Tuesday, September 25Welcome khabarica24 Online

প্রতারিত প্রবাসীরা অনেকেই জড়িয়ে যায় অপরাধের সাথে !

: মোহাম্মদ আল-আমীন :  

al amin
প্রবাসের যদি আরেকটা বিকল্প নাম দেয়া হয় তাহলে সেই নামটি হবে “কষ্ট” এতে কোনো সন্দেহ নাই । অনেককেই মাঝে মধ্যে বলতে শুনি শখের বসে সে বিদেশ এসেছেন। এই কথাটা আমি কোনো ভাবেই মানতে পারিনা এবং ভবিষ্যতেও মানতে পারবো না। তবে হ্যা সবাই যে একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর উপার্জনের জন্য বিদেশ আসে তা কিন্তু নয়। অনেকেই মোটামুটি সুখের সংসার ছেড়ে আরো ভালো সুখের আশায় বিদেশ আসেন। আবার অনেক উচ্চ-উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের লোকও নামিদামী কিছু বহুজাতিক কোম্পানীর চাকুরী নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। আর মধ্য এবং নিম্মবিত্তদের বিদেশের ভবিষ্যতটা কেমন হবে সেটা কাজে যোগদানের আগ পর্যন্ত থাকে একেবারেই ধারনার বাইরে। কিন্তু তাদের মধ্যে নুন্যতম একটা আত্নবিশ্বাস থাকে যে বিদেশে তার জীবনটা এমন হতে পারে। এখানে আসার পর আত্নবিশ্বাস আর দেশ থেকে শুনে আসা কথার সাথে অনেকের বাস্তবতা মিলে যায় পুরোপুরি, অনেকে পায় ধারনার চাইতে অনেক বেশি আবার অনেকেই তার ধারে কাছেও যেতে পারেনা। বিপত্তি ঘটে সেই লোকদের যারা দেশ থেকে নিয়ে আসা স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার বিন্দুমাত্র মিল খুজে না পায় তাদের। আবার যারা কল্পনার চাইতেও বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে যায় তারাও অনেক সময় বিপদ গামি হয়ে পড়েন। আর মধ্যম শ্রেণির লোকদের ক্ষেত্রে এমনটা খুব সচারাচর চোখে পড়েনা।

আমার অফিসের সামনের রাস্তা ঝাড়ু দেয় একজন বাংলাদেশি। দেখতে শুনতে মাশাআল্লাহ। চেহারার মধ্যে শিক্ষিতের ছাপ আছে। সাইফুলের (ছদ্মনাম, মিডিয়ায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) দেশের বাড়ী টাঙ্গাইল জেলায়। বলে রাখা ভালো একটা সময়ে সৌদি আরবের রাস্তা-ঘাট পরিস্কারের জন্য নিয়োজিত শতভাগ লোক ছিলো বাংলাদেশি। বর্তমানে বাংলাদেশি লোকদের বিভিন্ন অপকর্মের কারনে সৌদি সরকার বাংলাদেশের ভিসা বন্ধ রাখার কারনে এই কাজে নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছে নেপালীরা। এখনো ক্লিনাদের শতকরা ৮৫/৯০ ভাগই বাংলাদেশি। যাই হোক সাইফুল প্রতিদিন সময়মতো ডিউটিতে আসে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার পর কোম্পানীর গাড়ী এসে নিয়ে যায়।

একদিন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সাইফুলের কাজ শেষ। আমার অফিসের দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে ভবিষ্যতের রঙ্গিন স্বপ্ন বুনছে। আমার হাতেও তেমন কাজ ছিলো না। কৌতুহলের বসে অফিস থেকে বেরিয়ে তার সাথে গিয়ে বসলাম। -কেমন আছেন ভাই? আমার শব্দ শুনে সে হতচকিত হয়ে বললো -জি ভাই ভালো। আমাকে জিজ্ঞাস করলেন আপনি কেমন আছেন? আমি বললাম ভালো আছি। হাতে ইশারা করে আমার অফিস দেখিয়ে বললাম এটা আমার অফিস। আর আমার আরেকটা পরিচয় হচ্ছে আমি মিডিয়ায় কাজ করি। আপনার কিছু কথা মিডিয়ায় তুলে ধরতে চাই। রাজি হলেন, আর শর্ত দিলেন নাম ঠিকান প্রকাশ করা যাবেনা। কারন জানতে চাইলে সে জানায়, আমাদের ক্যাম্পের বেশিরভাগ লোকই ইন্টারনেটে দেশের খবর পড়ে এবং অনেকেই বিভিন্ন বাংলা অনলাইন নিউজপোর্টাল দেখেন আর সেখানে আমার পরিচয় জানতে পারলে সমস্যা হবে। তার কথা রাজি হয়ে কথা বলা শুরু করলাম। তার বাড়ী টাঙ্গাইল আর আমার বাড়ী গাজীপুর হওয়ার কারনে তার সাথে মিশতে বেশি সময় লাগেনি।

