Wednesday, September 20Welcome khabarica24 Online

ফিরে এসো মাশরাফি

images

এম.ইমাম হোসেনঃ ১৮৬৮ সাল থেকে বিশ্বে ক্রিকেট খেলা শুরু হলেও প্রথম বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরু হয় ১৯৭৩ সাল থেকে। এই থেকে মূলত ক্রিকেটের প্রচার প্রসার বাণিজ্যি করন ও বিশ্বায়ন শুরু হয়। এতে বাংলাদেশ ১৯৯৭ সালে সর্বপ্রথম মালেশিয়ার মাটিতে স্ক্যাটল্যান্ডকে পরাজিত করে বিশ্বকাপের মূল আসরে অংশগ্রহনের সুযোগ পায় এবং এই থেকে বিশ্ববাসীকে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকায় নতুন করে পরিচয় করে দেয়। প্রথম আসরে পাকিস্তান কে পরাজিত করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রায় শতাধিক খেলোয়াডের অভিশেক ঘটলেও কিছু খেলোয়াড় অন্তজার্তিক পরিসরে স্থান করে নিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম জাতীয় দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের সেরাদের তালিকা দীর্ঘ হলেও কয়েক জনের নাম না বললে নয়, রকিবুল হাসান, জাহাঙ্গির শাহ বাদশা, আতাহার আলি, সাইফুল ইসলাম, গোলাম নওশের প্রিন্স, জাহাঙ্গির আলম দুলু, নুরুল আবদিন নোবেল, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আকরাম খান, তামিম ইকবাল, নাফিজ ইকবাল, শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুত, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, নান্নু, পাইলট, রফিকুল, রফিক, মাশরাফি , মুস্তাফিজুর রহমান ও রুবেল হোসেন সহ প্রমুখ।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের সফলতা ও ব্যর্থতার রাজ সাক্ষী মাশরাফি বিন মুর্তজা। ২০০১ সালে ওয়ানডে ও টেস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক হয় তার। বোলার ও অধিনায়ক হিসেবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে তার অবদান মূল্যায়ন করার মতো। পায়ে ৬টি অস্ত্রপাচারের পরও অদম্য মানসিকতার মাশরাফি খেলে গেছেন দেশের জার্সি গায়ে। অনেকে অনেক উপদেশ দিলেও কানে তোলেননি কোনও উপদেশ। বরং নিজের ওপর উঁচু বিশ্বাস রেখে পরিশ্রম করে গেছেন। নিজেকে প্রস্তুত করেছেন খেলার উপযোগী করে।

পাঁচ বছর আগের সেই মাশরাফি এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অধিনায়ক। গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেট তার হাত ধরেই বদলে গেছে। ক্রিকেটকে তিনি এই ক’বছর দুই হাত ভরে দিয়েছেন।

২০০১ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর ১৬ বছর ধরে খেলে চলেছেন এবং দাপটের সঙ্গেই খেলছেন। ওয়ানডে ক্রিকেটই তার প্রমাণ। দুই হাঁটুতে ব্যান্ডেজ নিয়ে নিয়মিত ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বোলিং করছেন।

উল্লেখ্য মাশরাফি ওয়ানডেতে ১৬০টি ম্যাচ খেলে ২০৪টি উইকেট নিয়েছেন। ৩৬ টেস্টে ৭৮ টি উইকেট নিয়েছেন। অন্যদিকে ৩৯ টি-টোয়েন্টি খেলে ৩৩ টি উইকেট নিয়েছেন তিনি। ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে টেস্টে তার রান ৭৯৭, ওয়ানডেতে ১৪৪২ এবং টি-টোয়েন্টিতে ৩২১।
গত দশ বছরে ওয়ানডেতে মাশরাফি সবচেয়ে বেশিবার ব্যাট করেছেন ব্যাটিং অর্ডারের নবম স্থানে, ৪৯ বার। এই সময়ের মধ্যে কমপক্ষে ২৫ ইনিংস নয় নম্বর পজিশনে ব্যাট করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫০১ রান মাশরাফির। ৩৫ ইনিংসে ৫০৩ রান নিয়ে তালিকার শীর্ষে আছেন কিউই বোলার কাইল মিলস্। এই দুইজন বাদে এই পজিশনে গত দশ বছরে ৪০০+ রান আছে আর একজনেরই, শ্রীলংকার নুয়ান কুলাসেকারার ৪৩৪।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট টেল-এন্ডারদের খেলা না যদিও, তবুুপ্রসঙ্গ যদি হয় আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি, সেখানেও টেল-এন্ডার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে মাশরাফিই সবচেয়ে উজ্জ্বল।

