Tuesday, November 13Welcome khabarica24 Online

খবরিকা অগ্রযাত্রার মিছিলে

এস, এম, মনসুর নাদিম

na

দীর্ঘ দুই যুগ দুবাইর একটি কোম্পানিতে চাকরি করার সুবাদে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন প্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘোরার সুযোগ হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন দেশের, ভিন্ন ভিন্ন ভাষার বিভিন্ন জাতির সাথে মিশেছি। ভিন্ন সংস্কৃতি দেখে কিছুটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রবাসে মানুষ কিভাবে দিন যাপন করে তা দেখতে দেখতে দুই যুগ পেরিয়ে গেলো। মা- বাবার আদর, ভাই- বোনের ভালোবাসা, স্ত্রীর প্রেম সবকিছু বিমান বন্দরের অশ্রুতে ধুয়ে প্রবাসের অপরিচিত পরিবেশকে আলিঙ্গন করেছি। আমার দীর্ঘ প্রবাস জীবনটাকে আমার কাছে একটি চলন্ত ট্রেন মনে হয়। মাঝে মাঝে ষ্টেশনে দাঁড়ায়, কিছু যাত্রী নেমে যায় আবার কিছু যাত্রী উঠে বসে। আমিই শুধু আমার প্রবাস ট্রেনের দীর্ঘ পথযাত্রি। এই দীর্ঘ যাত্রায় আমার বগী থেকে কতজন যাত্রী নেমেছে, আর কতজন যাত্রী উঠেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। সেই সত্তরের দশকের শেষের দিকে লেখা- লেখি শুরু। প্রথম যেদিন (১০ আগস্ট ১৯৮৭ইং) প্রবাসে(দুবাই) পা রাখলাম, সেদিন কিছু বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিলেন- প্রত্যেকটা মানুষ একটা স্বপ্ন দেখে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে জীবন ও জীবিকার দিক নির্নয় করে থাকে। সে ক্ষেত্রে আমার স্বপ্নটা কি। আমি বলেছিলাম, আমার স্বপ্নের কথা—একটা প্রেস কিনে নিজস্ব একটি পত্রিকা বের করবো। দীর্ঘ দুই যুগ আমার পত্রিকা করা হয়নি। কিন্তু প্রবাসে যারাই বাংলা পত্রিকা বের করেছেন, তাদেরকে উৎসাহ দিয়েছি। লেখা দিয়ে সময় দিয়ে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছি। আজীবন লেখা-লেখিকে পছন্দ করেছি। এখনো করছি। তাই যারা ভালো লেখেন, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করেন। জ্ঞান গর্ব আলোচনা করেন আমি বরাবরই তাঁদের প্রতি দুর্বল। প্রবাসী সাংবাদিক খবরিকার অনলাইন সম্পাদক অনুজ প্রতীম কামরুল হাসান জনি’র অনুরোধ ছিল, দেশে এসেছি যখন একবার যেন খবরিকার অফিসে ঘুরে যায়।১৮মে উত্তপ্ত রৌদ্র করোজ্জ্বল দিনে গিয়েছিলাম মীরসরাই-সীতাকুণ্ডের বহুল প্রচলিত স্থানীয় পত্রিকা খবরিকা’র অফিসে। চট্টগ্রাম সহর থেকে আনুমানিক পঞ্চাশ/ষাট কিলোমিটার হবে। এই গরমের তীব্র তাপদাহে এতদুরে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিলোনা, তবুও সাহস করলাম। আমার বন্ধু বিশিষ্ট শিল্পপতি গোলাম মোস্তফা হাক্কানি অতি ব্যাস্ত মানুষ। আরেক বন্ধু আলজেরিয়া প্রবাসী ওয়াহিদুল আলম। দুজনেই আমাকে সেদিন সঙ্গ দিয়েছিলেন। আমরা তিনজন