তার সাথে কথা বলার পর এটা নিশ্চিত হলাম সে বিএ পাশ। বিএ পাশ করে রাস্তা ঝাড়ু দেয়ার কাজে বিদেশ আসলেন কেনো জিজ্ঞেস করতেই চোখের একফোটা জল ফেলে বললেন ভাগ্যের নির্মম পরিনতির কারনে আজকে আমি এখানে । সেটা কেমন জিজ্ঞাস করতেই একটু নড়ে চড়ে বলতে লাগলেন তার বিদেশ আসার নির্মম ইতিহাস।

-অভাবের সংসার বাবার খরচে কোনো রকম এইচএসসি পাশ করার পর বাবার মৃত্যু হয়। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ার কারনে যথারীতি সংসার চালানোর দায়িত্ব পরে আমার ঘারে। টিউশনি আর একটা কিন্ডার গার্ডেন এর চাকুরি করে অনেক কষ্টে বিএ পাশ করি। সংসার চালাতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে। এরই মাঝে এলাকার একজন ভাই আমাকে বিদেশ আসার প্রস্তাব দিলেন। তার খরচে আমাকে একদিন ঢাকার ফকিরাপুলের একটি অফিসে নিয়ে গেলন। সে অফিস থেকে আমাকে বুঝনো হলো বিদেশে আমার কাজ হবে যারা বাগানে কাজ করে তাদের তদারকি করা মানে সুপারভাইজার। বেতন হবে ৯৫০রিয়াল। খাওয়া ছাড়া যাবতীয় খরচ কোম্পানী বহন করবে। এমনকি কাপড় ময়লা হয়ে গেলে কোম্পানীর তরফ থেকে সেটা ক্লিন করে দেয়া হবে । তার কথা শুনে লোভটা সামলাতে পারিনি। বাড়ি এসে মাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজী করলাম । ভিসার দাম ৩লাখ ২০হাজার টাকা । বিমান টিকেট এবং আনুসাঙ্গিক খচর মিলে ৪লাখের মতো পড়বে। বাড়ীর ভিটা টুকু রেখে বাকী সব জায়গা বন্ধক দিয়ে মিললো মাত্র আড়াই লাখ টাকা । পাশের গ্রামের একজনের কাছ থেকে মাসিক শতকরা ১০টাকা হারে সুদে দেড় লাখ টাকা নিয়ে অফিসে জমা দিলাম । দুই মাসের মধ্যে বিদেশ পাঠাবে বলে অফিস থেকে জানানো হলো ।

