সোমবার, ৮ আগস্ট ২০২২, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৯খবরিকা অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম।

আন্দোলন নিয়ে সতর্ক আওয়ামী লীগ

pic-22_162802

 

জানুয়ারিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তি ঘিরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সরকারবিরোধী আন্দোলনের পরিকল্পনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। রাজপথে বা ভিন্ন কোনো পথে যেন বিরোধীরা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে না পারে সেই বিষয়ে বিশেষ সতর্ক রয়েছেন ক্ষমতাসীনরা। দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে কোথাও যাতে বিএনপি সুবিধা করতে না পারে সে জন্য সক্রিয় আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা।বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের দিনটিকে কালো দিবস বা গণতন্ত্র হত্যা দিবস ঘোষণা করে ওই দিন রাজধানীতে বড় ধরনের সমাবেশ করবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। এ কর্মসূচিতে সরকার বাধা দিলে হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের রাজপথের কর্মসূচি মোকাবিলায় পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকবে আওয়ামী লীগ ও এর নেতৃত্বাধীন ১৪ দল। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানুয়ারিতে বিভিন্ন জেলায় দলীয় সভা-সমাবেশে অংশ নেবেন। সম্ভাব্য সহিংসতা রোধে দেশজুড়ে বিশেষ তৎপর থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর বিরোধীরা যাতে বাইরের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা না পায় সেই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা।জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি নেতাদের আন্দোলনের হুমকি আর ষড়যন্ত্রের চেষ্টা দুটোই আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। তাদের আন্দোলন মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ প্রস্তুত রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগের আন্দোলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা কেউ মাঠে নামেননি। কিন্তু দেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা সহিংসতা চালিয়েছে। এদিক বিবেচনা করে আমরা প্রস্তুতি রেখেছি। সারা দেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে আমরা তৃণমূলে সংগঠনকে গুছিয়ে এনেছি। ফলে এবার তৃণমূলে বিএনপি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না।’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-হানিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি কোনো আন্দোলনের দল নয়। তারা সব সময় ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করে। এ দলটির জন্মই হয়েছে ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তারা এবার সফল হতে পারবে না। আমরা এ বিষয়ে সজাগ রয়েছি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা বিএনপির ষড়যন্ত্র রুখে দেব।’

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আন্দোলন মোকাবিলায় বিরোধী জোটের কেন্দ্রীয় নেতাদের চাপে রাখার কৌশল নিয়েছিল তখনকার সরকার। বর্তমানে বিএনপির অনেক কেন্দ্রীয় নেতার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য চরমে রয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যেও কাজ করছে নানা অবিশ্বাস। এ অবস্থায় এবার সম্ভাব্য আন্দোলন মোকাবিলায় ওই জোটের তৃণমূল নেতা-কর্মীদেরও চাপে রাখার কৌশল নেবে আওয়ামী লীগ ও সরকার। জেলা, উপজেলা পর্যায়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নেতা-কর্মীরা যেন মাঠে নামতে না পারে সেই কৌশল নিয়ে এগোচ্ছেন ক্ষমতাসীনরা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা তেমন একটা মাঠে নামতে পারেননি। কিন্তু বেশ কয়েকটি জেলায় তাদের নেতা-কর্মীরা ব্যাপক সহিংসতা চালায়। এ অভিজ্ঞতা মনে রেখে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার পরপরই তৃণমূলে বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জানুয়ারি ঘিরে বিএনপির সম্ভাব্য আন্দোলন ও সহিংসতার বিষয়টি মাথায় রেখে কড়া নজরদারিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মাস দুয়েক আগে আগে পুলিশের মহাপরিদর্শক, তিনটি মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) সংস্থার মহাপরিচালক, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক, র‌্যাবের মহাপরিচালক এবং রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। জামায়াত-বিএনপি জোট এবার দেশের কোথাও আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালাতে পারবে না। সহিংসতার চেষ্টা করলে তা কঠোর হাতে দমন করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’ তিনি আরো বলেন, ‘শুধু সরকারি বাহিনী নয়, এবার সহিংসতা মোকাবিলায় সারা দেশের জনগণও প্রস্তুত আছে। কেউ সহিংসতার চেষ্টা করলে জনগণই তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করবে।’