মিলেই গিয়েছিলাম ‘খবরিকা ভবনে’। খবরিকার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান পলাশ অত্যান্ত সজ্জন এবং অতিথি পরায়ন। ঐ সময় অফিসে ছিলেন খবরিকা’র নির্বাহি সম্পাদক রাজিব মজুমদার উপসম্পাদক আনোয়ারুল হক নিজামী। ভালো লাগলো খবরিকার ছোট্ট অফিসে যে এতো সুন্দর ও মার্জিত একটি পত্রিকার কাজ চলছে তা দেখে। খবরিকা মফঃস্বলের কাগজ হলেও দক্ষ ও যোগ্য লোকেদের ছোঁয়ার পরশে খবরিকার মতো একটি আঞ্চলিক পত্রিকা হয়ে উঠেছে যেন উত্তর চট্টগ্রামের জাতীয় পত্রিকা। খবরিকার পনেরো বছরের পথ চলায় খবরিকা প্রসব করেছে অনেক সাংবাদিক, কবি, প্রাবন্ধিক ও উপন্যাসিক। আজ খবরিকার অনেক সন্তান জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক। পরিচিত কবি। পাঠক নন্দিত উপন্যাসিক। খবরিকা আমি প্রথমে দেখি অনলাইনে। জনৈক ফেইসবুক বন্ধু খবরিকার একটি নিউজ শেয়ার করায় ওটা পড়তে ক্লিক করতে পেয়ে যায় খবরিকা। পরে সেই খবরিকার অফিসে এসে খবরিকার কিছু বিশেষ সংখ্যা এবং খবরিকা পাবলিকেশন্স কর্তৃক কিছু প্রকাশনা দেখে আমি তো অভিভূত। একটি পত্রিকা প্রকাশ এবং সেটাকে বিরতিহীন ভাবে পনেরো বছর চালানো তাও মফঃস্বল এলাকায়, সেটা চাট্টিখানি কথা না। যেখানে দুবাই’র মতো পেট্রো-ডলারের দেশে একটি মাসিক পত্রিকা একবছর চালাতে হিমসিম খেতে হয়। বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, সেখানে খবরিকার মতো পত্রিকা আমাদের প্রেরনার উৎস হবে এটাই স্বাভাবিক।খবরিকা প্রমান করলো, অর্থ থাকলেই পত্রিকা চালানো যায়না। একটি পত্রিকার মূল চালিকাশক্তি হল পাঠক। খবরিকার মাঝি-মাল্লাদের আরেকটি দুঃসাহসিক কাজ যা দেখে আমি একেবারে বিস্ময়ের শেষ দাপে। সেটা হল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এইযুগে খবরিকার মতো একটি মফঃস্বলের আঞ্চলিক পত্রিকা অনলাইনে প্রচুর পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।আমার জানা মতে আশি-নব্বই দশকে মীরসরাই অঞ্চলে কোন আঞ্চলিক পত্রিকার অস্তিত্ব ছিলোনা। সীতাকুণ্ড থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ‘গিরি সৈকত’ ও সাপ্তাহিক ‘উপনগর’ই ছিল এই অঞ্চলের উদীয়মান লেখকদের একমাত্র ভরসা। বর্তমানে খবরিকার বদৌলতে প্রচুর লেখক সৃষ্টি হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে আজ জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক। অনেকের আবার একাধিক বই ও প্রকাশ হয়েছে। আজ একথা অনস্বীকার্য যে এই লেখকদের সাফল্যের সিঁড়ি ছিল ‘পাক্ষিক খবরিকা’। সেহেতু খবরিকা পরিবারও এই সাফল্যের সমান অংশীদার। আমি খবরিকার জয়যাত্রার মিছিলে অংশ গ্রহন করতে পেরে খুবই আনন্দিত। খবরিকা হোক নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মুর্তপ্রতীক।

লেখকঃপ্রবাসী সাংবাদিক কবি ও কলামিস্ট।