সোমবার, ১০ মে ২০২১, ২৭ বৈশাখ ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

তারেক-আরিফ রিমান্ডে

23912_f4

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সেভেন মার্ডারের ঘটনায় অভিযুক্ত র‌্যাবের সাবেক দুই কর্মকর্তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তারা হলেন, র‌্যাব-১১ এর সাবেক কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ ও মেজর আরিফ। গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাদনী রুপমের আদালতে তাদের সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। আদালত শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাত ৪টার দিকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসভবন থেকে এই দুই কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। তবে আরেক কর্মকর্তা র‌্যাব-১১ এর সিপিসি-১ এর সাবেক প্রধান লে. কমান্ডার রানার কোন হদিস পায়নি পুলিশ। আটকের পর তারেক ও আরিফকে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশের সহযোগিতায় র‌্যাবের সাবেক দুই কর্মকর্তাকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তাদের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আমরা আন্যান্য যে কার্যক্রম তা যথাযথভাবে করার চেষ্টা করছি। এদিকে গতকাল সাবেক দুই র‌্যাব কর্মকর্তাকে আদালতে নেয়ার আগে আদালত এলাকায় কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। এর মধ্যেই আদালত প্রাঙ্গণে উৎসুক মানুষ ভিড় করেন। দুই র‌্যাব কর্মকর্তাকে আদালতে নেয়া ও বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় আইনজীবীরা তাদের ফাঁসি দাবি করে মিছিল ও স্লোগান দিতে থাকেন।
পাঁচ দিনের রিমান্ড: আদালত পাড়ায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পর গতকাল দুপুর ২টার দিকে সাবেক দুই র‌্যাব কর্মকর্তাকে আদালতে নেয়া হয়। এর আগে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাদনী রুপমের আদালতের সামনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আইনজীবী ছাড়া আদালতের অভ্যন্তরে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। আদালতে নেয়ার সময় লে. কর্নেল তারিক সাঈদ মোহাম্মদ ও মেজর আরিফের শরীরে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ও মাথায় হেলমেট ছিল। তবে তাদের হাতে হাতকড়া পরানো ছিল না। আদালতে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পর তাদের মাথা থেকে হেলমেট খুলে ফেলা হয়। পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, এই দু’জন র‌্যাব-১১ এর সাবেক দুই কর্মকর্তা। তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হলেও এদের নেতৃত্বেই নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত জনকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আলোচিত এ অপহরণ, হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের চেষ্টার সঙ্গে তারা সরাসরি জড়িত। এ ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। এদের ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। আদালতের শুনানিতে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খানসহ সিনিয়র আইনজীবীরা অংশ নেন। শুনানিতে আইনজীবীরা বলেন, র‌্যাবের এসব অফিসার বাহিনীকে কলুষিত করেছে। এসময় অন্য আইনজীবীরা ‘শ্যাম’ ‘শ্যাম’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। আইনজীবীরা বলেন, এই সাত জনকে কিভাবে, কোথায়, কখন হত্যা করা হয়েছে তা উদ্ঘাটন করতে তাদের রিমান্ড নেয়া প্রয়োজন। একজন আইনজীবী বলেন, উদ্ধারকৃত লাশের সঙ্গে রেশনের বস্তা, ইট, ইজ্জতের দড়ি থাকা প্রমাণ করে সরকারি কোন বাহিনীই তাদের তুলে নিয়ে নিমর্মভাবে হত্যা করেছে। আরেক আইনজীবী বলেন, এই দুই র‌্যাব কর্মকর্তার সঙ্গে সাত হত্যার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি নূর হোসেনের সখ্য রয়েছে। আদালত শুনানি শেষে লিখিত আদেশ দেন। কোর্ট পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন পড়ে শুনানো শুরু করলে আইনজীবীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা মাত্র পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করায় বিচারককে উদ্দেশ্য করে নানারকম স্লোগান দিতে থাকেন। এদিকে আদালত চলাকালীন আইনজীবীরা হঠাৎ লক্ষ্য করেন দুই আসামির হাতে হাতকড়া নেই। এসময় তারা ‘হাতকড়া হাতকড়া’ বলে চিৎকার করতে থাকলে পুলিশ তারিক ও আরিফের এক হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেয়। এদিকে আইনজীবী চন্দন সরকারের পরিবারের দায়ের করা মামলায় এই দুই সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর একটি আবেদন করেন বাদী পক্ষ। আদালত আজ এ আবেদনের শুনানি দিন ধার্য করেছেন। আদলতের নথি থেকে জানা যায়, লে. কর্নেল তারিক সাঈদ মোহাম্মদের পিতার নাম কর্নেল (অব.) মজিবুর রহমান। গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়ীয়ার দেবত্র এলাকায়। বর্তমান ঠিকানা হলো- বি ১১০ নিউ ডিওএইচএস মহাখালী, কাফরুল, ঢাকা। মেজর আরিফের পিতার নাম মৃত আনোয়ার হোসেন। গ্রামের বাড়ি নরিসংদীর মনোহরদীর চর গোহালবাড়ীয়ায়। বর্তমান ঠিকানা হলো- ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের সিলামী।
