Friday, September 21Welcome khabarica24 Online

দুবাই ওয়ালার সাত কাহন

: এস. এম. মনসুর নাদিম :

 

nadim

প্রবাস জীবন যদিও মধুর তথাপিও কারো কাম্য নয়। প্রবাসীদের ক্ষেত্রে নির্ভেজাল এই সত্য উক্তিটি বিদেশী এক লেখকের। মেহের আলী (৪৫) এর বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিক ছড়িতে।বুকভরা আশা হৃদয়ে লালিত ছোট ছোট স্বপ্নগুলো নিয়ে আর দশজনের মতো দুবাই এসেছিলো উট চড়ানোর কাজে। ভেবেছিলো কয়েকটা উট, গরু, ভেড়া/ ছাগলের দেখা-শোনা করা তেমন আর কঠিন কি। কিন্তু সেতো জানতোনা, তারজন্য অপেক্ষা করছে একশো টি উট আর দেড়শটি ছাগল। দুবাই থেকে তার মনিব এসে তাকে নিয়ে গেলো সৌদিয়া সীমান্ত সংলগ্ন সিলা’তে মনিবের বাড়িতে। মনিব বয়স্ক এক বেদুঈন মহিলা। একমাস মনিবের বাড়িতে কাজ করার পর, মনিব তাকে নিয়ে সৌদিয়া সীমান্ত পার হয়ে জনমানব শুন্য এক অনন্ত দিগন্ত বিস্তীর্ন মরুপ্রান্তরের একটি তাঁবুতে রেখে আসলো। যেদিকে চোখ যায়, বালি আর বালি। প্রখর রৌদ্র করোজ্জ্বল আকাশ মরুপ্রান্তর দিগন্ত একাকার। এখানেই বেদুঈন বুড়ির একশো টি উট আর দেড় শো টি ছাগলের সঙ্গে মেহের আলীকে বসবাস করতে হবে। বিদ্যুৎ পানি টেলিফোন কিছুই নেই। মরুভুমির উত্তপ্ত বালিতে খালি পায়ে চলা দুঃসাধ্য। পায়ে ফোসকা পড়ে যায়। প্লাস্টিকের জেরিক্যান ভর্তি পানি সাপ্লাই করে বুড়ি। পানি গরম, বাতাস গরম। খাওয়ার জন্য তাকে দেয়া হতো একটি ৩০০ গ্রামের চনার(ছোলা) টিন(স্থানীয় ভাষায় লুবিয়া) এবং একটি পেঁয়াজ।প্রতিদিন ত্রিশ বস্তা ভুষি এবং দশ বস্তা গম মেহের আলীকে মিক্স করতে হতো পশু গুলোর আহার প্রস্তুত পর্বে। দীর্ঘ দেড় বছরে মেহের আলীর চুল কাঁধ অতিক্রম করেছে। চুলে জট পড়েছে। সারাদিন পরিশ্রমের পর দুটো পেট ভরে ভাত খেতে পেতো না। দুটো কথা বলার জন্য কোন লোক পেতনা। এ’যেন বৃটিশ আমলের সেই আন্দামান দ্বীপ। বাড়িতেও কোন যোগাযোগ নেই।মেহের আলীর কোন খবর কেউ নিতে পারেনি। ফলে মেহের আলীর পরিবারের সবার ধারনা হয়েছিলো মেহের আলী বোধহয় আর বেঁচে নেই। ওরা চল্লিশা সহ মেহের আলীর মরণোত্তর যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে ফেলেছে। এদিকে মেহের আলী উত্তপ্ত মরুপ্রান্তরে অমানুষিক পরিশ্রম করে তপ্ত বালির উপর কম্বল বিছিয়ে ক্লান্তিতে যখন চোখের পাতাদ্বয় এক করে, ঠিক তখনি ফুঁস-ফুঁস শব্দে চোখ খুলে যায়। হাতের টর্চ টা জ্বালিয়ে দেখে , তাঁবুর ভেতর বিষাক্ত সাপ। প্রথম প্রথম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে পড়তো। এরপর প্রতিরাত একই ঘটনা দর্শনে সাহস ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটেছে। এবং সাপকে লাঠি পেটা করে ঘুমুতে যেতো। দীর্ঘ জটা চুলগুলি একহাতে মুঠি করে ধরে দা/বঁটি দিয়ে কাটার ব্যার্থ চেষ্টা করতো। একদিন অসহ্য হয়ে পালানোর চেষ্টা করলো। ১০ লিটার পানির একটা জেরিক্যান পিঠে বেঁধে রাতভর হাঁটল। সকাল হতে জেরিক্যানের পানিও নিঃস্বেষ হয়ে গেলো। চলতে চলতে একসময় মেহের আলী অজ্ঞান হয়ে বালির উপর মুখ থুপড়ে পড়ে গেলো। যখন জ্ঞান ফিরল, দেখল মরুভূমির মাঝখানে শুয়ে আছে। চারিদিকে অনন্ত দিগন্ত বিস্তির্ন মরুভুমি। সারারাত চলার পরও কোন কুল-কিনারা নাদেখে নিরুপায় হয়ে বালির মধ্যে নিজের পদচিহ্ন অনুসরন করে আবার উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করলো।
পালানোর চেষ্টা ব্যার্থ হওয়ায় এবার মেহের আলী তার মনিব বেদুঈন বুড়িকে মিনতি করতে লাগলো, যাতে তাকে শুধু একটিবার লোকালয়ে নিয়ে যায়। যেন টেলিফোন করে বাড়ি-ঘরের সংবাদ নিতে পারে।

