবটি স্মরণাতীত কাল থেকে যথাযথ মর্যাদায় পার্বত্য জনপদে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু স্বতন্ত্র সংস্কৃতির অধিকারী এ অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বসবাসরত আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীর জাতীয় অস্তিত্ব ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি আজ নানা কারণে হুমকির সম্মুখীন।বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের ৭টি উপজেলাসহ খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে একযোগে শনিবার সকাল থেকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বৈ-সা-বি উৎসব শুরু হয়েছে।
চার দিনব্যাপী এ বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে আদিবাসী পল্লীগুলো মেতে উঠেছে। র‌্যালি, পিঠা উৎসব, বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে রক্ষিত মূর্তি চন্দন ও দুধ দিয়ে ধৌতকরণসহ মন্দিরে মন্দিরে (এখানে কিয়াং বলা হয়) পূজারিদের বিশেষ পূজা, ধর্মদেশনা ও ভান্তেগণের জন্যে ছোঁয়াইং দানের কর্ম চলে।খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে তিনদিনব্যাপী ‘বৈসাবি’। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু, মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই ও চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু- এই তিন সম্প্রদায়ের আদ্যাক্ষর নিয়ে উৎসবের নাম একত্রে বৈসাবি নামে পরিচিত। শনিবার ভোর থেকে চাকমা সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা দলে দলে হল্লা করে ফুল তুলে নদী-খালে ফুল ভাসিয়ে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে পূজা দেয়া শুরু করে।