আদালতে যা বললেন লে. কর্নেল তারেক: আদালতে আসামি লে. কনেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ ও মেজর আরিফের পক্ষে কোন আইনজীবী ছিলেন না। একপর্যায়ে বিচারক নিজেই তারিক ও আরিফ কিছু বলতে চান কিনা তা জানতে চান। এসময় মেজর আরিফ কিছু না বললেও লে. কর্নেল তারিক বলেন, র‌্যাবের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে ৬ কোটি টাকা নেয়ার এসব বলা হচ্ছে পত্র-পত্রিকায় দেখে। আইনজীবীরা এসময় বলে ওঠেন, র‌্যাবের বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। আমাদের অভিযোগ ব্যক্তি তারেকের বিরুদ্ধে। আদালত তারেকের বক্তব্য পুনরায় শুনতে চাইলে তিনি বলেন, একটি টিভিতে ফিচার রিপোর্ট করা হয়েছে ব্যাংক লেনদেনের কোন ভিত্তি নেই। আমরা চাই সত্য বের হয়ে আসুক। র‌্যাবকে নিয়ে, কর্নেল তারেককে নিয়ে এভাবে ঢালাও অভিযোগ করা ঠিক হচ্ছে না। তারেকের এ বক্তব্যের পর আদালতে আবার হট্টগোল শুরু হয়। আদালত সবাইকে চুপ করতে বলে তারেকের কথা শুনতে চান। তারেক এসময় বলেন, মাননীয় আদালত, সত্য বের করে আনুন। এজন্য আমাদের ১৫ কিংবা ২০ দিন, যে কয়েক দিনই রিমান্ডই দেয়া হোক আমার কোন আপত্তি নেই। বলেন, এখন টেকনোলজি এত আধুনিক যে ঘটনার দিন কে কোথায় ছিল তা বের করা খুবই সহজ। এটা বের করা হলে অনেক রহস্য উন্মোচিত হবে।
রাখা হয়েছে ম্যাগাজিন গার্ডে: গ্রেপ্তারের পর সাবেক দুই র‌্যাব কর্মকর্তাকে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ লাইনের ম্যাগাজিন গার্ড এলাকায় রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য তাদের জেলা গোয়েন্দা কার্যালয়ে না রেখে পুলিশ লাইনের ম্যাগাজিন গার্ডে রাখা হয়েছে। গতকাল সকালে সেখানে গিয়েই তারেক ও আরিফকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেন পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এসময় তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মামুনুর রশীদ মণ্ডল জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য সব নোট করে রাখেন। গতকাল দুপুরে তাদের আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ড শুনানি শেষে আবারও তাদের পুলিশ লাইন্সের ম্যাগাজিন গার্ড এলাকায় নিয়ে রাখা হয়। দুই কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিক প্রহরা দিচ্ছেন কয়েক ডজন অস্ত্রধারী পুলিশ।
যেভাবে গ্রেপ্তার করা হলো: আলোচিত এ সেভেন মার্ডারের ঘটনায় সাবেক তিন র‌্যাব কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করতে গত রোববার উচ্চ আদালত আদেশ দেয়। উচ্চ আদালতের আদেশ হাতে পাওয়ার পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মামুনুর রশীদ মণ্ডল পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সশস্ত্রবাহিনী বিভাগে সহযোগিতা চেয়ে একটি চিঠি দেয়। গত বৃহস্পতিবার থেকে দুই সেনাকর্মকর্তাকে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুমতি দেয়। এরপর থেকেই কখন তাদের গ্রেপ্তার করা হবে তা নিয়ে চলে আলোচনা। শুক্রবার সকাল থেকেই গুঞ্জন শুরু হয় যে কোন সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তবে গ্রেপ্তারের বিষয়টি তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শুক্রবার রাতেই সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে এ গুঞ্জন আরও জোরালো হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা ঢাকা সেনানীবাসের জাহাঙ্গীর গেটের সামনে গিয়ে জড়ো হতে থাকেন। রাত ৩টার দিকে সেনানিবাসের জিয়া কলোনি গেট দিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের একটি দল ক্যান্টনমেন্ট থানায় যায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মণ্ডল দুই সেনাকর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের জন্য ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি রিক্যুজিশন দেয়। সেই রিক্যুজিশন চিঠি নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ মিলিটারি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এর কিছুক্ষণ পরই মিলিটারি পুলিশ অকালীন অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল তারেক ও মেজর আরিফকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। ভোর ৪টার দিকে পুলিশের দল দুই সেনাকর্মকর্তাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেয়। লে. কর্নেল তারিক ক্যান্টনমেন্টের অফিসার্স ও কোয়ার্টার আশালতা এবং মেজর আরিফ অফিসার্স মেস-২তে থাকতেন।