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগর চট্টগ্রামে বিরোধীদের সম্ভাব্য আন্দোলন অঙ্কুরে শেষ করে দেওয়ার লক্ষ্যে নির্বাচনী আমেজ তৈরির কৌশল নিয়েছে সরকার। আন্দোলন যাতে হালে পানি না পায় সে জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ দুই মহানগরে সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে এগোচ্ছে সরকার।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, জানুয়ারি ঘিরে রাজপথে সম্ভাব্য আন্দোলন মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি এবার আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতা-কর্মীরা মাঠে থাকবে। তারা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সমর্থনে এবং বিএনপি-জামায়াতের ‘দেশবিরোধী’ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় থাকবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ পালন করবে আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস, ১২ জানুয়ারি সরকারের এক বছর পূর্তি ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করা হবে। দলীয় নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি সফর ছাড়াও দলীয় সভা-সমাবেশে অংশ নেবেন। এ ছাড়া বিএনপি জোটের কর্মসূচির ধরন বুঝে তাৎক্ষণিক পাল্টা কর্মসূচিও থাকবে। এ লক্ষ্যে সারা দেশে দল গুছিয়ে নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। প্রায় দুই মাস ধরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরই মধ্যে ২৩ জেলা ও মহানগরের কাউন্সিল সম্পন্ন হয়েছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত) আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্প্রতি কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে রাজশাহী বিভাগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। এ বিভাগে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিএনপি-জামায়াতের যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।’

দলীয় সূত্র মতে, রাজপথে বিএনপির কর্মসূচি মোকাবিলার পাশাপাশি নেপথ্যে তাদের নানা চেষ্টা ব্যর্থ করতেও সক্রিয় রয়েছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। এ লক্ষ্যে বিএনপি জোটের নেতাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কঠোর গোয়েন্দা নজরদারির কারণেই সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গোপন বৈঠকের বিষয়টি ধরা পড়ে যায়।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজপথে সরকারের ভাগ্য নির্ধারণ করার মতো আন্দোলন গড়তে পারবে না বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। এ জন্য তারা নানা চক্রান্তের চেষ্টা করছে। সরকার উৎখাতে দেশে-বিদেশে তাদের নানা চেষ্টা ও তদবিরের খবর আমাদের কাছে আছে। কিন্তু তারা সফল হতে পারবে না। কারণ বিএনপি-জামায়াতের চক্রান্ত ব্যর্থ করতে আমরা সক্রিয় আছি।’

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রের দাবি, বিএনপির সম্ভাব্য আন্দোলন মোকাবিলায় ক্ষমতাধর দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক ও যোগাযোগ রাখছেন সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন বৈঠকে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোকে আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে অবগত করছেন। বিএনপি-জামায়াত জোটের বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড তাদের কাছে তুলে ধরছেন। সুশাসন ও স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগের নানা চেষ্টার কথা বিদেশি প্রতিনিধিদের জানানো হচ্ছে।

গত সোমবার ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে বৈঠক করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদল। জানা গেছে, ওই বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধিদের কাছে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির গঠনমূলক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো ও দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক চর্চার কথাও ইইউ প্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরা হয়। এতে ইইউ প্রতিনিধিরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। বৈঠকে তাদের পক্ষ থেকে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গত মাসে নয়াদিল্লি সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ কয়েকজন নীতিনির্ধারকের সঙ্গে বৈঠক করেন। দলীয় সূত্রে জানা যায়, এসব বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকারের প্রতিনিধিরা জঙ্গিবাদ দমন, ‘যুদ্ধাপরাধী’দের বিচারসহ অভ্যন্তরীণ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেন। সৈয়দ আশরাফ দেশে ফেরার কয়েক দিন পর একটি সংসদীয় প্রতিনিধিদল ভারত সফরে যায়। জানা গেছে, ওই সফরে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিকরা জামায়াত ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং সরকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।