অনুনয় বিনয়েও পাষণ্ড বৃদ্ধার কঠিন চিত্ত কিঞ্চিৎ নম্র হলনা। এবার মেহের আলী হরতাল শুরু করলো। পশু গুলিকে আহার দেয়া থেকে বিরত রলো। বুড়ি দেখল এভাবে চললে পশুগুলি অনাহারে মারা যাবে। তাই বুড়ি ক’দিন পর একটা সোমালিয়ান শ্রমিককে ২/৩ দিনের জন্য পশুগুলোর দায়ীত্ব দিয়ে বৃদ্ধা মেহের আলীকে নিয়ে সিলার দিকে যাত্রা করলো। ল্যাণ্ডক্রুজার জীপটা মরুভুমির উপর দিয়ে বিরামহীন ভাবে ১০০ কিলোমিটার স্পীডে দুই ঘণ্টা চলার পর পাকারাস্তায় উঠেছে। লোকালয়ে এসে বৃদ্ধা মেহের আলীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল- দেশে ফোন করো। পরিচিতদের সাথে সাক্ষাৎ করো। আগামী পরশু আমি আসবো। তোমাকে পৌঁছে দেবো আবার মরুপ্রান্তর আফিয়ায়। আফিয়ার নাম শুনে ক্ষনিকের জন্য মেহের আলীর শরীরটা যেন অবশ হয়ে গেলো। দুটো সেলুন তার জট পাকানো চুল কাটতে অনীহা প্রকাশ করলে তৃতীয় সেলুনে চল্লিশ দেরহাম দিয়ে চুলগুলো কেটে টেলিফোনে সবার সাথে যোগাযোগ করলো। আত্মীয় স্বজনরা মেহের আলীর কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো। চোখ মুছতে মুছতে তারা বলল- সরাসরি টেক্সি নিয়ে চলে এসো আমাদের ঠিকানায়। ট্যাক্সির ভাড়া আমরা দেবো। মেহের আলী সিলা থেকে দুবাই তার আত্মীয়দের কাছে এসে পৌঁছলে, ঘটনাক্রমে আমার সাথে দেখা। ছল ছল চোখে আদ্য-পান্থ ঘটনা সে আমাকে বর্ননা করলো। আমি আমার পাঠকদের জন্য দুবাই ওয়ালার এই সত্য ঘটনা তুলে ধরলাম। মেহের আলীর অনুরোধে শুধু তার ছদ্ম নাম ব্যাবহার করেছি।


লেখকঃ দুবাই প্রবাসী সাংবাদিক, কবি ও কলামিস্ট।