গত দশ বছরে কমপক্ষে ২০টি টি-টোয়েন্টি ইনিংসে ব্যাট করা টেল-এন্ডারদের মধ্যে ৩০০+ রান আছে একমাত্র মাশরাফিরই। ২৭ ইনিংসে তার রান ৩০৮। তালিকার পরের নামটি শ্রীলংকার নুয়ান কুলাসেকারার, ২৪ ইনিংসে তার রান ১৯১। সেই ২৭ ইনিংসে মাশরাফির ব্যাট থেকে আসা চারের সংখ্যা ২৫। গত দশ বছরে কমপক্ষে ২০টি টি-টোয়েন্টি ইনিংসে ব্যাট করা টেল-এন্ডারদের মধ্যে সর্বোচ্চ। একইসাথে ছক্কা মেরেছেন ১৮টি। সেটিও ছক্কার দিক দিয়ে টেল-এন্ডারদের মধ্যে সর্বোচ্চ।
তাকে বলা হয় বাংলাদেশ দলের বোলিং আক্রমনের প্রাণ ভোমরা। মাঠে খেলেন নিজের শতভাগ উজাড় করে, জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসেন ক্রিকেট। বার বার বড় ধরনের ইনজুরিতে পড়েন, থাকতে হয় মাঠের বাইরে। আবার ফর্ম নিয়ে ফিরেও আসেন সগৌরবে।
খেলার জন্য এভাবে জীবন বাজী তিনিইতো রাখতে পারেন। কারণ নাম যে তার মাশরাফি বিন মুর্তূজা।

৫ অক্টোবর ১৯৮৩, নড়াইল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন ১৬ কোটি মানুষের প্রিয় মাশরাফি। ছোটবেলা থেকে মাশরাফি ছিলেন দুরন্ত। বাবা মায়ের আদর করে তাকে ডাকেন কৌশিক।

লেখাপড়া ভালোভাবে মনোযোগ না দিয়ে বাবা গোলাম মর্তুজার বাধা ডিঙিয়ে ফুটবল, ব্যাডমিন্টন নিয়ে পড়ে থাকতেন। পাশাপাশি বাড়ির পাশে চিত্রা নদীতে সাঁতার কাটাই ছিলো তার আসল কাজ।

বন্ধুদের সাথে ঘুরাঘুরি করা, নারিকেল গাছে উঠে ডাব খাওয়া, নড়াইলের ফেরিঘাটে গিয়ে আড্ডা মারা ছিলো তার অন্যতম কাজ। এখনও সময় পেলে গ্রামের বাড়ি নড়াইলে গিয়ে বাইক নিয়ে চিত্রা ব্রিজের উপর আড্ডা দিয়ে সময় পার করেন মাশরাফি।

বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর। ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হোম সিরিজ। ডাক পেলেন কৌশিক। ঢাকা ক্রিকেট লীগ না খেলেও তিনি সরাসরি জাতীয় দলের খেলার সুযোগ পেয়েছেন। জাতীয় লীগ খেলার সুবাদে। একই বছর ২৩শে নভেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেটে মাশরাফির অভিষেক হয় ফাহিম মুনতাসির ও তুষার ইমরান এর সাথে।

তবে অনুর্ধ ১৯ দলের হয় খেলার সময় কৌশিকের গতিময় ও আক্রমনাত্বক বোলিংয়ের জন্য নজর কাড়েন তৎকালীন অস্থায়ী কোচ ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ফাস্ট বোলার এন্ডি রবার্টসের।

২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ থেকে অধিনায়কের দায়িত্ব কাধেঁ ওঠে ম্যাশের।
ইংলান্ডকে প্রথম বারের মত বাংলাদেশ পরাজিত করে মাশরাফির অধিনায়কত্বে। কিন্তু এরপর আবার ইঞ্জুরীতে, যার কারনে খেলা হয়নি ঘরের মাঠের ২০১১ বিশ্বকাপেও!

