Sunday, September 23Welcome khabarica24 Online

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাওয়া গেছে বাঘের পায়ের ছাপ

www.bonikbarta.com

বৃষ্টি বড়ুয়া:  স্থানীয় নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সহায়তায় বাংলাদেশের বন সংরক্ষকদের একটি দল পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশকিছু বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। স্থানীয়রা অনেক আগে থেকেই পার্বত্যাঞ্চলে সূর্য ভল্লুক, বনগরু, ঢোল (বন্য কুকুর) ও মেঘলা চিতার অস্তিত্বের কথা বলে আসছেন। সম্প্রতি বন সংরক্ষকরা এসব দুর্গম অঞ্চলে জরিপ চালিয়ে এর সত্যতা পেয়েছেন। তাদের স্থাপিত গোপন ক্যামেরায় বনগরু ও ভল্লুকের ছবি ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি পাওয়া গেছে বাঘের পায়ের ছাপ। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে বন্য প্রাণীর খোঁজে গবেষণা করছিল ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ) নামের একটি বন সংরক্ষক দল। এ লক্ষ্যে তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের সাহায্যে বনের বিভিন্ন অংশে ক্যামেরা স্থাপন করে। আর এসব ক্যামেরায়ই বনগরু ও সূর্য ভল্লুকের ছবি ধরা পড়ে। এছাড়া বনে জরিপ চালানোর সময় পাওয়া যায় ১৩ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের বাঘের পায়ের ছাপ। সিসিএর সহপ্রতিষ্ঠাতা শাহরিয়ার সিজার রহমান বলেন, হাজারটা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। পাঁচ বছর ধরে আমরা এ অঞ্চলে জরিপ চালাচ্ছি। বন বিভাগসহ স্থানীয়রা আমাদের সহায়তা করছেন।

সিসিএর সহপ্রতিষ্ঠাতা ইশতিয়াক সোহান বলেন, পার্বত্য এ অঞ্চলকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করাটাই কর্তব্য। এ কাজে স্থানীয়রা হতে পারে সবচেয়ে বড় সহায়ক। আমরা এরই মধ্যে ছোট পরিসরে কিছু দল গঠন করেছি। তাদের প্রশিক্ষিত করেছি। আমরা এদের বলছি ‘প্যারাবায়োলজিস্ট’। আমরা তাদের কিছু ক্যামেরা দিয়েছি। শিখিয়েছি এগুলোকে বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করার প্রক্রিয়া। এটি আধুনিক বিজ্ঞান ও বাস্তুজ্ঞানের সমন্বয়ের একটি দারুণ উদাহরণ।

মধ্য ফেব্রুয়ারিতে সিসিএ বহুল কথিত বাঘের অস্তিত্বের এ প্রমাণ পায়। বাঘের পায়ের ছাপের ধারণকৃত ছবি তারা যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক হাসান রহমানের কাছে পাঠান। হাসান বুনো বিড়াল প্রজাতির ওপর গবেষণা করছেন। পাশাপাশি সিসিএর সঙ্গে কাজ করছেন তিনি।

হাসান বলেন, আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এ অঞ্চলে অন্তত ১৫টি বাঘ থাকতে পারে। ওই অঞ্চলে বাঘের অস্তিত্ব আছে এমন খবরে প্রথমে আমার সন্দেহ হয়েছিল। তবে পায়ের ছাপ দেখে সে সন্দেহ অনেকটাই কমে আসে। পরে নিশ্চিত হতে এসব ছবি পরীক্ষার জন্য বিশ্বের প্রসিদ্ধ বাঘ বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়। তবে বিষয়টি এখনো শতভাগ নিশ্চিত নয় বলে জানান তিনি।

বাঘ-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যানথেরার সিনিয়র টাইগার প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জন গুডরিচ বলেন, ছবিতে দেখা পায়ের ছাপ কোনো বাঘেরই, এ বিষয়ে আমি মোটামুটি নিশ্চিত।

যে অঞ্চলে পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে সেখানে সিসিএ এরই মধ্যে নতুন করে ক্যামেরা বসিয়েছে। তবে গবেষকরা বলছেন, বাঘ ১০০ কিলোমিটার পরিধি পর্যন্ত অনায়াসে চলাচল করে। তাই নতুন ক্যামেরায় বাঘের ছবি তোলা সম্ভব হলেও তা এ অঞ্চলের কিনা— সেটি নিশ্চিত হতে আরো সময় লাগবে। পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার বা ভারতের বনাঞ্চল থেকেও এ বাঘ আসতে পারে বলে তারা জানিয়েছেন। এটি নিশ্চিত হতে গোপন ক্যামেরার পাশাপাশি জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ জরিপ চালাতে হবে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঘ বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান বলেন, চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে এর আগে কখনোই বাঘ বিষয়ে কোনো জরিপ হয়নি। কিন্তু ওই অঞ্চলের উপজাতীয়দের সঙ্গে আলাপচারিতা ও বনাঞ্চলের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে অন্তত ১৫টি বাঘ এসব অঞ্চলে রয়েছে বলে ধারণা করা যায়।

বাঘের অনুমিত সংখ্যা মাত্র ১৫ শুনে বিষয়টিকে ক্ষুদ্র মনে হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী সারা বিশ্বে মাত্র ২ হাজার ৫০০টি প্রাপ্তবয়স্ক বাঘ রয়েছে। অনেক অঞ্চলেই এ সংখ্যা ক্রমাগত কমে আসছে। বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলে যত ক্ষুদ্রই হোক, বাঘের নতুন কোনো আবাসস্থল পাওয়া গেলে তা শুধু বাংলাদেশই নয়; সারা বিশ্বের জন্যই আশার উদ্রেক করবে। এর আগে বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলকেই বাঘের একমাত্র আবাসস্থল হিসেবে ধরা হতো। বিশ্বের সর্ববৃহত্ এ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলেও বাঘের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে এ বনে মাত্র ১০০টি বাঘ রয়েছে বলে সাম্প্রতিক জরিপে জানা গেছে। বনাঞ্চল ঘিরে লোকালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের কারণে প্রাণীটির অস্তিত্ব দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মোট আয়তনের ১০ শতাংশই পড়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। এ অঞ্চলের মানুষ এখনো জীবনধারণের জন্য প্রকৃতির ওপরই বেশি নির্ভরশীল। আধুনিক প্রযুক্তি, শিক্ষা এসব এখনো এখানকার স্থানীয়দের মাঝে পৌঁছায়নি। জুম এখানকার ১১টি আদিবাসী গোষ্ঠীর জীবিকার অন্যতম উত্স এখনো। কিন্তু ক্রমেই বাড়ছে এ অঞ্চলের জনসংখ্যা। ফলে এখানকার জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সিজার রহমান বলেন, এখানকার মানুষের জীবনাচরণের কারণেই জীববৈচিত্র্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি। এ অঞ্চলটি ইন্দো-বার্মা বায়োডাইভার্সিটি হটস্পটে পড়েছে। বৈশ্বিকভাবে বিপন্ন অনেক প্রজাতি এখনো এ অঞ্চলটিতে টিকে আছে। বিশেষ করে বেশ কিছু বিড়াল প্রজাতির অস্তিত্ব এখনো এ বনাঞ্চলে পাওয়া যায়। তবে অঞ্চলটির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এখানে গবেষণা তেমন একটা হয়নি। এ অস্থিতিশীলতাকেই বিপন্ন প্রজাতিগুলোর টিকে থাকার অন্যতম একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।

খবর দৈনিক বণিক বার্তা