প্রতিক্ষার প্রহর শেষ করে ভিসা টিকেট হাতে পেয়ে ঐ কোম্পানীর তার মতো আরো জন তিরিশেক লোকের সাথে কোম্পানী নির্ধারিত পোশাক গাঁয়ে জড়িয়ে আশায় বুক বেধে বিমানে চড়লেন সাইফুল। সাইফুল সৌদি আরব এসে প্রথমেই যে হুচট খেয়েছেন বলে জানালেন তা হলো ৩/৪জন লোকের থাকার একটি রুমে ডাবল/ট্রিপল সিট ব্যবহার করে ৮/১০জন লোক দিন যাপন করছেন। সে ধরে নিয়েছেন বিধেশে মনে হয় এমনি সিষ্টেম। মধ্যে একদিন যাওয়ার পর ৩দিনের মাথায় তার পাসপোর্ট জমা রেখে কোম্পানীর প্যাডের আরবীতে লিখা একটি পেপার ধরিয়ে দিয়ে তাকে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হলো। তখনো তার মনে সুপারভাইজারের চাকুরীর স্বপ্ন ঘোরপাক খাচ্ছে। কোম্পানীর নিয়ম অনুযায়ী ভোর চারটার সময় সবাই কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সাথে সাইফুলকেও ডেকে উঠানো হলো। রেডি হয়ে গাড়ীতে উঠলো । একটি রাস্তা পাশে সবাইকে নামিয়ে গাড়ী চলে গেলো। একজন এসে সাইফুলের হাতে একটি বাকেট আর লম্বা হাতল ওয়ালা একটি ঝাড়ু ধরিয়ে দিয়ে হাতে ইশারা করে সীমানা দেখিয়ে দিয়ে বললেন এটুকু তোমার এরিয়া। সাইফুল যেন আকাশ থেকে পড়লো । ওই লোকটিকে সাইফুল বললো ভাই আমি তো এই কাজের জন্য আসিনি। আর এই কাজ আমার ধারা সম্ভব নয়। ওই লোকটি স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় উত্তর দিলে প্রথম প্রথম সবাই এমন বলে পরে সব ঠিক হয়ে যায় ।

সেদিন আর কাজ করেনি সাইফুল । নতুন লোক হওয়ার কারনে সাথীরাও তাকে কিছুই বলেনি। এরই মাঝে বাকযুব্ধ আর বিবেকের সাথে সংগ্রাম করে চলে গেলো কয়েকটি দিন। কোম্পানীর সাফ কথা বেতন ৩৫০রিয়াল কাজ রাস্তা ঝাড়ু দেয়া মন চাইলে এই কাজ করো না হয় দেশে চলে যাও। এবার সাইফুল নিরুপায় ঘরে অবিবাহিত দুইটি বোন তিনজন ভাই এবং অনেক টাকা দেনা। জমিজমা সব বন্ধক দেয়া। এই অবস্থায় দেশে চলে গেলে আত্নহত্যা করা ছাড়া আর উপায় থাকবেনা। অনেক বেভেচিন্তে কাজ করা সিব্ধান্ত নিলো এবং দুভার্গকে সাথী করেই চলতে শুরু করলো অজানা পথ। সংসার চালিয়ে দেনা শোধ করতে সাইফুলের জীবন থেকে চলে গেছে চারটি বছর। সাইফুলের সাথীরা অনেকেই চুরিধারী আর অবৈধ কাজ করে বনে গেছেন অনেক টাকার মালিক। কথাগুলো শেষ হতে না হতেই তার গাড়ী এসে দাড়ালো এবং সে চলে গেলো। বুঝলাম সাইফুলের শিক্ষিত বিবেক কখনোই সায় দেয়নি অন্যায় কাজে। তাই তিনি এখনো বুক ভাষান চোখের লুনা পানিতে।
প্রবাসের মাটিতে সাইফুলের মত লোকখুব কমই আছে। বেশির ভাগ লোকই চাই রাতারাতী বড়লোক হতে। অনেককেই দেখেছি এমন সব কোম্পানী থেকে পালিয়ে এসে অবৈধ পন্থায় সৌদি সরকার কতৃক নিষিব্ধ ঘোষিত বিভিন্ন কাজের সাথে জড়িয়ে তারাতারা বড়লোক হয়েছেন আবার অনেকেই মাথা বিহীন লাশ হয়ে লাল সবুজের পতাকাকে কলংকিত করে দেশে ফিরেছেন। বিদেশ যাওয়ার আগে কি কাজে যাচ্ছি বেতন কতো এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কেমন তা নিয়োগকারী কোম্পানীর চুক্তি-পত্রে যাচাই বাচাই করে এবং সংশ্লিষ্ট দেশের উপযোগী কোনও কাজ শিখে খোঁজ খবর নিয়ে তবেই যাওয়া উচিত। তাহলে আর কেউ হয়ত দুর্বিসহ জীবন যাপন করবেন না। তাহলেই দেখতে হবেনা সাইফুলদের চোখের পানি ।