বাংলাদেশ ভারত এক টেষ্ট ম্যাচের শেষ পাঁচ ওভারে মাশরাফি বিধ্বংসী ব্যাটিং দেখে আফসোস করে  সৌরভ গাঙ্গুলী বলেছিলেন “ইশ! আমাদের যদি একটি মাশরাফি থাকতো”

ইঞ্জুরিতে পড়ে অনেক বড় বড় খেলোয়াড় অবসর নিয়েছে। ইঞ্জুরিতে পড়ার পর ব্রেটলি, শেন ভন, এন্ড্রু ফ্লিনটপের মত প্লেয়াররা ক্রিকেটে ফিরতে পারেন নি। কিন্তু মাশরাফি এরকম ইঞ্জুরি নিয়েও খেলে যাচ্ছেন।
মাশরাফি একজন মারকুটে ব্যাটসম্যানও। ভারতের বিপক্ষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় তিনি পরপর চার বলে ছক্কা পেটান। সেই ওভার থেকে তিনি ২৬ রান সংগ্রহ করেন যা কোন বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানের জন্য এক ওভারে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।
শতভাগ উজাড় করে দিতে এতটুকু কার্পণ্য করেন না তিনি। কারণ তিনি অপরাজেয়। তিনিই মাশরাফি বিন মুর্তূজা। তিনি বাংলা গর্ব বাংলার বাঘ। ক্রিকেট বিশ্বে তার নাম জ্বল জ্বল করে জ্বলবে।

টুয়েন্টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের জাতীয় দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা আন্তর্জাতিক টি২০ থেকে তার অবসরের কথা ঘোষণা করেছেন।

কলম্বোতে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার মধ্যে প্রথম টি২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি শুরু হবার আগে এ কথা জানিয়েছেন মাশরাফি।

ফলে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে দুটি ম্যাচই হবে তার শেষ টি২০ সিরিজ।

ঘন্টাখানেক আগে ফেসবুকে তার প্রোফাইলে এক স্ট্যাটাসেও মাশরাফি এ কথা জানিয়েছেন।

তিনি লেখেন: আমি মনে করি টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে অবসর নেয়ার জন্য এটাই আমার উপযুক্ত সময় যাতে অনেক তরুণ উদীয়মান ক্রিকেটার তাদের প্রতিভা তুলে ধরতে পারে এবং বিসিবি তাদেরকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

“আমি বাংলাদেশ এর টি-টোয়েন্টি টিম এর নতুন অধিনায়ক কে আগাম অভিনন্দন জানাই এবং আমি নিশ্চিত বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেরা সময় সামনে আসবে।”
তিনি আরো লেখেন, “বাংলাদেশ টিমকে টি-টোয়েন্টি ইন্টারন্যাশনালএ ১০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিনিধিত্ব করা আমার জন্য অনেক গর্বের। আমি বিশ্বাস করি বর্তমান দলটি একটি ভাল দল এবং দলে কিছু উদীয়মান খেলোয়াড় আছে। ”

“আমার উপর আস্থা রাখার জন্য এবং আমাকে এত চমৎকার দলের নেতৃত্ব প্রদানের সুযোগ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি আমি আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞ। আমি আমার সকল ভক্ত, পরিবার এবং বন্ধুদের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ আমাকে সবসময় সমর্থন করার জন্য।”

শ্রীলংকার বিরুদ্ধে সিরিজের আগে পর্যন্ত মাশরাফি বিন মুর্তজা মোট ৫২ টি আন্তর্জাতিক টি২০ ম্যাচ খেলেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন ২৬টি ম্যাচে, জয়ী হয়েছেন ৯টিতে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের হয়ে তিনি ৩৬টি টেস্ট এবং ১৭২টি ৫০ ওভারের একিদনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।