শুক্রবার, ২৯ অক্টোবর ২০২১, ১৪ কার্তিক ১৪২৮খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

চতুর্থ ধাপে সহিংসতা ও দখলের রেকর্ড

16418_f5

 

চতুর্থ ধাপের উপজেলা নির্বাচনে বেড়েছে সহিংসতা ও অনিয়ম। জালিয়াতি, কেন্দ্র দখল আর ভোটের আগেই ব্যালট বোঝাইয়ের নজিরবিহীন এ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা, অবস্থান এবং দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে। শক্তির মহড়ায় কেন্দ্র দখলের উৎসবের এ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা যেমন প্রাধান্য বিস্তার করেছেন তেমনি ভাইস চেয়ারম্যান পদেও আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা বেশি জয়ী হয়েছেন। ব্যবধান কমানোর সহিংসতাপূর্ণ এ নির্বাচনের পর্যবেক্ষণ ফল ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে। গতকাল পর্যবেক্ষক সংস্থা ইলেকশন ওয়ার্র্কিং গ্রুপ জানিয়েছে, চতুর্থ ধাপের নির্বাচন ছিল অধিক সহিংসতাপূর্ণ। এ নির্বাচনে তাদের পাঠানো প্রতিনিধিকে অনেক স্থানে ভোকেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এমনকি পর্যবেক্ষককে কেন্দ্রে আটকে হুমকি দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ব্যাপক জাল ভোট ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগের সঙ্গে সুর মিলিয়েছে এ সংস্থাটি। তাদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পিরোজপুরের একটি কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকের সামনেই ১০ বছরের কিশোর একাই ১৩টি ভোট দিয়েছে। এদিকে নির্বাচনে ক্রমে সহিংসতা বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বৃটেন। গতকাল এক অনুষ্ঠানে দেশটির হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন সহিংসতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।
এদিকে চার ধাপের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পর্যায়ক্রমে ব্যবধান কমিয়ে এগিয়ে গেলেও ধাপে ধাপে বেড়েছে সংঘাত-সহিংসতা ও অনিয়ম। সহিংসতা দমনে নির্বাচন কমিশন প্রত্যাশিত ভূমিকা নেয়নি। মন্ত্রী-এমপিরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও কোন ব্যবস্থা নেননি তারা। সর্বশেষ গতকাল একজন মন্ত্রী ও একজন এমপি’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়েছে কমিশন। চতুর্থ দফা নির্বাচনের আগের দিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক জানিয়েছিলেন ব্যালট ছিনতাই হলে গুলি করা হবে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী ক্ষমতা প্রয়োগ করবে বলেও বলা হয়েছিল। তবে কমিশনের এমন ঘোষণায় নির্বাচন চিত্রে কোন প্রভাব পড়েনি। বরং অবনতি হয়েছে পরিস্থিতির। আগের ধাপের নির্বাচনে বাগেরহাট ও শরীয়তপুরে সহিংসতায় মারা যান দু’জন। জাল ভোট, কেন্দ্র দখল ও এজেন্ট বের দেয়ার অভিযোগ বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বেশ কয়েকটি উপজেলায় নির্বাচন বর্জন করেন। সহিংসতা ও সংঘর্ষের কারণে ২১টি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। ঝিনাইদহ, কুমিল্লা উত্তর, চট্টগ্রাম উত্তর, চট্টগ্রাম দক্ষিণ, বরিশাল উত্তর, বাউফল, ধামরাই, কানাইঘাট, নাসিরনগর,  সোনাগাজী, ফুলগাজী, বটিয়াঘাটা,  বেতাগী, নলছিটি, কাঁঠালিয়া, ঈশ্বরদী, বানারীপাড়া, মনপুরা,  দৌলতখানসহ ২৫টি উপজেলার বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্র দখল বা সরকারি দলের প্রার্থীর লোকজন প্রভাব বিস্তার করায় সাধারণ ভোটাররা সেখানে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি বা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেননি।
তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে সহিংসতার কারণে নির্বাচন কমিশন চতুর্থ ধাপের বিষয়ে দৃশ্যত সতর্কতার বিষয়টি ইঙ্গিত করে। আগের ধাপগুলোতে সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও চতুর্থ ধাপে তাদের ক্ষমতা দেয়ার বিষয় চিঠি দিয়ে অবহিত করে কমিশন। বলা হয় সেনাবাহিনীর সামনে যে কোন ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটলে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি ছাড়াই তারা ব্যবস্থা নিতে পারবেন। তবে নির্বাচনে দৃশ্যত এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনা খুব একটা দেখা যায়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গোলযোগ থামাতে ভূমিকা রেখেছে সেনাবাহিনী। তবে দখল-জালিয়াতি ছিল আগের ধাপের চেয়ে অনেক বেশি। সহিংসতায় মারা গেছে ৪ জন।
তৃতীয় ধাপে ভোট শুরুর আগে কেন্দ্র দখলের ঘটনা খুব একটা ঘটেনি। চতুর্থ ধাপে কয়েকটি উপজেলায় রাতেই কেন্দ্র দখল ও ব্যালট ছিনতাই করে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রাথীর লোকজন সিল মেরেছে। ভোট শুরুর আধা ঘণ্টার মধ্যে ব্যালট ভর্তি বাক্স পাওয়া গেছে ভোটকেন্দ্রে। প্রথম ধাপে ১৯শে ফেবু্রয়ারির নির্বাচনে আহত হন প্রায় ৪০ জন। বিএনপি’র অভিযোগ ৭৬৩টি কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে। তবে ১৬টি উপজেলার ৬৫টি কেন্দ্রে অনিয়মের খবর পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় ধাপে ২৬টি জেলার বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ৩৫টি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ, বিএনপি-জামায়াত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এসব ঘটনায় একজন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। এই ২৬টি জেলার শতাধিক ভোটকেন্দ্রে জালভোট, ব্যালট পেপার ছিনতাই,  কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল, বিএনপি’র এজেন্টদের মারধর করে  কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।
মোট চার ধাপে ৩৭৬টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।  বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফল অনুয়ায়ী ১৭৪টিতে আওয়ামী লীগ, ১৫০টিতে বিএনপি ও ৩২টি উপজেলায় জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা  জয় পেয়েছেন। প্রথম ধাপে ১৯শে  ফেব্রুয়ারি ৯৭টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগ ৩৫টি, বিএনপি ৪৪টি, জামায়াত ১২টি, অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬টি উপজেলায় জয়লাভ করে। ২৭শে ফেবু্রয়ারি দ্বিতীয় ধাপে ১১৫টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারীভাবে ঘোষিত ফল অনুযায়ী বিএনপি ৫২টি, আওয়ামী লীগ ৪৮টি, জামায়াত ৮টি, অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি উপজেলায় জয়লাভ করেন। তৃতীয় ধাপে ৮১টি উপজেলায় ভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৫ই মার্চ। বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফল অনুযায়ী ৭৬টি উপজেলায় আওয়ামী লীগ ৩৮টি, বিএনপি ২৮টি, জামায়াত ৭টি, অন্যান্য ও স্বতন্ত্র মিলে ৩টিতে জয় পায়। এই ধাপে স্থগিতকৃত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মুক্তাগাছা, হিজলা ও হাজীগঞ্জে ২৭শে মার্চ, শ্রীপুরে ৩১শে মার্চ ভোটগ্রহণ করা হবে। সীমানা জটিলতার কারণে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার নির্বাচন ৩ মাসের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্ট। চতুর্থ ধাপে ২৩শে মার্চ ৯১টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফল অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ৫৩টি, বিএনপি ২৬টি, জামায়াত ৫টি, জাতীয় পার্টি ১টি, অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৩টিতে জয়লাভ করেন। সহিংসতার কারণে স্থগিত করা হয় ৩টি কেন্দ্রের ফল।

উৎস- মানবজমিন