অবৈধ কাজে লাভের পরিমান সবসময়ই বেশী তাই এই অবৈধ কাজের লোভ অনেকেই সামলাতে পারেন না। হুজুগে বাঙ্গালী আদম বেপারি রসমিশানো কথার ফাদে পড়ে ভিটে-মাটি বিক্রি করে বিদেশে এসে এই টাকা ফিরে পাবার নেশায় জড়িয়ে যায় মারাত্নক সব অপরাধমুলক কর্মকান্ডে আর তখনি ঘূটি কয়েক মানুষের জন্য চুন-কালি পড়ে ১৪৭,৫৪০কিলোমিটারের মানচিত্রে। মধ্যপ্রাচ্যে মূলত ‘ফ্রি ভিসা’ বলে কোন ভিসাই নেই। কোম্পানির নামসর্বস্ব সাইনবোর্ড ভাঙিয়ে শ্রম অধিদফতর থেকে ভিসা বের করে আরব ‘কফিল’রা উচ্চমূল্যে বিভিন্ন দালালের কাছে বিক্রি করে। আর আমরা সেই ভিসা নেয়ার জন্য ঘর-বাড়ী বিক্রি করে টাকা দিচ্ছি দেশিয় দালালদের।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর লাঠি আর ফাইটিং কালচার নষ্ট করে দিয়েছে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি। প্রবাস নামক কষ্টটাকে সঙ্গী করার মানেই হচ্ছে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে দেশের ভাবমুর্তি উজ্জ্বল করার পাশা-পাশি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি করে তুলা। কিন্তু আমরা ভুলে যাই আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ।আমরা ভুলে যাই সেদেশের আইন-কানুন। শুধু ভুলতে পারিনা রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের মাথায় লাঠি মেরে রাতারাতি নেতা বনে যাবার স্বপ্ন। আর এই বাজে স্বপ্নই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের ২৫লক্ষ শ্রমিকের জীবনে। অদৃশ্য একশক্তির জুড়ে মাঝে মধ্যেই দেখা যায় বাংলাদেশি সামান্য কিছু কুলাংগাররা বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে লাঠি,হকিষ্টিক এবং বড় বড় দা-কূড়াল নিয়ে মহড়া দিতে। নিজ কোম্পানির মালিককে খুন করে ডিপ ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখার মতো জঘন্য অপরাধ পর্যন্ত বাংলাদেশিরা আরবদেশে করেছে। জ্ঞানীরা সবকাজ সামনা-সামনি করে বলেই মনে হয় সে সময় ওই এলাকার পুলিশ প্রশাসন থাকে পর্দার অন্তরালে। এই বিষয়ে দুতাবাসও থাকে একদম নিরব।

চোর চলে গেলে বুব্ধি হলে যেমন কোনো কাজ হয়না তাই এখনো সময় আছে প্রবাসে বাংলাদেশিদের অপরাধ প্রবণতার বিভিন্ন দিক দেশে-বিদেশে শ্রমমন্ত্রনালয়কে খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি রাজতন্ত্রের দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা কি পূর্বশত্রুতার জের, অবৈধ অভিবাসনের পরিণাম, যথাযথ ওরিয়েন্টেশনের অভাব,অর্থনৈতিকঅভাব,দারিদ্র নাকি রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণা আর বঞ্চনার প্রতিক্রিয়া তাও খুঁজে দেখা দরকার। জানি একটু সচ্ছলতার আশায় পরিবার-পরিজন ফেলে বিদেশে গিয়ে অপরাধের সাথে জড়িয়ে দেশকে কলংকিত করে লাশ হয়ে ফিরে আসা বা দন্ডিত হয়ে কারাগারে পচে মরা্র মত কাজ একজন সুস্থ্য-জ্ঞানী মানুষ কখনোই করতে পারে না। এর পরিনাম ভয়াবহ যেমন পরিবারের জন্য তেমন দেশের জন্যও। বিদেশে বাংলাদেশিদের অপরাধ প্রবণতার খবর দেশের ভাবমূর্তিকে ম্লান করে দিচ্ছে। এর নিশ্চিত প্রতিক্রিয়া রয়েছে আমাদের শ্রমশক্তি রফতানি খাতে। আর এর জলন্ত প্রমাণ গতমাসে দেশে আসা রেমিটেন্স ।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে এর প্রতিকার খুঁজে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জনশক্তি রফতানি-সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোকে এটাই প্রত্যাশা সকল খেটে খাওয়া প্রবাসীদের।

লেখকঃ সাংগঠনিক সম্পাদক, সৌদি আরব প্রবাসী সাংবাদিক ফোরাম